ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬

রমজানের প্রস্তুতি যেন না ভুলি


ডেস্ক রিপোর্ট  photo ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৯-২-২০২৬ দুপুর ১০:৫০

অফুরন্ত রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে রমজান। এই মাসটিকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে আমাদের প্রস্তুতির প্রয়োজন। পৃথিবীতে বড় কোনো কাজ করতে যেমন আমরা পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে থাকি, নবীজি (সা.) রমজানের দুই মাস পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতেন। 
আত্মিক ও মানসিকভাবে রমজানকে স্বাগত জানাতে ব্যাকুল হয়ে থাকতেন। রমজানে মাসব্যাপী সিয়াম পালনের জন্য তিনি শাবান মাস থেকে অধিক হারে রোজা রেখে দৈহিক প্রস্তুতি নিতেন। 
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শাবান মাসের তুলনায় অধিক পরিমাণ রোজা পালন করতে অন্য কোনো মাসে দেখিনি। তিনি শাবানের প্রায় পুরোটাই রোজায় অতিবাহিত করতেন, কিছু অংশ ব্যতীত পুরো শাবান মাস রোজা রাখতেন (মুসলিম : ১১৫৬)। অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজিকে রমজান এবং শাবান মাস ব্যতীত ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখতে দেখিনি। (তিরমিজি : ৭৩৬; নাসায়ি : ২৩৫২)
এ হাদিসের আলোকে এ কথা পরিষ্কার যে, নবী করিম (সা.) এই মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন। মুহাদ্দিসরা বলেন, এই মাসে বেশি বেশি রোজা রাখার কারণ হচ্ছে, এই মাসে বান্দার আমল আসমানে তোলা হয়, যাতে রোজা অবস্থায় আমলগুলো উত্তোলন করা হয়। কেউ কেউ বলেন, শাবান ও রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাসের রোজা ফরজ নামাজের আগে ও পরে পালিত সুন্নত নামাজের মতো। রমজানের ভূমিকা হিসেবে প্রস্তুতিমূলক ইবাদত। এ কারণে এই রোজাগুলো পালন সুন্নত করা হয়েছে। (মাজমুউল ফাতাওয়া : ২০/২২)
আল্লাহর রাসুল সবসময় রমজানপ্রাপ্তির দোয়া করতেন। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) রজব মাস থেকে রমজান পাওয়ার দোয়া শুরু করতেন। 
তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান’, অর্থাৎ ‘ইয়া আল্লাহ! রজব এবং শাবানে আপনি আমাদের বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত জীবন দান করুন।’ আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) (৭২৬-৭৯৫) বলেন, নেক কাজ করার উদ্দেশ্যে মহিমান্বিত সময়গুলো পর্যন্ত বেঁচে থাকার দোয়া করা মুস্তাহাব। হাদিসে এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়।
রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে নবীজি (সা.) সাহাবায়ে কেরামকেও পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য নানাভাবে উৎসাহিত করতেন। এক হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, রমজান বরকতময় মাস, তোমাদের দুয়ারে এসে উপস্থিত হয়েছে, এই মাসের সিয়াম সাধনাকে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর ফরজ করেছেন। 
এই মাসে আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুষ্ট শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। এ মাসে একটি রাত আছে, যা হাজার মাস হতে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মহাকল্যাণ হতে বঞ্চিত হলো (নাসায়ি : ২১০৬)। আরও একাধিক হাদিসে রমজান সম্পর্কে সুসংবাদ শোনানো হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে ফজিলত ও কল্যাণ পিয়াসীরা যাতে নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে পারে।
বিগত রমজানে অসুস্থতা বা সফরের কারণে কোনো রোজা কাজা হয়ে থাকলে, সেসব আদায় করে নিজেকে মুক্ত করা। নবীজির পবিত্র স্ত্রীরা এ মাসে নিজেদের পূর্বের ছুটে যাওয়া রোজাগুলো কাজা করে নিতেন। 
এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবু সালামা (রা.) বলেন, আমি হজরত আয়েশা (রা.)-কে বলতে শুনেছি, যদি আমার ওপর বিগত রমজানের রোজা বাকি থাকত, যার কাজা আমি শাবান মাসে আদায় করে নিতাম (বুখারি : ১৮৪৯; মুসলিম : ১১৪৬)। আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, হজরত আয়েশা (রা.)-এর হাদিস প্রমাণ করে যে, এক রমজানের অনাদায়ী রোজা পরের রমজানের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা জায়েজ নেই। অর্থাৎ এক রমজানের কাজা রোজা পরবর্তী রমজান আসার পূর্বেই আদায় করা উচিত। (ফতহুল বারি : ৪/১৯১)
অনেক বুজুর্গ বিষয়টিকে এভাবে ব্যক্ত করেন ‘রজব মাস হলো বীজ বপনের মাস। শাবান ক্ষেতে সেচ দেওয়ার মাস। আর রমজান হলো ফসল ঘরে তোলার মাস।’ অন্য একজন বুজুর্গ এভাবে বলেছেন, ‘রজব মাসের উদাহরণ হলো বৃষ্টি আসার পূর্বের বাতাসের মতো। শাবান মাসের উদাহরণ আকাশে মেঘমালার মতো। আর রমজান মাস বৃষ্টির মতো। তাই যে ব্যক্তি রজব মাসে বীজ বপন করল না, শাবান মাসে সেচ প্রদান করল না, তার ঘরে কীভাবে রমজানের ফসল আসবে?’
রমজানকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানোর অন্যতম উপায় হচ্ছে, দুনিয়াবি কঠিন কাজগুলো রমজানের আগে আগে গুছিয়ে আনার চেষ্টা করা। রমজানের পূর্বে সব গুনাহ থেকে তওবা করে গুনাহের যত অনুষঙ্গ আছে, সব অনুষঙ্গ থেকে গুটিয়ে রমজানের পূর্বে নিজেকে গুনাহমুক্ত করা এবং ইবাদতে নিমগ্ন রমজান কাটানোর দৃঢ় সংকল্প করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমজানকে পরিপূর্ণ প্রস্তুতিসহ স্বাগত জানানোর, সুবর্ণ সুযোগগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে মানসিকভাবে নিজেকে গড়ে তোলার তওফিক দান করুন।

এমএসএম / এমএসএম