ঢাকা সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

ইসলামে সর্বজনের হিতাকাঙ্ক্ষা


ডেস্ক রিপোর্ট  photo ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২৭-৪-২০২৬ দুপুর ১১:৬

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি লক্ষণীয় বাস্তবতা হলো, সরকারের সমালোচনাকে প্রায়ই সরকারদল বা ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। অথচ এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
রাষ্ট্র ও সরকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, আর সরকারদল একটি রাজনৈতিক সত্তা। যেমন— একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক ব্যক্তি হিসেবে এক পরিচয় বহন করেন, আবার প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত হলে তিনি আরেকটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেন।
ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমের সমালোচনা মানেই তার ব্যক্তিগত সমালোচনা নয়। একইভাবে সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধিতা বা দলবিরোধিতা নয়; বরং এটি একটি দায়িত্বশীল নাগরিক চর্চা।
প্রকৃতপক্ষে অনেক সমালোচনার উৎস থাকে হিতাকাঙ্ক্ষা। সরকার পরিচালনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, নীতি ও কার্যক্রমের পর্যালোচনা এবং গঠনমূলক সমালোচনা রাষ্ট্রকে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সহায়তা করে।
সমালোচনা এখানে ধ্বংসাত্মক নয়; বরং এটি সংশোধন, পরিমার্জন ও উন্নয়নের একটি অপরিহার্য উপায়। যে সমাজে সমালোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়, সেখানে ভুলের পুনরাবৃত্তি ও অদক্ষতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইসলামের দৃষ্টিতে এই হিতাকাঙ্ক্ষার ধারণাটি অত্যন্ত মৌলিক। জনগণের কল্যাণ কামনা এবং শাসকের প্রতি গঠনমূলক সমালোচনা একই ধারার অংশ।
এ ধারণাকে একটি শব্দে প্রকাশ করলে তা হলো ‘আন-নাসিহাত’। ইসলামী শিক্ষায় নাসিহাত মানে শুধু উপদেশ দেওয়া নয়; বরং আন্তরিক কল্যাণকামিতা, সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা এবং সঠিক পথে পরিচালনার চেষ্টা। নবীজি (সা.) এই নাসিহাতকেই দ্বিনের মূলভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, দ্বিন হলো নাসিহাত। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, কার জন্য? তিনি বলেন, আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য, মুসলিম শাসকদের জন্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৫)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে শাসকদের প্রতি নাসিহাত বা গঠনমূলক সমালোচনা কোনো বিরোধিতা নয়; বরং এটি দ্বিনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইভাবে শাসক বা সরকারের পক্ষ থেকেও জনগণের কল্যাণে সংশোধনমূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করা নাসিহাতের অন্তর্ভুক্ত।
অতএব সরকারি কার্যক্রমের ক্রিটিককে নেতিবাচক বা শত্রুতামূলক দৃষ্টিতে না দেখে, বরং হিতাকাঙ্ক্ষা ও নাসিহাতের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, যেখানে ভিন্নমত ও সমালোচনাকে সম্মান করা হবে। এ ধরনের চিন্তা একটি সুস্থ, জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্মাণে সহায়ক।
তবে সব সমালোচনা হিতাকাঙ্ক্ষামূলক হয় না। গঠনমূলক ও গ্রহণযোগ্য সমালোচনার কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরি।
১. সংশোধনের উদ্দেশ্য থাকা : সমালোচনার মূল লক্ষ্য হবে ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়; বরং তা সংশোধনের পথ উন্মুক্ত করা। বিদ্বেষ বা হেয়প্রতিপন্ন করা নয়; বরং উন্নয়নই হবে এর কেন্দ্রবিন্দু।
২. দিকনির্দেশনামূলক হওয়া : শুধু ত্রুটি চিহ্নিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কিভাবে তা সংশোধন করা যায় সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদানও জরুরি।
৩. বিকল্প পদ্ধতির প্রস্তাব থাকা : সমালোচনার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর বিকল্প উপস্থাপন করা হলে তা আরো গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ হয়।
৪. শালীনতা ও ন্যায়বোধ বজায় রাখা : ভাষা, ভঙ্গি ও উপস্থাপনায় সংযম থাকতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমান পরিহার করে ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।
৫. জনকল্যাণকেন্দ্রিক হওয়া : সমালোচনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে জনগণের কল্যাণ এবং সমাজের উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো সমুন্নত রেখে করা সমালোচনা প্রকৃত অর্থেই হিতাকাঙ্ক্ষা বা নাসিহাত হিসেবে গণ্য হতে পারে। আর এমন সমালোচনাকে স্বাগত জানানোই একটি পরিণত, আত্মবিশ্বাসী ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের লক্ষণ।

 

Aminur / Aminur