ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

এলডিসি উত্তরণে বাড়তে পারে অর্থনৈতিক সংকট, বড় ধাক্কা রফতানি খাতে


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬-৭-২০২৬ দুপুর ১০:৪৩

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু এই অর্জনের পরই দেশের অর্থনীতি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানো, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, রফতানিতে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ— সব মিলিয়ে এলডিসি-পরবর্তী সময় স্বল্পমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।  

এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে জাতিসংঘের কাছে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত করার আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। সরকারের যুক্তি, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত সময় বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

এদিকে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমানও মনে করেন, এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখনই দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার, বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের রফতানি ও বিনিয়োগ বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে। 

সংকটের মুখে নতুন বাস্তবতা 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনীতিকে দুর্বল করে রেখেছে। 

এর সঙ্গে যদি এলডিসি হিসেবে পাওয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সুবিধাগুলো একযোগে হারিয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।  

সরকারি প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলো যদি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে ফেলে, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি পণ্য বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। 

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুশ্রম, জোরপূর্বক শ্রম এবং অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে কঠোর নীতির কারণে বাংলাদেশের রফতানিতেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। 

সবচেয়ে বড় ধাক্কা রফতানি খাতে  

বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করছে।  

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই বিশেষ সুবিধার বড় অংশ শেষ হয়ে যাবে। ফলে একই পণ্য রপ্তানিতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শুল্ক সুবিধা হারানোই নয়, রুলস অব অরিজিন, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশনের মতো কঠোর শর্ত পূরণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। 

টেক্সটাইল শিল্পে বাড়ছে উদ্বেগ 

দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পকে এলডিসি-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, শুধু প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতেই প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। এই শিল্প স্থানীয়ভাবে সুতা ও কাপড় সরবরাহ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক রাখছে এবং বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে। 

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সুতা আমদানি দ্রুত বাড়ায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো চাপে পড়েছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এখনই নীতিগত সহায়তা না মিললে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় শিল্প আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে পোশাক শিল্প আমদানিনির্ভর হয়ে যাবে, উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাবে। 

বিনিয়োগ ও ব্যাংক খাতেও ঝুঁকি 

এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা ও সহজ শর্তের ঋণ ধীরে ধীরে কমে যাবে। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও পরিশোধ ব্যয়ও বাড়তে পারে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, এতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হবে। অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

অপরদিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ইতোমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তারল্য সংকটের কারণে নতুন শিল্পে ঋণ বিতরণও সীমিত হচ্ছে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়াতে আরও সময় লাগতে পারে।  

সরকার কেন সময় চাইছে 

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের সময় তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে। 

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, অতিরিক্ত সময় কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন এবং টেকসই উত্তরণের জন্য এটি অপরিহার্য। 

তিনি বলেন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং বৈশ্বিক অভিঘাতের কারণে বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশগুলোর প্রস্তুতির জন্য আরও সময় প্রয়োজন। 

সংস্কার ছাড়া উত্তরণ কঠিন 

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। রফতানি ও প্রবাসী আয় অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখলেও শিল্প খাতের ধীরগতি, জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে। 

তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারের রাজস্ব বাড়ানো এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। 

একই সঙ্গে এলডিসি-পরবর্তী বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। 

অবকাঠামো ও বাণিজ্য সহজ করার আহ্বান 

মাহবুবুর রহমান ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে আধুনিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাবও দিয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে উঠলে পণ্য পরিবহন দ্রুত হবে, ব্যবসার ব্যয় কমবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। 

তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, পর্যটন এবং সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোরও আহ্বান জানান। 

সামনের পথ কী 

অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য যেমন মর্যাদার অর্জন, তেমনি এটি একটি কঠিন অর্থনৈতিক পরীক্ষাও। 

শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ধাক্কা মোকাবিলায় রফতানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সৃষ্টি, দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন, স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। 

বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে। 

বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করা না গেলে এলডিসি থেকে উত্তরণ দেশের জন্য গৌরবের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে নতুন অর্থনৈতিক সংকটও ডেকে আনতে পারে। তবে প্রস্তুতি, সঠিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই চ্যালেঞ্জই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিতে পারে। 

Parna / Parna