সহিংস উগ্রবাদ আবারও বাংলাদেশের জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের অবস্থান হবে ‘জিরো টলারেন্স’ বা কোনো ধরনের ছাড় নয়।
অফলাইন থেকে অনলাইন: উগ্রবাদ মোকাবেলায় নতুন চ্যালেঞ্জ
টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে চাইলে বাংলাদেশের জন্য স্থিতিশীলতা শুধু রাজনৈতিক লক্ষ্য নয় বরং এটি অর্থনৈতিকভাবেও সমানভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা শুধু অবকাঠামো বা বাজারের সম্ভাবনা দেখেন না, তারা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থাকেও গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে সহিংস উগ্রবাদ মানবিক, অর্থনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, জামা'আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালায়। অল্প সময়ের মধ্যে তারা ৪৫০টিরও বেশি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
ঐ ঘটনার এক দশকেরও বেশি সময় পর ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে ক্ষতিকর সন্ত্রাসী ঘটনা হয়ে ওঠে। হামলায় বেশিরভাগ বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জন জিম্মি এবং দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। বাংলাদেশ যখন বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছিল তখন এই হামলা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের আঘাত হানে।
সহিংস উগ্রবাদের অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক সময় তাৎক্ষণিক মানবিক ক্ষতির মতো চোখে পড়ে না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। জঙ্গিবাদের সাথে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়-উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো একবার সাংগঠনিক শক্তি ও আদর্শিক প্রভাব অর্জন করলে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি ধরনের হয়ে উঠতে পারে। এসব গোষ্ঠী সমাজে নিজেদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে এখনো জনপরিসরে উগ্রবাদী বক্তব্য ও প্রচারের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ এখন ডিজিটাল জগতেও ছড়িয়ে পড়েছে। উগ্রবাদী প্রচারণা এখন আর শুধু গোপন সংগঠন বা সরাসরি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী খুব দ্রুত ভুল তথ্য, উসকানিমূলক বার্তা এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অনলাইনের ক্ষোভ বাস্তব জীবনের সংঘাত বা সংগঠিত কর্মকাণ্ডে রূপ নিতে পারে। এছাড়া, বিদেশে অবস্থান করে অনলাইনে সক্রিয় থাকা কিছু ব্যক্তিত্বের ভূমিকাও এখন এই আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট অস্থির সময়ে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জনরোষ অনলাইন মাধ্যমে সংগঠিত তৎপরতা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এতে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্বের ভূমিকা ছিল। পরবর্তী অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে একটি কূটনৈতিক মিশন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশনের বাইরে সহিংস বিক্ষোভে ‘কূটনৈতিক সম্পত্তির’ ক্ষয়ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও জনবিতর্কে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অপপ্রচারকে প্রভাবশালী অনলাইন অ্যাকাউন্টগুলো কীভাবে আরও তীব্র করে তুলতে পারে সে বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
শুধু কূটনৈতিক মিশন কিংবা গণমাধ্যম নয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চাপের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বহুত্ববাদী ধারার প্রতিনিধিত্বকারী উদীচী ও ছায়ানটের মতো সংগঠনগুলো সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি ও বিতর্কের পরিসর সংকুচিত করতে চাওয়া গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতার মুখে পড়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় সতর্কতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। একটি গণতান্ত্রিক সমাজকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বৈধ রাজনৈতিক সমালোচনার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে। একইসঙ্গে, দেশ বা দেশের বাইরে-যেখান থেকেই হোক না কেন, কোনো ব্যক্তি বা প্ল্যাটফর্মকেই সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা কোনো প্রতিষ্ঠানে হামলায় উৎসাহ দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের উগ্রবাদ বন্ধে সরকারি প্রচেষ্টা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জানায় ইসলামপন্থী উগ্রবাদের ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই এবং নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের অগ্রাধিকার। তবে সমালোচক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সমন্বয়ের দুর্বলতা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে কট্টরপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অনলাইন তৎপরতা ও প্রকাশ্যে কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকেরা এসব ঘটনার কিছু ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, অনেক ঘটনা সংগঠিত সন্ত্রাসবাদের পুনরুত্থানের বদলে বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংকটের প্রতিফলন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার ঘটনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ কয়েকজন বন্দির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। পরে পালিয়ে যাওয়া অনেক বন্দিকে পুনরায় গ্রেফতার করা হলেও এ ঘটনায় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালীকরণ এবং কার্যকর গোয়েন্দা সমন্বয়ের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কারামুক্ত হওয়া এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে আদর্শিকভাবে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড ও জনপরিসরে উপস্থিতি বাংলাদেশ কীভাবে উগ্রপন্থাকে মোকাবিলা করবে তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। এসব ঘটনা সহিংসতায় উসকানি প্রতিরোধ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মধ্যে কঠিন ভারসাম্যের বিষয়টি তুলে ধরে।
বাংলাদেশকে উগ্রপন্থী শক্তির রাজনৈতিক ব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক জোট দীর্ঘমেয়াদে নানা পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অসহিষ্ণুতা একবার স্বাভাবিক হয়ে উঠলে তা রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ পর্যন্ত তারা যে ভবিষ্যৎ পাবে তাকে ঘিরেই। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও বৈশ্বিক সুযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করা একটি দেশের প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, উন্মুক্ততা এবং নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা। বিপরীতে উগ্রবাদ তৈরি করে বিচ্ছিন্নতা, ভয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
তাই এর মোকাবিলায় শুধু নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, জনমত এবং আরও বেশি ডিজিটাল সচেতনতা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। তবে নাগরিকদের সহিংসতা ও উগ্রপন্থী হুমকি থেকে সুরক্ষিত রাখা সবার অভিন্ন জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করবে না। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের শাসন, জবাবদিহি ও সহনশীলতার নীতিগুলো ধারাবাহিকভাবে কতটা সমুন্নত রাখতে পারে তার ওপরও ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। দেশের উন্নয়নমূলক অর্জন আগামী প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে। এসব অর্জন সুরক্ষিত রাখতে হলে উগ্রবাদ ও সহিংসতা যাতে দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
Parna / Parna
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের যৌথ সামরিক মহড়া শুরু
বিদেশি সাংবাদিকের বইয়ে পাওয়া গেল মোজাফফরের অন্ধকার জীবনের গল্প
এতিমখানার সম্পত্তি রক্ষায় মানববন্ধন, হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের দাবি
পাসপোর্টে যুক্ত হচ্ছে আবু সাঈদ-মুগ্ধ-ওয়াসিমের ছবি
জুলাই চেতনা বিক্রি করে বেশিদিন রাজনীতি করা যাবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
চট্টগ্রামে ধানের চারা রোপণের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই কৃষকের মৃত্যু
নির্ভুল পূর্বাভাসে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার আহ্বান
১৭ জেলায় রাতের মধ্যে ঝড়ের আভাস
তেজগাঁও রেলগেট এলাকায় দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে অজ্ঞাত ব্যক্তি নিহত
১০ দিনেই সাড়ে তিন কোটি টাকার চারা বিক্রি
গাছ লাগানো শুধু চারা রোপণ নয়, একটি অঙ্গীকার: বিমানমন্ত্রী
ভারী বৃষ্টিতে বাড়ছে নদীর পানি, ৫ জেলায় আকস্মিক বন্যার শঙ্কা