ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

একটি ব্যাংকের সমস্যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯-৯-২০২৬ দুপুর ২:৩৭

কোনো একটি ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়তে পারে। তাই ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে সামগ্রিক বা সিস্টেমিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। এমন মন্তব্য করেছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, আগে খেলাপি ঋণকে মূলত সরকারি ব্যাংকগুলোর সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন বেসরকারি ব্যাংকসহ পুরো ব্যাংকিং খাতেই এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণে বিষয়টিকে কোনো একটি ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগরে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘ইন-ডেপথ ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস অব ব্যাংকিং সেক্টর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে মূল ব্যবসা অর্থাৎ ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে। এভাবে ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও তা ব্যাংকের মূল ব্যবসার শক্তি বা সক্ষমতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।

তিনি বলেন, গত দুই বছরে ব্যাংকিং খাতে মুনাফার ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় বিভিন্ন ব্যাংক উল্লেখযোগ্য অর্থ আয় করেছে। একই সঙ্গে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করেও ব্যাংকগুলো আয় করেছে। ফলে কোনো কোনো ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম কমলেও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বেড়েছে এবং মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের মূল ব্যবসা হলো অর্থ সংগ্রহ করে তা ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করা এবং সেখান থেকে সুদ আয় করা। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকের মুনাফা বিশ্লেষণের সময় বিনিয়োগ থেকে আসা আয় এবং সুদ আয়কে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম বা নিট সুদ আয়কে আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও সামনে প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে নীতিগত সহায়তার আওতায় দেওয়া ঋণের একটি অংশ এখন খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছু ঋণকে এখন পর্যন্ত নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) হিসেবে দেখানো সম্ভব না হলেও ভবিষ্যতে সেগুলোর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে ব্যাংকের প্রভিশন ব্যয় বাড়বে।

এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত বা কোল্যাটেরাল খুঁজতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া ঋণের বড় অংশই নগদ অর্থায়ন বা ক্যাশ ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে ঋণ আদায়ে সমস্যা দেখা দিলে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে। এতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তারল্য পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগের পরিসংখ্যান দেখে শুধু তারল্য ভালো রয়েছে-এমন সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। কোনো ব্যাংকের বিনিয়োগের বড় অংশ যদি ইতোমধ্যে আটকে যায়, তাহলে কাগজে-কলমে তারল্য থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

তিনি বলেন, ব্যাংক আমানত নিলে সেই অর্থ বিনিয়োগ করে আয় করতে হয়। আমানত নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। বর্তমানে অনেক ব্যাংক আমানত সংগ্রহের পর সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করছে। এর ফলে ঋণ ও অগ্রিমের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজ ব্যাংকের সম্পদে বড় জায়গা করে নিচ্ছে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নীতি সুদহার কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে আন্তব্যাংক সুদের হারও কমছে। অনেক ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপোর পরিবর্তে আন্তব্যাংক বাজার থেকে অর্থ ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতে নীতি সুদহার আরও কমলে ব্যাংকের আয় ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

সরকারের ঋণ নেওয়া ও পরিশোধের সক্ষমতার বিষয়টিও ব্যাংক খাতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু সরকারকে একসময় এসব ঋণ পরিশোধ করতে হবে। একই সময়ে সরকারের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা ও কর-জিডিপি অনুপাত নিয়েও চাপ রয়েছে। ফলে সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সেই অর্থ পরিশোধের জন্য স্থানীয় সম্পদ বা রাজস্ব থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন হবে।

বিদেশি মুদ্রার সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এমটিবির এমডি। তিনি বলেন, আগে দেশে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসত, তা দিয়ে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল-দুই ধরনের অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হতো। এখন বিদেশি বিনিয়োগসহ আর্থিক হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই সক্ষমতা আগের মতো নেই। সামনে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ব্যাংকের মুনাফা ধরে রাখতে তহবিলের খরচ বা কষ্ট অব ফান্ড কমানো গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, কোনো ব্যাংকের আমানতের খরচ যদি বেশি হয়, তাহলে শুধু ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করা সম্ভব নয়। কারণ এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খরচও যুক্ত থাকে। তাই ব্যাংকের প্রকৃত মার্জিন বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু ঋণের সুদ ও আমানতের সুদের পার্থক্য দেখলে হবে না; ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোও বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, একটি ব্যাংককে ভালো গ্রাহক ধরে রাখতে হলে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব থাকতে হবে। তাই ব্যাংকের প্রকৃত খরচ ও আয়-দুটিই বিবেচনায় নিয়ে মার্জিন নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত বিভিন্ন হিসাব ও সূচক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষণেও যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ব্যাংক খাতের বর্তমান সমস্যাগুলো মোকাবিলায় দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তার মতে, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো তৈরি করা হলে সেখানে পর্যাপ্ত মূলধন, বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ‘হেয়ারকাট’ বা সম্পদের মূল্যে সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

তবে শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি। এর পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের সমস্যা আবার তৈরি না হয়, সে জন্য কার্যকর সংস্কার ও কঠোর শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এখন ব্যাংক খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে প্রতিটি ব্যাংকের ব্যালেন্সশিট সঠিকভাবে নির্ণয় করা, সক্ষম ও কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডও অনুসরণ করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন সিএফএ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মাহতাব ওসমানী ও নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের মো. মিনহাজ জিয়া। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএফএ সোসাইটির সেক্রেটারি এস এম গালিবুর রহমান।

aliul / aliul

একটি ব্যাংকের সমস্যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত

বাড়ল সোনার দাম

বাড়লো সোনার দাম

সেপ্টেম্বরের ১৭ দিনে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ৪০ হাজারের বেশি

বাজারে সবচেয়ে দামি সবজি শিম, বেগুন ১৪০ টাকা

কয়েক দোকান ঘুরেও মিলছে না সয়াবিন তেল

সোনা ও রুপার গহনা বাজারে আজ যে দামে মিলবে

ডিমের দাম ডজনে কমেছে ১০ টাকা, স্বস্তি ফেরেনি মাছ-মুরগিতে

ব্যাংকের মালিকানায় লাগাম, অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রিতে ৬ মাস সময়

বন্ধ শিল্প চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার স্কিম, ঋণে সুদ ৭%

অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের টাকা সঙ্গে সঙ্গে যাবে মার্চেন্টের অ্যাকাউন্টে

ব্যাংকগুলোকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হজ নিবন্ধন শেষের কড়া তাগিদ

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে মুনাফা ১১.৬৮ থেকে ১১.৭২ শতাংশ ঘোষণা