মেসির পায়ের আওয়াজে দুঃখী মানুষের আনন্দ
যুদ্ধে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল দেয়ালে। ৮৪ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা পিছিয়ে ছিল ১–০ গোলে। লিওনেল মেসি তখন মাঠে যেন ব্যস্ত এক ‘নাইট’। ইংলিশ রক্ষণ চিরতে পা দুটো চলছিল চাকুর মতো। কে বলবে, ৩৯ বছর বয়সী এই মানুষটাকে আর্জেন্টিনায় কেউ কেউ এখনো সেই ছোট্ট কিশোর ছেলেটি ভাবেন!
সেই ছেলেটি—আর্জেন্টাইন ফুটবলে কল্পনার মানসপুত্র ‘এল পিবে’ বা ইংরেজিতে ‘দ্য কিড’। বিশ শতকে প্রথম দশকে ব্রিটিশদের শৃঙ্খলাবদ্ধ খেলার শিকল ভেঙে নিজেদের খেলার নিজস্ব একটা ধারা তৈরি করতে চেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সে ভাবনায় সবার আগে দরকার ছিল আর্জেন্টাইন ‘আইডেনটিটি’র মডেল। ‘এল গ্রাফিকো’র সম্পাদক রিকার্দো লোরেঞ্জো ‘বোরোকোতো’ ১৯২৮ সালে তাঁর লেখায় ‘এল পিবে’র ধারণা দেন।
কেউ কেউ দাবি করতেন, ডিয়েগো ম্যারাডোনা ‘এল পিবে’র শ্রেষ্ঠ রূপকার। এখন বোধ হয় সেই দাবিতে তেমন একটা জোর নেই? চার বছর আগে কাতারেই বিশেষণটি মেসি নিজের করে নিলেও তাঁর আর বড় হয়ে ওঠা হলো না! এখনো সেই ‘এল পিবে’ই আছেন।
আটলান্টায় শেষ বাঁশি বাজার পর ‘এল পিবে’ হওয়ার অন্যতম শর্ত—আর্জেন্টাইন আবেগ ঠিকরে বেরোল তাঁর চোখে–মুখে। কিংবদন্তি আনন্দের আতিশয্যে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন মাঠে। তখন আর তিনি সেই নাইট নেই, যে কিছুক্ষণ আগে ইংলিশ দুর্গ ভেঙেছেন দুটি গোল বানানো পাসে।
মেসি তখন আর্জেন্টিনার প্রতিটি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিচ্ছবি। সেই সব দুঃখী মানুষ, সারা দিন উদয়াস্ত খেটে রাতের ঘুমের আগে কল্পনায় যাঁরা স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের প্রতিনিধি হয়ে কেউ একদিন পৃথিবীর ওপর ছড়ি ঘোরাবে।
মেসির হাতে, দুঃখিত পায়ে, সে ছড়ি শোভা পাচ্ছে কাতার কিংবা তারও আগে থেকে। কিন্তু লোকের চোখে সেই রাজাই তো শ্রেষ্ঠ, বড় কোনো যুদ্ধ জিতে যাঁর সবার আগে দেশের মানুষকে মনে পড়ে। মেসিরও মনে পড়ল, প্রান্তিক মানুষদের কথা সবার আগে।
টিওয়াইসি স্পোর্টসকে কিংবদন্তি বললেন, ‘দেশের মানুষকে আমরা আনন্দ দিতে পেরেছি—এতেই আমরা গর্বিত ও আনন্দিত। দেশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের চাকরি নেই, সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে জীবনযুদ্ধে—এমন জীবনই তো আমাদের চিরকাল পার করতে হয়েছে। সেসব মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা, আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা এবং টানা দুবার এই কীর্তি গড়া অসাধারণ ব্যাপার।’
আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কি দাহকালের দিনগুলো মনে আছে? যখন আকাশি–সাদায় টানা ব্যর্থতায় সন্দেহ পোষণ করা হতো মেসি আদতেই আর্জেন্টাইন সত্তা ধারণ করেন কি না? জাতীয় সংগীত গান কি না!
কালের খেয়া কতটা রসিক দেখুন, সেই মেসিই এখন আর্জেন্টাইনদের মন সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারেন। ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ডিয়েগোর ‘হ্যান্ড অব গড’, বেকহামের লাল কার্ড—আগুনে সব স্মৃতির ধোঁয়ায় নাক ডুবিয়ে মেসি জানতেন বিশ্বকাপের ফাইনাল ফিফার সূচি, কিন্তু আর্জেন্টাইনদের ‘ফাইনাল’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই ম্যাচটাই। জিততেই হবে, কোনো ‘অথবা’ নেই।
মেসি সেই ‘অথবা’ রাখেনওনি। প্রথমার্ধে ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি উসকে কথা–কাটাকাটিতে জড়ান জুড বেলিংহামের সঙ্গে। যেন ‘কিংডম অব হেভেন’ সিনেমার দুই নাইটের দ্বন্দ্ব, যেখানে মেসি মুখ বাঁকিয়ে ইংলিশ ‘নাইট’কে বুঝিয়ে দেন, বিশ শতকেই তোমাদের শৃঙ্খলার শিকল আমরা ভেঙেছি, বহু দ্বন্দ্ব–দ্বৈরথ পেরিয়ে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে ব্যাপারটা আর প্রীতিসম্মেলন নেই।
বেলিংহামের চোখে চোখ রেখে মেসির সেই শব্দগুলো তাই আর্জেন্টাইনদের যে গোল করার পরিতৃপ্তি দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। আর্জেন্টাইনরা তো জীবনভর এমন নেতাই চেয়েছে, যে তাদের মন বুঝবে।
আর মেসি হয়তো চেয়েছেন ইংলিশদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই বুঝিয়ে দেওয়া, ৪০ বছর আগে তারা ‘ঈশ্বরের হাত’ দেখলেও পরবর্তী আর্জেন্টাইন ‘ঈশ্বরের পা’ দেখার লগ্ন এ ম্যাচ। সে জন্যই বুঝি এনজো ফার্নান্দেজের গোলের উৎস মেসির বাঁ পা। আর লাওতারো মার্তিনেজের গোলে ডান পা। জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ আসলে ফক্স স্পোর্টসকে সেমিফাইনালের আগে ভুল বলেছিলেন। সুইডিশ কিংবদন্তি ভেবেছিলেন, ইংল্যান্ড এই ম্যাচে ‘ঈশ্বরের বাঁ পা’ দেখবে।
Parna / Parna
বাংলাদেশকে হারিয়েও সন্তুষ্ট নয় জিম্বাবুয়ে
ইংল্যান্ড যেভাবে ‘নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছে’
১৯ বছর আগে কোলে নেওয়া সেই শিশু এবার বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসির মুখোমুখি
ফিফার বাড়তি সুবিধা পাওয়া নিয়ে যা বললেন মেসি
বিশ্বকাপ ফাইনালের চেয়েও লাউতারোর কাছে মূল্যবান যে বিষয়
সেমিতে ১২টি ফাউল করেও মাত্র ১টি কার্ড দেখে আর্জেন্টিনা
মেসির পায়ের আওয়াজে দুঃখী মানুষের আনন্দ
‘এই স্মৃতি অনেক দিন তাড়িয়ে বেড়াবে’
অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করল এফবিআই
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড, যুদ্ধ-বিতর্ক ও আবেগের লড়াইয়ে জিতবে ফুটবল!
আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে বড় সুখবর পেল ইংল্যান্ড