ভিন্ন নাম-ঠিকানায় তিন মাসে ১৪৩ রোহিঙ্গার হাতে বাংলাদেশের পাসপোর্ট
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের সাদিয়া সুলতানা সাথি। এ গৃহিণীর বিদেশ যাওয়ার কোনো স্বপ্ন নেই, নেই পাসপোর্টও। গৃহিণী সাদিয়া সুলতানাকে টার্গেট করে তার এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করে দালাল চক্রের সদস্যরা। তার ছবি, ঠিকানা ও এনআইডি কার্ড ব্যবহার করে কক্সবাজারে থাকা উম্মে ছলিমার নামে রোহিঙ্গা নারীর পাসপোর্ট তৈরি করা হয়।
দাগি অপরাধী ও রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে জন্ম সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বানিয়ে দেওয়া শক্তিশালী একটি প্রতারক চক্রের ২৩ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এ তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ।
ডিবি পুলিশ বলছে, শুধু সাদিয়া সুলতানার মতো সাধারণ নারীসহ সাধারণ পুরুষদের এনআইডি কার্ড সংগ্রহে সক্রিয় রয়েছে দালাল চক্রের একটি গ্রুপ। সংগ্রহের পর অন্যজনের নামে অবৈধভাবে তৈরি করা হয় এনআইডি কার্ড। বিপুল ডকুমেন্টস ও ডিভাইসসহ গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ, দালাল ও দুই আনসার সদস্য।
এ কাজে প্রতারক চক্র তিনটি পর্যায়ে কাজ করে। ভুয়া জন্ম সনদ তৈরি। সেটি দিয়ে এনআইডি কার্ড তৈরি করে। আর সবশেষে সেটি দিয়ে অবৈধভাবে তৈরি করা হয় রোহিঙ্গা নাগরিকসহ দাগি আসামিদের জন্য পাসপোর্ট।
সোমবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ।
তিনি বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের একাধিক টিম রাজধানীর আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও বাড্ডায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিপুল পরিমাণ পাসপোর্ট সংক্রান্ত ডকুমেন্টস, পাসপোর্ট ও কম্পিউটারসহ তিন রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ, ১০ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে।
তাদের দেওয়া তথ্য ও সংগৃহীত ডকুমেন্টস বিশ্লেষণ করে ২৫ ফেব্রুয়ারি দিনে ও রাতে কক্সবাজার, টাঙ্গাইল ও ঢাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে দুই আনসার সদস্যসহ রোহিঙ্গা ও বাঙালি দালাল চক্রের আট জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারদের হেফাজত থেকে মোট ১৭টি পাসপোর্ট, ১৩টি এনআইডি, ৫টি কম্পিউটার, ৩টি প্রিন্টার, ২৪টি মোবাইল ফোন ও পাসপোর্ট তৈরির শত শত দলিলপত্র জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তার রোহিঙ্গারা হলেন– উম্মে ছলিমা ওরফে ছমিরা, মরিজান ও রশিদুল। রোহিঙ্গা দালাল আইয়ুব আলী ও মোস্তাকিম। আনসার সদস্য দুজন হলেন– জামসেদুল ইসলাম ও মো. রায়হান। দেশি দালালরা হলেন– রাজু শেখ, শাওন হোসেন ওরফে নিলয়, ফিরোজ হোসেন, তুষার মিয়া।
আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, উত্তরাতে গিয়ে কম্পিউটারের দোকান খুলে এ কাজে জড়িত গ্রেপ্তার অপর দালালরা হলেন– শাহজাহান শেখ, শরিফুল আলম, জোবায়ের মোল্লা, শিমুল শেখ, আহমেদ হোসেন, মাসুদ আলম, আব্দুল আলিম, মাসুদ রানা, ফজলে রাব্বি শাওন, রজব কুমার দাস দীপ্ত, আল-আমিন, মো. সোহাগ।
শক্তিশালী এ চক্র মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষদের লক্ষাধিক করে টাকার বিনিময়ে জন্মসনদ, এনআইডি ও পাসপোর্ট বানিয়ে দেয়।
গ্রেপ্তার চক্রটির একটি দল কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি থেকে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে আসে। আরেকটি দল এদের জন্য জন্ম সনদ, এনআইডি বানিয়ে দেয়। সর্বশেষে অন্য দলটি ঢাকাসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আনসার সদস্যদের মাধ্যমে ব্যাংকে এক্সপ্রেস, সুপার এক্সপ্রেস ধরনের টাকা জমা দেওয়া, বায়োমেট্রিক্স করা ও ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দেয়।
ছয় ঘণ্টার মধ্যে জন্ম সনদের জন্য এরা ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা নেয়। তিন দিনের মধ্যে এনআইডি করে দেওয়ার জন্য ২৫ হাজার টাকা এবং পাসপোর্ট তৈরি করার জন্য ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়ে থাকে বলে প্রাথমিকভাবে তারা স্বীকার করেছে।
গোয়েন্দা প্রধান বলেন, গ্রেপ্তার দালালদের মোবাইলে শত শত পাসপোর্ট করে দেওয়ার প্রাসঙ্গিক সফট ডকুমেন্টস, ডেলিভারি স্লিপ পাওয়া গেছে। যার মধ্যে গত তিন মাসে রোহিঙ্গাদের জন্য করা ১৪৩টি পাসপোর্ট ইতোমধ্যে তারা সরবরাহ করেছে। ২০১৯ সাল থেকে চক্রটি রোহিঙ্গাদের, বাংলাদেশি দাগি অপরাধীদের ভিন্ন নাম ও ঠিকানায় হাজার হাজার পাসপোর্ট করে দিয়েছে বলে জানা গেছে।
হারুন বলেন, গ্রেপ্তাররা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও বরিশাল জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে জন্ম সনদ ও এনআইডি বানিয়ে তার ভিত্তিতে পাসপোর্ট বানিয়ে থাকে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি অনুশীলনে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ডাটা, ডিজিটাল জন্ম সনদ ডাটা, স্মার্ট এনআইডি ডাটা ব্যাংক আছে, যেখানে বিভিন্ন বায়োমেট্রিক্স, ছবিসহ নানা তথ্য সংরক্ষিত। এসব তথ্য কোনোরকম ভেরিফাই না করেই ইচ্ছেমতো তৈরি করা কাগজপত্রের ভিত্তিতে পাসপোর্ট অফিসে যে কেউ দালালদের মাধ্যমে টাকা জমা দিতে, বায়োমেট্রিকস দিতে এবং পাসপোর্টের জন্য ছবি তুলতে পারে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের স্মারক পাসপোর্ট তৈরির জন্য তাৎক্ষণিকভাবে রোহিঙ্গা ডাটা, ডিজিটাল জন্ম সনদ ডাটা এবং স্মার্ট এনআইডি ডাটা ভেরিফাই করলেই রোহিঙ্গাসহ নন-বাংলাদেশিদের শনাক্ত করা সম্ভব।
পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে তো এসবি পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ করে। তখন কেন ধরা পড়ে না– জানতে চাইলে হারুন বলেন, ধরা পড়বে কি করে? একজনের হাতে জন্ম সনদ, এনআইডি তুলে দেওয়ার পর সে যখন জরুরিভিত্তিতে পাসপোর্ট করতে দেবে তখন তো পুলিশ দেখে মোবাইল নম্বর। সেই নম্বরে যোগাযোগ করলে সে সব বলে দেয়, কারণ তাকে তো সব শেখানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বর্তমান ঠেকাতে যায়। রোহিঙ্গা নাগরিক স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজার দিলেও বর্তমান ঠিকানা সে ব্যবহার করে।
পাসপোর্টসহ হাসপাতাল ও সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে আনসার সদস্যরা কাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় দালালদের সঙ্গে মিলে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। আপনার এবার দুই আনসার সদস্যকে গ্রেপ্তারও করেছেন। তাদের ব্যাপারে তদন্ত করবেন কি না– জানতে চাইলে ডিবি প্রধান বলেন, আরও কেউ জড়িত আছে কি না তা তদন্ত করে দেখছি। বিষয়টি আমরা আনসারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।
পাসপোর্ট জালিয়াতি কিংবা অবৈধভাবে পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কেউ জড়িত থাকার তথ্য আপনারা পেয়েছেন কি না– জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। আমার মনে হয় এভাবে হাজার হাজার পাসপোর্ট রোহিঙ্গারা নিয়ে যাচ্ছে, দাগি আসামিরা নিচ্ছে। অথচ কোনো ভেরিফিকেশন করা হয় না, তাদের ডাটাবেজে তো দেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গাদের সবার বিস্তারিত ডাটা রয়েছে।
দাগি আসামিদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দাগি আসামি এভাবে পাসপোর্ট করেছে। তাদের নাম পরিচয় আমরা তদন্তের স্বার্থে জানাচ্ছি না। গ্রেপ্তারদের আদালতে সোপর্দ করে আবেদন করা হলে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে আরও যারা যারা জড়িত তাদের নাম পরিচয়ও বেরিয়ে আসবে।
এমএসএম / এমএসএম
বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারতের যতটা আগ্রহ আছে যুক্তরাষ্ট্রের ততটা নেই
পর্যটন নিরাপত্তায় ২৫২৬ নতুন জনবল চায় ট্যুরিস্ট পুলিশ
পূর্বাচল ৩০০ ফিটে উচ্ছেদ অভিযান, সরানো হলো ২০ বিলবোর্ড
ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৬০৮
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ৪০৬১ মামলা, ১০০০ গাড়ি ডাম্পিংয়ে
জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে
ডিমের বাজারদর মনিটরিং-উচ্ছেদ পরিচালনা, জরিমানা ১৫ হাজার টাকা
যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইয়ের চেষ্টা, দুজন আটক
ফুটপাত পুনর্দখল রোধে কঠোর অবস্থানে ডিএনসিসি : প্রশাসক
গঙ্গা নদীর পানি বাড়তে পারে, কমবে যমুনার
হামের উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু
শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না : দীনেশ ত্রিবেদী