ঢাকা রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে যার অবদান অনস্বীকার্য


মিজানুর রহমান আরমানী photo মিজানুর রহমান আরমানী
প্রকাশিত: ১৭-৫-২০২৬ দুপুর ৪:৪০

পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে কেউ আসে কোলাহল করতে, আর কেউ আসে কুয়াশার মতো নিঃশব্দে চারপাশকে সিক্ত করতে। যারা নিঃশব্দে আসেন, তারা চলে যাওয়ার পরও রেখে যান শুভ্রতার এক অবিস্মরণীয় রেশ। আজ আপনাদের শোনাব সেই নিভৃতচারী সাধকের গল্প—মাওলানা নুরুল হুদা। যিনি আধুনিক এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি, এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

মাওলানা নুরুল হুদা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬০ সালের ২৪ ডিসেম্বর, লক্ষ্মীপুর জেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বরপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই ইলমের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ।  

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দরস নিযাম শেষে তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য ভর্তি হন চট্টগ্রামের জামেয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায়। সেখান থেকে তিনি দাওরায়ে হাদিস ও উলুমুল হাদিস সম্পন্ন করেন। হাদিসের গভীর সাগরে ডুব দিয়ে নিজেকে তৈরি করেন একজন পাকা আলেম হিসেবে।

আস্থার এক অভেদ্য দুর্গ: দত্তপাড়া আমীরুল মুমিনীন কওমি মাদরাসা

নিজ গ্রাম দত্তপাড়ায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দত্তপাড়া আমীরুল মুমিনীন কওমি মাদরাসা। নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক সুশৃঙ্খল আধ্যাত্মিক কানন। মাওলানা নুরুল হুদা সাহেব কেবল এই কাননের নিপুণ মালী নন, তিনি এর প্রতিটি ধূলিকণার স্পন্দন।  

তাঁর সুযোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি আজ ইলম চর্চার এক প্রদীপ্ত নক্ষত্রে পরিণত হয়েছে। তিনি শুধু মুহতামিম নন, তিনি এই পবিত্র আঙিনার প্রতিটি তৃষ্ণার্ত প্রাণের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ছায়া। জীবনের পুরোটা সময় ধরে তিনি দেশে ইসলামী শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে অক্লান্তভাবে নিবেদিত আছেন।

কণ্ঠে যাদু, পাঠে অমৃত: এক অনন্য শিক্ষক

শ্রেণিকক্ষে মাওলানা নুরুল হুদা সাহেবের প্রবেশ মানেই যেন জ্ঞানের এক ভিন্ন জগতের দুয়ার খুলে যাওয়া। তাঁর পাঠদানের ভঙ্গি ছিল এক কথায় জাদুকরী। কিতাবের কঠিনতম রহস্যগুলো তাঁর কণ্ঠে সহজ, সাবলীল ও শ্রুতিমধুর হয়ে ধরা দিত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছাত্ররা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর বয়ান শুনত, ক্লান্তি ছুঁতে পারত না কাউকে।  

তিনি কেবল তথ্য দেন না, বরং তাঁর প্রতিটি কথা যেন হৃদয়ের গহীনে পৌঁছে যায় তীরের মতো। জটিল মাসআলাগুলো তাঁর ব্যাখ্যায় জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠত। এই গুণটিই তাঁকে এক অনন্য মুহাদ্দিস ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আধ্যাত্মিকতার স্বর্ণসূত্র: মুফতি সাঈদ আহমদ (রহ.)-এর যোগ্য উত্তরসূরি

বংশ বা রক্ত নয়, বরং আদর্শের উত্তরাধিকারই আসল। মাওলানা নুরুল হুদা সাহেব হলেন এই সময়ের আধ্যাত্মিক রাহবার, হযরত মুফতি সাঈদ আহমদ (রহ.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ খলিফা ও রুহানি সন্তান।  

গুর সেই আধ্যাত্মিক নূর আর ইলমি গভীরতা তাঁর মাঝে পূর্ণরূপে প্রস্ফুটিত। তাঁর আলেমসুলভ অবয়বে যেমন ফুটে ওঠে পাণ্ডিত্যের গাম্ভীর্য, তেমনি তাঁর বিনয়ে মিশে থাকে আধ্যাত্মিকতার সুবাস। ইলম ও আমলের ভারে তিনি সেই ফলবতী বৃক্ষের মতো, যা যত উঁচুতে ওঠে, মানুষের জন্য ততবেশি বিনয়ী হয়ে নুয়ে পড়ে।

এতিমের পিতা ও শিশুদের পরম সুহৃদ

মাদরাসার বারান্দায় যখন তাঁর কদম পড়ে, এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হয়। ছোট ছোট শিশুরা তাঁকে ঘিরে ধরে এমনভাবে, যেন তারা তাদের শ্রেষ্ঠ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। তাঁর কাছে প্রতিটি শিক্ষার্থীই যেন নিজের কলিজার টুকরো।  

বিশেষ করে সেই সব এতিম ও অসহায় মুখগুলো—যাদের মাথার ওপর আসমান ছাড়া কোনো ছাদ ছিল না, তাদের জন্য তিনি এক অভেদ্য আস্থার প্রতীক। তিনি তাদের শুধু পড়ান না, বুক দিয়ে আগলে রাখেন।

সীমানা ছাড়িয়ে হাজারো নক্ষত্র

একজন সার্থক কারিগরের পরিচয় তাঁর নিপুণ সৃষ্টিতে। আজ মাওলানা নুরুল হুদা সাহেবের কাছে হাতেখড়ি নেওয়া হাজারো শিষ্য ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও তাঁর ছাত্ররা আজ দ্বীনের ঝাণ্ডা হাতে শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিয়োজিত।  

তিনি নিজে হয়তো প্রদীপের মতো নিভৃতে এক কোণে জ্বলছেন, কিন্তু তাঁর সেই শিখা থেকে জ্বলে ওঠা হাজারো মশাল আজ বিশ্বজুড়ে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করছে।

উপসংহার

মাওলানা নুরুল হুদা কোনো ব্যক্তি নন, তিনি একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, একটি আলোকবর্তিকা। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে প্রচারের আড়ালে থেকেও একটি জাতিকে ভেতর থেকে আলোকিত করা যায়।  

ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম জৌলুসের সাথে লেখা থাকুক বা না থাকুক, হাজারো হাফেজ-আলেমের হৃদয়ে আর এতিম শিশুর চোখের হাসিতে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। এই নিভৃতচারী সাধকের প্রতি রইলো আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

এমএসএম / এমএসএম