কুরবানী শুধু পশু জবাই নয়, আত্মত্যাগ ও তাকওয়ার শিক্ষা-ড. মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন।
কুরবানী হলো আত্মত্যাগ। শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে বিশেষ কয়েকটি দিনে, বিশেষ পদ্ধতিতে কতিপয় চতুষ্পদ প্রাণীর জবেহ করাকে কুরবানী বলা হয়।
সূরা হাজ্জ: আয়াত ২৮.
যেন তারা নিজেদের উপকারের জন্য উপস্থিত হয় নির্দিষ্ট দিনগুলিতে স্মরণ করে আল্লাহর নাম তিনি ওদের যে জীবন উপকরণ দিয়েছেন পালিত পশু সমু হতে তার ছবি হোক আগে তোমরা তা হতে আহার করো দুস্থ অভগ্রস্তকে আহার করাও।
আয়াত ৩৩.এই সমস্ত গৃহপালিত পশুতে এক নির্দিষ্টকালের জন্য তোমাদের জন্য বহুবিধ উপকার আছে অতঃপর ওদেরকে কুরবানী স্থান প্রাচীন গৃহের নিকট কাবা আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য ধর্মানুষ্ঠান নির্ধারণ করে দিয়েছি তিনি পালিত পশু হতে তাদের যা দান করেছেন তা হতে যেন তারা আল্লাহর পথে দান করে।
আয়াত ৩৭.আল্লাহর নিকট ওদের মাংস ও রক্ত পৌঁছায় না বরং তোমাদের ধর্মনিষ্ঠা তার নিকট পৌঁছায় এইরূপে তিনি ওদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এই জন্য যে তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন সুতরাং তুমি সুসংবাদ দাও সৎকর্মশীলদের।
তবে চার ধরনের পালিত পশুর কুরবানী নিষিদ্ধ
বহিরা: যে গাভীর দুধ কোন ধর্মীয় স্থানের জন্য মানব করা হয়েছে।
সায়বা:যে পশুকে দেব দেবীর নামে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
ওয়াছিলা: যে উটনি মর্দা বাচ্চা প্রসব করেছে।
হ্যাম: যে পুরুষ পশুকে বর দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।
কোরবানী সম্পর্কিত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
১। ১০ই জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ ই জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যায়। তবে প্রথম দিন কোরবানি করা উত্তম। ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করলে কোরবানি হবে না এবং রাতের বেলায়ও কোরবানি করা মাকরুহ।
২। শরীকী কুরবানীর ক্ষেত্রে সকলের নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে এবং সকলের হালাল পয়সা হতে হবে। যদি কোন একজন হারাম পয়সা বা গোশত ভক্ষণের নিয়তে কোরবানি করে, তবে কারোরই কোরবানি হবে না।
৩। ভাগে কোরবানির সকলের অংশ সমান হতে হবে, যদি কম-বেশি হয় তবে কোরবানি জায়েজ হবে না।
৪। কোরবানির সাথে আকিকাও করা যেতে পারে, এতে কোন অসুবিধা নেই।
৫। শরীকী কুরবানীর ক্ষেত্রে পাল্লা দিয়ে মেপে গোস্ত বন্টন করতে হবে। যদি কারো কম বেশি হয় তবে কোরবানি বৈধ হবে না।
৬। কুরবানীর গোস্ত তিনভাগে ভাগ করে একভাগ নিজের জন্য, একভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য, এবং একভাগ ফকির মিসকিনের জন্য রাখাটা মুস্তাহাব। তবে যদি কেউ পূর্ণ গোশত নিজের জন্য রেখে দেয়, তবে তাও জায়েজ। কিন্তু এটা অনুচিত।
৭। কোরবানির পশু দিয়ে চাষ বা অন্য কোন কাজ করা মাকরুহ।
কার জন্য কোরবানি ওয়াজিব:
যদি কোন ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক বা যে ব্যক্তির উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব, তার জন্য কুরবানী করাও ওয়াজিব।
কখন কোরবানি দিতে হয়:
জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল হতে ১২ তারিখ পর্যন্ত কুরবানী করা যায়। কুরবানী হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি অন্যতম পদ্ধতি। আর এটা আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়।
নবী করিম (সাঃ) বলেছেন:
কুরবানীর পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে আল্লাহতালা এক একটি করে নেকি দিয়ে থাকেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
[লাইয়া না লাললাহা লুহুমুহা ওয়ালা দিমা ওয়া ওয়ালা ইয়ানালুহুত তাকওয়া মিনকুম]
অর্থাৎ -আল্লাহর কাছে তোমাদের কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত কোনটাই পৌঁছায় না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা খোদাভীরুতা।
সহি কুরবানীর আকিদা:
সহীহ মুসলিম শরীফ :
(হাদিস নম্বর ৩০১৮ থেকে ৩০৬৫)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম প্রতি সাতজনের পক্ষ হইতে একটি উট এবং প্রতি সাত জনের পক্ষ হইতে একটি গরু কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন।
কুরবানীর জন্য কোন পশু উত্তম:
সুনানে আবু দাউদ: পৃষ্ঠা নম্বর ৬৪৯ থেকে ৬৪৭,
১। শিং হবে নিখুঁত আর
২। পেট, বুক এবং পা হবে সাদা ও কালো রঙের।
কুরবানীর পশুর বয়স:
ক। উটের জন্য কমপক্ষে পাঁচ বছর
খ। গরু/ মহিষের জন্য কমপক্ষে দুই বছর
গ। বকরী ও ভেড়ার জন্য কমপক্ষে এক বছর
ঘ। তবে দুম্বার জন্য কমপক্ষে ৬ মাস
( সুনানে আবু দাউদ হাদিস নাম্বার ২৭৮৮)
কুরবানীর জন্য অনুপযোগী পশু:
আবু দাউদ, মিশকাত শরীফ: 640 থেকে 645)
চার ধরনের পশু কোরবানি করা বৈধ নয়।
১। স্পষ্ট কানা
২। অসুস্থ ও রোগগ্রস্থ
৩। ল্যাংড়া
৪। দুর্বল যার হার বেরিয়ে গেছে।
কানকাটা, যদি ছিদ্র দেখা যায় (মুসদারা)
শিং গোড়া থেকে উপড়ানো (মুসতাসিলা)
একটা চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে (বাখকা)
খুবই দুর্বল ও কৃষ্ণকায়, যে বকরির সাথেও চলতে অক্ষম (মুশায়ইয়া)
যার পা ভেঙে গেছে (বাখরা)
কোরবানির পশুর গোস্ত সংরক্ষণ:
রাসুল সাঃ বলেছেন: ভক্ষণ করো, সদকা কর এবং কিছু সঞ্চিত রাখো।
কোরবানির পশুর গোশত ভাগের সর্বোত্তম নিয়ম হলো: এক ভাগ নিজের জন্য, আরেকভাগ আত্মীয়-স্বজন এবং অপরভাগ দরিদ্রদের জন্য: অর্থাৎ মোট তিন ভাগ করলে বেশি ভালো হয়। তবে এরকম মন্তব্য পাওয়া যায় যে, সম্পূর্ণ গোশত নিজে খেলেও কোন সমস্যা নেই। তবে এটা অনুচিত, কারণ এতে গরিবের হক রয়েছে।
কুরবানী পশুর সাত ভাগের একভাগকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যাবে কিনা:
ওলামায়ে একরাম এটাকে বিধিসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন; কেননা সাত ভাগ বলতে সাত ভাগকেই বোঝানো হয়েছে। এক ভাগকে যদি আবার দুই ভাগ করা হয় তাহলে সেটা ৮ ভাগ হয়ে গেল বিধায় কোরবানি সহি শুদ্ধ হবে না।
কোরবানির পশুর পেটে বাচ্চা থাকা প্রসঙ্গে: (সুনানে আবু দাউদ ৬৪৫ পাতা)
একবার রাসূলুল্লাহ (স.) কে এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, যদি কোরবানির পশুর পেটে বাচ্চা থাকে তবে এটাকে আমরা ফেলে দেবো? না আহার করব?
তিনি উত্তর দিলেন: যদি তোমরা চাও তবে তাহার করতে পারো, কেননা ঐ বাচ্চার মায়ের জবাইয়ের সাথেই বাচ্চা জবাই হয়ে যায়।
ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহ বলেন: কোরবানির পশুর জবাইয়ের পর যদি এর পেটে জীবিত বাচ্চা পাওয়া যায়, তবে সেটাকে জবাই করার পর তা ভক্ষণ করা বৈধ, আর যদি বাচ্চা মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, তবে তা ভক্ষণ না করাই উচিত। “
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের কুরবানীকে কবুল করে নিক, আমিন।
(সুত্র: ছহীহ বুখারী,মুসলিম, ও তিরমিজি )
লেখক: ড. মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন
শিক্ষক ও গবেষক ও প্রিন্সিপাল, শহীদ মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, কামাড়পাড়া তুরাগ উত্তরা ঢাকা।
এমএসএম / এমএসএম
কুরবানী শুধু পশু জবাই নয়, আত্মত্যাগ ও তাকওয়ার শিক্ষা-ড. মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন।
মুমিনের জীবনে হজের শিক্ষা ও প্রভাব
আমল নষ্ট করে যেসব কাজ
ইসলাম সর্বকালের সর্বাধুনিক ও চিরন্তন জীবনব্যবস্থা
আরব দেশগুলোতে হজের খরচ কতো?
কোন পশুর বয়স কত হলে কোরবানি করা যাবে
দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে যার অবদান অনস্বীকার্য
দ্বিন প্রচারে নবী-রাসুলদের নিষ্ঠা ও সততা
ইসলামে মায়ের মর্যাদা
হজ কীভাবে পালন করবেন, নিয়ম কী?
আমল নষ্ট করে যেসব কাজ
শিশুর আকিকা না করে টাকা দান করা যাবে?