ঢাকা সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

১৯ জুলাই : কারফিউ-সেনা মোতায়েনের দিন, ইন্টারনেটহীন দেশে ছিল লাশের সারি


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯-৭-২০২৬ দুপুর ১০:৩২

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত, ভয়াবহ দিনগুলোর একটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির এই দিনে রাজপথ পরিণত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা কার্যত বন্ধ রেখে রাত ১২টা থেকে জারি করা হয় কারফিউ, মাঠে নামানো হয় সেনাবাহিনী। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হতাহত ও সহিংসতার ঘটনায় রাজপথ হয়ে ওঠে উত্তাল।

আগের দিন ১৮ জুলাই দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ও গুলিতে শতাধিক প্রাণহানির পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন ১৯ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকার সমর্থকদের নিপীড়ন আরও নির্মম হয়ে ওঠে।

১৯ জুলাই শিক্ষার্থী ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দিনভর ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি করা হয়। হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ মানুষের ঢল নামে। আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের। সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অ্যাম্বুলেন্সে করে মিনিটে মিনিটে সাইরেন বাজিয়ে আসতে থাকে গুলিবিদ্ধ মানুষ। অ্যাম্বুলেন্স ছাড়াও রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আনা হয় অনেক আহত-নিহত বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষকে। গুলিবিদ্ধদের ভেতর নারী-শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সীরাই ছিলেন। ঢাকার অনেক বেসরকারি হাসপাতালেও ছিল একই দৃশ্য। অনেক হাসপাতালে আবার আহতদের চিকিৎসার দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেয় সরকার সমর্থকেরা।

সারাদেশে নিহত ৬৭

এর আগে টানা পাঁচ দিন ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দেশজুড়ে যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। তথ্যপ্রবাহ সীমিত হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যে দেখা যায়, ১৯ জুলাই প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব থাকলেও এটি ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিনগুলোর একটি। ১৯ জুলাই নিহত হন অন্তত ৫৬ জন এবং ১৭ থেকে ১৯ জুলাই এই তিন দিনে প্রাণ হারান ১০৩ জন।

কারফিউ জারি ও নাহিদ ইসলামকে আটক

রাতে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, বিজিবির ডিজি ও ডিএমপি কমিশনার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুক্রবার (১৯ জুলাই) রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েন করা হয়। মধ্যরাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আটক করা হয়। সেদিন বিআরটিএ ভবন ও পিবিআই কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারি স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকায় মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ডিএমপি।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৯ জুলাই সকাল থেকেই দ্বিতীয় দিনের মতো ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালনে রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। পরে রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, রামপুরা, উত্তরা ও মহাখালীতেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ঘিরেও রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে প্রেসক্লাব ও পল্টন এলাকাজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষের চিত্র দেখা যায়।

ঢাকার বাইরে খুলনার শিববাড়ী, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুরে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গোলযোগের মধ্যে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। কারা কর্মকর্তা ও কারারক্ষীদের জিম্মি করে সেখান থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

শুক্রবার দিনভর সংঘর্ষে শুধু হতাহত নয়, অনেক সরকারি-বেসরকারি ভবন ও স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। রামপুরা থানা ও রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ি, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে পূরবী পর্যন্ত পাঁচটি পুলিশ বক্সে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। বনানীতে বিআরটিএ-এর সদর কার্যালয়, মিরপুরে অবস্থিত সংস্থাটির মেট্রো-১ কার্যালয়, মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুরে বিআরটিএ অফিসে থাকা বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।  

হেলিকপ্টার থেকে গুলি

১৯ জুলাই মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনে ভাঙচুর চালানো হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যান চলাচল করতে দেখা যায়নি। ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক অনেক ফ্লাইট বাতিল করা হয়। ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল চলাচলও বন্ধ ছিল।  

আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হয়। তবে র‍্যাবের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। র‍্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘তারা আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। হেলিকপ্টার থেকে কোনো গুলি ছোড়া হয়নি, বরং উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়েছে।’  

সরকারের সঙ্গে বৈঠক ও ৯ দফা

রাজনৈতিক অঙ্গনেও দিনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সরকারের তিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সহসমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম। সরকারের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।  

বৈঠকে আন্দোলনকারীরা প্রথমে ৮ দফা এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, দুই মন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।  

৮২৬ কয়েদির পলায়ন

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনের পেছনে বিএনপি-জামায়াতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আন্দোলনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সময়ে ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ ব্যানারে রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন অভিভাবকেরা।  

দিনটির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা। বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় কারাগারের গেট ভেঙে শত শত বন্দি বেরিয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়ে যায় এবং কারাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করা হয়। পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনের কয়েকজন সদস্যও ছিলেন বলে পরে জানানো হয়। এই ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।  

১৯ জুলাই শুধু একটি সংঘর্ষময় দিন ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। কারফিউ, সেনা মোতায়েন, দেশব্যাপী প্রাণহানি, নরসিংদী কারাগারে হামলা, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক দাবির উত্থান– সব মিলিয়ে দিনটি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তি তৈরি করে। জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসে ১৯ জুলাই স্মরণীয় হয়েছে রক্তাক্ত ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণী দিন হিসেবে।

Parna / Parna

বাংলাদেশ–ইউনান সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা, বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি ইউয়ান

বাড্ডায় নির্মাণাধীন ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কিশোর শ্রমিকের মৃত্যু

১০ হাজার ব্যাংকারের পুনর্বহালের দাবিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

দেশের সব টোল ব্যবস্থাকে এক নেটওয়ার্কে আনার উদ্যোগ

প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর বিশ্বমঞ্চে নতুন ইতিহাসের সূচনা

জামায়াতের চিঠিতে এমপি নজরুলের পদ শূন্য করার সুযোগ নেই : ইসি সচিব

আইজিপিসহ পুলিশ পদক পাচ্ছেন ৯২ পুলিশ সদস্য

দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না : প্রতিমন্ত্রী

জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির

চুরির টাকার ভাগ সাড়ে ৪ লাখ করে, কেউ বানিয়েছেন আসবাবপত্র কেউ অটো রিকশা

‘বিশ্বমঞ্চে দেশের মানুষের কথা বলবেন তারেক রহমান’

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ইউএনএইচসিআরকে সহায়তা করবে ফ্রান্স