ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

ফসলে লোকসান, মাছ ধরায় বাধা: খালিয়াজুরীর হাওড়ে কৃষক-জেলের জীবনে চরম অনিশ্চয়তা


মৃণাল কান্তি দেব, খালিয়াজুরী photo মৃণাল কান্তি দেব, খালিয়াজুরী
প্রকাশিত: ২৫-৭-২০২৬ দুপুর ১২:২৬
নেত্রকোণার খালিয়াজুরী উপজেলার হাওড়াঞ্চলের কৃষক ও জেলেরা চলতি মৌসুমে বহুমুখী সংকটে পড়েছেন। অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, ধান কাটতে অতিরিক্ত ব্যয়, বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, গো-খাদ্যের সংকট এবং মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তায় তাদের জীবন-জীবিকা চরম সংকটে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খালিয়াজুরী একটি হাওড় অধ্যুষিত উপজেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ বছরের প্রায় ছয় মাস কৃষিকাজ এবং বাকি ছয় মাস মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু চলতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে হাওড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে পারেননি। জলাবদ্ধতার কারণে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে অনেককে দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার টাকা মজুরিতে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হয়েছে। পরে পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়ায় ধানের রং কালচে হয়ে যাওয়ায় বাজারে কাঙ্ক্ষিত দামও মিলছে না।
গছিখাই গ্রামের কৃষক হামিদ আলী বলেন, “এ বছর ধান বিক্রি করতে পারছি না। বাজারে দাম কম, আবার আড়তদারও আসে না। দু-একটি নৌকা এলেও সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে দেয়।”
পাঁচহাট গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, “অতিরিক্ত খরচ করে ধান তুলেছি। এখন যদি প্রতি মণ ধান ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়, তাহলে কৃষকের টিকে থাকা কঠিন।”
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। অতিবৃষ্টির কারণে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ধানের মান কিছুটা খারাপ হওয়ায় বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরা এবার তেমন আসেননি। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে ধানের দাম আরও কমেছে।
ধান ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “ধানের রং কালচে হওয়ায় অনেক মিল মালিক ধান নিতে চায় না। আবার মিলগুলোতে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় চাহিদাও কম।”
কাদিরপুর গ্রামের ধান ব্যবসায়ী ভোলা সরকার বলেন, “এলাকা থেকে ধান কিনে আশুগঞ্জে নিয়েও লোকসান হচ্ছে। নৌকা ভাড়া ও শ্রমিকের খরচ দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
এদিকে ফসলহানির কারণে খড় উৎপাদন কম হওয়ায় এলাকায় গো-খাদ্যেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে গবাদিপশু বিক্রি করছেন। উৎপাদনের জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ নিয়েও তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
অন্যদিকে, মৎস্য খাতেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। মাছের প্রজনন রক্ষায় গত ২৮ মে থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত এক মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। তবে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরও অনেক জেলের অভিযোগ, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরতে গেলে বিভিন্নভাবে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সদর ইউনিয়নের কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলে বলেন, “নিষেধাজ্ঞা মেনে এক মাস নদীতে যাইনি। কিন্তু এখনো মাছ ধরতে ভয় লাগে। নদীতে গেলেই বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। মাছ ধরতে না পারায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।”
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “নির্ধারিত সময়ের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে বৈধ জাল ব্যবহার করে মাছ ধরতে কোনো বাধা নেই। নিষেধাজ্ঞার সময় নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের আওতায় ৩০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম চলবে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষতির খবর ছড়িয়ে পড়ায় অন্যান্য বছরের মতো বাইরের আড়তদাররা আসেননি। তবে কৃষকদের সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) এস. এম. শারীকুল ইসলাম বলেন, “সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে।”
খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম আবু ইসহাক বলেন, অতিবৃষ্টিতে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা ঋণের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। একই সঙ্গে মাছ ধরার সংকটে সাধারণ মানুষের আয়ও কমে গেছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জেলেদের জন্য বিশেষ সরকারি সহায়তার দাবি জানান।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি  তালুকদার বলেন, হাওড়াঞ্চলের ফসলহানির প্রভাব সারাদেশে পড়েছে। তিনি নদী-নালা ভরাট, অতিবৃষ্টি, ধান কাটার যন্ত্র ও শ্রমিক সংকট, ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং বিএডিসির বীজ ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেন। পাশাপাশি ইজারানীতি বাতিল করে প্রকৃত জেলেদের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত এবং হাওড়াঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানান।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা  অলিদুজ্জামান বলেন, চলতি মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং আবেদনকারী কৃষকদের ধান বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, মাছের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাওড়ে প্রায় ২৬ মেট্রিক টন মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে বৈধ জাল ব্যবহার করে মাছ ধরায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। প্রকৃত জেলেদের হালনাগাদ তালিকা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যতে প্রজনন মৌসুমে তাদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার কাজও চলমান রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, হাওড়াঞ্চলের কৃষক ও জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, গো-খাদ্য সহায়তা এবং প্রকৃত জেলেদের নির্বিঘ্নে মাছ ধরার সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এমএসএম / এমএসএম

রায়পুরে অননুমোদিত ‘গ্রিনলাইফ’ ডায়গনস্টিকঃ চিকিৎসাসেবার নামে প্রতারণার অভিযোগ

হাওরাঞ্চলের জন্য বিশেষ পরিকল্পনার দাবি: নাহিদ ইসলাম

ছাত্রাবাসে মিললো শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ

গাজীপুরের টঙ্গীতে প্রস্তাবিত ময়লার ডাম্পিং স্থানান্তরের দাবিতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রিন সোসাইটির মানববন্ধন

কুতুবদিয়ায় পানিতে ডুবে ২ বছরের শিশুর মৃত্যু

বাগেরহাটের অবৈধ মাদক অধ্যুষিত লাকায় ছুরিকাঘাতে আইনজীবী খুন

রাশেদুজ্জামান তাওহীদ কে প্রধান করে কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপি'র ৫ সদস্যের শৃঙ্খলা কমিটি গঠন

পার্টনার ফিল্ড স্কুলের তথ্য দিতে গড়িমসি কৃষি কর্মকর্তার; প্রদর্শনীর নায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত কৃষকরা

বেনাপোল বন্দরের আলোচিত কর্মকর্তা রনি’র বদলি

ধুনটে বারান্দা থেকে কৃষকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবির অভিযানে ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ

ম্যাঙ্গো লাভার "মুরাদ"র অফিস কক্ষে তরুণী'কে ধর্ষণ চেষ্টা

পঞ্চগড়ে অনিয়ম দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর সাংবাদিকের চাকুরি খাওয়ার হুমকি ইউএনওর