ফসলহানি ও মাছ ধরায় অনিশ্চয়তা: হাওড়ের কৃষক-জেলেদের অধিকার নিশ্চিতের দাবি সিপিবির
হাওড়াঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে ব্যাপক ফসলহানি, উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং মাছ ধরার সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরও অনেক প্রকৃত জেলের মধ্যে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরতে অনিশ্চয়তা ও ভীতির পরিবেশ বিরাজ করছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে উপজেলা কৃষি ও মৎস্য বিভাগ।
সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের মোট বোরো ধান উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ হাওড়াঞ্চলে হয়। তাই এ অঞ্চলের ফসলহানির প্রভাব শুধু স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও পড়েছে।
তিনি বলেন, নদী-নালা ও খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। এ বছর অতিবৃষ্টির কারণে বোরো ধান কাটার মৌসুমে হারভেস্টার মেশিন ও শ্রমিকের সংকট দেখা দিলেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে অনেক কৃষক সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারেননি। যারা ধান তুলেছেন, তারাও উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিএডিসির সরবরাহ করা বীজ নিয়েও প্রশ্ন তুলে জলি তালুকদার বলেন, কিছু ধানের জাত চৈত্র মাসের শেষ দিকে কাটার উপযোগী হওয়ার কথা থাকলেও বৈশাখের ১৫ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত অনেক ক্ষেতের ধান পরিপক্ব হয়নি। তিনি এ ঘটনায় বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, ফসলহানির কারণে হাওড়াঞ্চলে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। খাদ্যের অভাবে অনেক কৃষক লোকসানে গবাদিপশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
জেলেদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাওড়াঞ্চলের মানুষ বছরের প্রায় ছয় মাস কৃষিকাজ এবং বাকি ছয় মাস মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাছের প্রজনন মৌসুমে এক মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও অনেক এলাকায় প্রকৃত জেলেদের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পুলিশি হয়রানি ও মামলার অভিযোগও রয়েছে। তিনি ইজারানীতি বাতিল করে প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
কৃষকদের বাস্তব চিত্র
খালিয়াজুরী উপজেলার আদাউর গ্রামের কৃষক বীরেন্দ্র সরকার (৬৪) জানান, তিনি ১৪ দশমিক ৫ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ৮ একর জমির ফসল অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে তার প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। কিছু ধান ঘরে তুললেও অতিবৃষ্টির কারণে ধানের রং কালচে হয়ে যাওয়ায় তা বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে তিনি বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন।
একই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মোবাশ্বিক (দূর্জয়) (২৫) বলেন, তিনি ৮ দশমিক ৫ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ৬ একর জমির ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি ফসলের ক্ষতি এবং উৎপাদিত ধানের রং কালচে হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে। বর্তমানে তিনি প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকারি মানবিক সহায়তার তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ করেন।
জেলেদের দুর্ভোগ
খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের ছোটহাটি গ্রামের মুরসালিন খান (২৩) জানান, গত ১৩ বছর ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন এবং পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরও উন্মুক্ত জলাশয়ে নিয়মিত মাছ ধরতে পারছেন না। এতে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় কমে গেছে। তিনি কোনো সরকারি সহায়তা পাননি এবং বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণগ্রস্ত। কাজের অভাবে এলাকার প্রায় ৮০টি জেলে পরিবার জীবিকার সন্ধানে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অপর জেলে পলাশ মিয়া (৩৮) বলেন, গত ২৭ বছর ধরে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে নিয়মিত মাছ ধরতে পারছেন না। এতে প্রতি মাসে প্রায় ১৬ হাজার টাকা আয় কমেছে। তিনি কোনো সরকারি সহায়তাও পাননি। একই সঙ্গে ৫ একর জমিতে আবাদ করা ধানের মধ্যে মাত্র আড়াই একরের ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উৎপাদিত ধানের রং কালচে হয়ে যাওয়ায় তা বিক্রিও করতে পারছেন না। ফলে তিনি দ্বিমুখী আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য
এ বিষয়ে খালিয়াজুরী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, "হাওড়ে মাছের প্রজনন বৃদ্ধি ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এক মাসের জন্য মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। নির্ধারিত সময় শেষে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।"
নিষেধাজ্ঞা শেষে অনেক জেলে এখনো মাছ ধরতে ভয় পাচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "বর্তমানে বৈধ জাল ব্যবহার করে হাওড়ে মাছ ধরার ক্ষেত্রে কোনো বাধা-নিষেধ নেই। অনেকেই নতুন করে পোনা অবমুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে রয়েছেন।"
তিনি আরও বলেন, "হাওড়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে এ ধরনের ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। নিষেধাজ্ঞার সময় নিবন্ধিত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। ইতোমধ্যে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।"
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে খালিয়াজুরী উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে অতিবৃষ্টির কারণে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, "সাধারণত নতুন ধান ওঠার সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আড়তদাররা হাওড়াঞ্চলে এসে ধান কিনে নিয়ে যান। কিন্তু এ বছর অতিবৃষ্টিজনিত ফসলহানির খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেক আড়তদার আসেননি। তারপরও কৃষকরা যাতে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।"
সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহে অনিয়ম বা কৃষকদের হয়রানির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, "খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহে কোনো অনিয়মের বিষয় আমার জানা নেই। অনলাইনে আবেদন করা প্রায় সব কৃষকই ধান সরবরাহের অনুমতি পেয়েছেন। আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় অধিকাংশ আবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।"
হাওড়াঞ্চলের কৃষক ও জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত জেলেদের উন্মুক্ত জলাশয়ে নির্বিঘ্নে মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার।
এমএসএম / এমএসএম
রায়গঞ্জে হাসপাতাল হামলা মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার
ত্রিশাল স্কুল পরিচ্নছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন
রাজস্থলীতে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে হেডম্যান-কারবারী সম্মেলন সন্ত্রাস চাঁদাবাজ বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানঃ মেজর হাফিজ সৈকত
জাহেদা ক্লিনিকে ভুল অস্ত্রোপচারে কৃষকের মৃত্যু,পঙ্গু হওয়ার পথে আরোও ৩ জন
ভূরুঙ্গামারীতে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে আবেদন সময় বৃদ্ধি
গাসিকে ৫ হাজার ১০২ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করলেন প্রশাসক
কালিয়ায় দুটি ক্লিনিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, এক লাখ টাকা জরিমানা
গোপালগঞ্জে সবজি ও মাছের দাম আকাশচুম্বী, বাজার মনিটরিংয়ের দাবি ক্রেতাদের
জুড়ী-বড়লেখা আঞ্চলিক মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় জুড়ীর আলীর মৃত্যু
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
আধ্যাত্নিক সাধনার প্রাণ পুরুষ হযরত আলী শাহ হুজুর
রাঙামাটিতে শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু, গলায় ওড়না পেঁচানো মৃতদেহ উদ্ধার
উপকূলীয় সাংস্কৃতিক ফোরামের গুণীজন সংবর্ধনায় সন্দ্বীপের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সম্মাননা পেলেন ফেরদৌস আহম্মেদ কৌশিক
Link Copied