সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা
জাতির বিবেক খ্যাত সাংবাদিক সাংবিধানিকভাবেই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত। আর এই বাংলা প্রচলিত ভাষায় আমরা যে শব্দকে ‘সাংবাদিক’ বলে জানি, ইংরেজিতে সেটিকে বলা হয় Journalist. ইংরেজি ১০ বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত এই শব্দের প্রতিটি বর্ণ দিয়ে আলাদা আলাদা একটি অর্থবহ শব্দ তৈরি হয় আর সেই ১০টি শব্দের সাথে যার চারিত্রিক মিল থাকে তিনিই একজন আদর্শিক সাংবাদিক। শব্দটি উচ্চারণে সহজ, পরিচয়ে মর্যাদাপূর্ণ হলেও এর দায়িত্ব অত্যন্ত গভীর। সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে শুধু একটি পরিচয়পত্র, প্রেস কার্ড, কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের নামের পাশে ‘সাংবাদিক’ শব্দটি লিখে দিলেই প্রকৃত সাংবাদিক হওয়া যায় না। সাংবাদিকতা অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে, বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হয় দীর্ঘদিনের সততা দিয়ে এবং মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হয় সত্য ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে।
একজন মানুষের হাতে একটি প্রেস কার্ড থাকতে পারে। তার গলায় ঝুলতে পারে পরিচয়পত্র। কোনো পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা সংবাদ সংস্থার নামও তার পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সাংবাদিকতার মৌলিক গুণগুলো তিনি কতটা ধারণ করেন? তিনি কি নিরপেক্ষ? তিনি কি পক্ষপাতহীন? তিনি কি তথ্য যাচাই করেন? তিনি কি অনুসন্ধিৎসু? তিনি কি সত্য প্রকাশে সাহসী? তিনি কি নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে।
ইংরেজি Journalist শব্দটি যে ১০টি অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত। আমরা যদি প্রতিটি অক্ষরকে একজন আদর্শ সাংবাদিকের একটি করে গুণের প্রতিক হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে সাংবাদিকতার একটি সুন্দর আত্মমূল্যায়নের কাঠামো তৈরি হয়। প্রতিটি গুণের জন্য ১০ নম্বর করে মোট ১০০ নম্বর ধরে যদি হিসেব করি তাহলে বুঝা যাবে আমরা কে কত নাম্বার পাওয়ার যোগ্য। এখন প্রশ্ন হলো আজকের সাংবাদিকতায় আমরা যারা নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিই, আমরা নিজেরাই যদি নিজেদের পরীক্ষার্থী হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে ১০০ নম্বরের মধ্যে কত নম্বর পাওয়ার যোগ্য?
চলুন, নিজের দিকে একটু তাকাই। অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াই। এবার দেখা যাক J O U R N A L I S T এই জার্নালিস্ট বা সাংবাদিকের মানে কি?
প্রথম অক্ষর J (জে) এর মানে হলো Journaling (জার্নালিং) যার অর্থ দৈনিক ঘটনা বা বিবরণ লিপিবদ্ধ করা। সাংবাদিকতার প্রথম কাজই হলো ঘটনা জানা, দেখা এবং লিপিবদ্ধ করা। একটি ঘটনা ঘটল, সেটি শুনলাম এবং কারও কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সঙ্গে সঙ্গে লিখে দিলাম, এটি সাংবাদিকতা নয়। সাংবাদিককে ঘটনার বিবরণ সংগ্রহ করতে হয়। সময়, স্থান, ব্যক্তি, ঘটনা, বক্তব্য, নথি, সবকিছু সংরক্ষণ ও যাচাই করতে হয়।
আগের দিনের সাংবাদিকরা নোটবুক হাতে মাঠে ঘুরতেন। গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য লিখে রাখতেন, নথি সংগ্রহ করতেন, সাক্ষাৎকার নিতেন। এখন প্রযুক্তির যুগে মোবাইল ফোন, রেকর্ডার, ক্যামেরা, কম্পিউটার সবই সাংবাদিকের হাতের কাছে। ফলে তথ্য সংরক্ষণের সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কতজন নিয়মিত তথ্য নোট করি? কতজন ঘটনার পেছনের তথ্য লিখে রাখি? কতজন একটি সংবাদ করার আগে পুরোনো নথি, পূর্ববর্তী ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য মিলিয়ে দেখি? সাংবাদিকের স্মৃতির ওপর সবসময় নির্ভর করা যায় না; নথি ও তথ্যই তার শক্তি। তাই এখানে আপনি নিজেকে ১০-এর মধ্যে কত নাম্বর দিবেন? সেটি প্রত্যেকের নিজের কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম।
O (ও) মানে হলো Objective (অবজেক্টিভ) যার অর্থ নিরপেক্ষ বা বস্তুনিষ্ঠ থাকা।
সাংবাদিকতার প্রাণ হলো বস্তুনিষ্ঠতা। সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পছন্দ থাকতে পারে, অপছন্দ থাকতে পারে, মতামত থাকতে পারে; কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের সময় ব্যক্তিগত মতামতকে তথ্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। একজন সাংবাদিক কোনো রাজনৈতিক দলকে পছন্দ করতে পারেন, কোনো নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারে, কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকতে পারে। আবার বৈরিতাও থাকতে পারে কিন্তু সংবাদ লেখার সময় তাকে প্রশ্ন করতে হবে পেশাদারিত্ব থেকে। আমি কি ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারছি?
যে সংবাদে নিজের পছন্দের মানুষ ভালো থাকবেন, সেটি বড় করে প্রকাশ করলাম; আর অপছন্দের মানুষ হলে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ খুঁজে বের করলাম এটি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নয়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিক সত্যের পক্ষে থাকেন, ব্যক্তি বা দলের পক্ষে নয়। আজকের সাংবাদিকতায় ঙনলবপঃরাব হওয়ার পরীক্ষায় আমরা কত নম্বর পাব? এটি খুব কঠিন আত্মজিজ্ঞাসা। কারণ অন্যের পক্ষপাত সহজে চোখে পড়ে, কিন্তু নিজের পক্ষপাত স্বীকার করা সবচেয়ে কঠিন।
U (ইউ) Unbaised (আনবেইজড) অর্থাৎ পক্ষপাতহীনভাবে সত্য তুলে ধরা। Objective এবং Unbaised শব্দ দুটি কাছাকাছি হলেও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দুটির গুরুত্ব আলাদা করে ভাবা যায়। পক্ষপাতহীনতা মানে শুধু দুই পক্ষের বক্তব্য নেওয়া নয়; বরং নিজের মনকেও পক্ষপাত থেকে মুক্ত রাখা। একজন সাংবাদিক যদি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে অমুক ব্যক্তি দুর্নীতিবাজ, তাহলে তার অনুসন্ধান নিরপেক্ষ থাকবে না। তিনি তখন প্রমাণ খুঁজবেন না; বরং নিজের ধারণাকে প্রমাণ করার মতো তথ্য খুঁজবেন। এটি সাংবাদিকতার জন্য বিপজ্জনক। অভিযোগের সংবাদে অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া, তথ্য যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ খোঁজা সাংবাদিকের দায়িত্ব। কাউকে হেয় করা কিংবা ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা সাংবাদিকতা নয়। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কাছে সত্য কখনো নিজের পছন্দের মানুষের জন্য একরকম এবং অপছন্দের মানুষের জন্য আরেকরকম হতে পারে না।
R (আর) মানে Responsible (রেসপন্সিবল) অর্থাৎ সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা। সাংবাদিকের একটি বাক্য সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি সংবাদ কোনো মানুষের সম্মান নষ্ট করতে পারে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে পারে, আবার কোনো দুর্নীতি প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের পথও খুলে দিতে পারে, সমাজে বা রাষ্ট্রে দাঙ্গা- হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে পাওে এমনকি বহিঃবিশ্বেও সাথে যুদ্ধও লেগে যেতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা জাতি ধ্বংসও হতে পারে। তাই সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু সংবাদ প্রকাশ করা নয়; সংবাদ প্রকাশের পর তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন থাকা। কোনো গুজবকে যাচাই না করে প্রকাশ করা, কারও ব্যক্তিগত বিষয় অপ্রয়োজনে প্রকাশ করা, শিশু বা ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা, উত্তেজনাকর শিরোনাম দিয়ে সামাজিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা কখনো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে যায় না। সাংবাদিক সমাজের দর্পণ। সেই দর্পণে যেন সত্যের প্রতিফলন ঘটে, সেটিই তার দায়িত্ব।
আজ আমরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারি Responsible হিসেবে আমরা কতটা দায়িত্বশীল?
N (এন) মানে Notable (নোটাবল্) অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য সংবাদ নির্বাচন করা। সাংবাদিকতা শুধু যা ঘটছে তা প্রকাশ করা নয়; কী প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও বুঝতে হয়। একজন সাংবাদিকের সামনে প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনা আসে। সব ঘটনা সংবাদ নয়, আবার ছোট একটি ঘটনাও কখনো বড় জনস্বার্থের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তাই সংবাদ নির্বাচনে সাংবাদিকের বিচারবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন জনপ্রতিনিধির একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হয়তো খুব বড় সংবাদ নয়, কিন্তু তার এলাকার হাসপাতাল চিকিৎসক সংকটে ভুগছে, এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হতে পারে। একটি প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে, এটি জনস্বার্থের সংবাদ। একটি খাল দখল হয়ে নগরীর জলাবদ্ধতা বাড়ছে, এটিও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনবল সংকটে সেবা ব্যাহত হচ্ছে, সেটিও মানুষের জানার অধিকার রয়েছে। সাংবাদিককে বুঝতে হবে কোন তথ্য শুধু কৌতূহল সৃষ্টি করে আর কোন তথ্য সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়।
A (এ) মানে Accurate (একিউরেট) অর্থাৎ তথ্যের সঠিকতা ও নির্ভুলতা বজায় রাখা। সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণগুলোর একটি হলো নির্ভুলতা। একটি নামের বানান ভুল, একটি সংখ্যা ভুল, একটি পদবি ভুল কিংবা একটি ঘটনার সময় ভুল কখনো কখনো পুরো সংবাদটির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে দিতে পারে। বিশেষ করে অভিযোগভিত্তিক সংবাদে নির্ভুলতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজনের অভিযোগকে সত্য হিসেবে লিখে দেওয়া যাবে না। অভিযোগকারী কি বলেছেন, তার বক্তব্যের ভিত্তি কি, অভিযুক্ত পক্ষ কি বলেছে এবং সংশ্লিষ্ট নথি কি বলছে এসব যাচাই করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন তথ্যের গতি অনেক বেশি। একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই ‘আগে প্রকাশ, পরে যাচাই’ নীতি সাংবাদিকতার জন্য ভয়ংকর। প্রকৃত সাংবাদিকের নীতি হওয়া উচিত ”দ্রুত হওয়ার চেয়ে সঠিক হওয়া” বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
L (এল) মানে Logician (লজিসিয়ান) যৌক্তিক চিন্তাভাবনার মাধ্যমে ঘটনার বিশ্লেষণ করা। সাংবাদিক শুধু তথ্য সংগ্রহ করেন না; তথ্যের মধ্যে সম্পর্কও খুঁজে বের করেন। একটি ঘটনা কেন ঘটল, এর পেছনে কি কারণ, কারা লাভবান হলো, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো, পূর্বের ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক কি? এসব বিশ্লেষণ করতে হয়। ধরা যাক, একটি সরকারি প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। শুধু ব্যয় বেড়েছে, এটি সংবাদ হতে পারে। কিন্তু কেন বেড়েছে? নকশা পরিবর্তন হয়েছে কি না, সময়মতো কাজ না হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে কি না, বাজারদরের পরিবর্তন হয়েছে কি না, দুর্নীতি আছে কি না, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে এসব খুঁজে বের করাই সাংবাদিকতার গভীরতা। যুক্তি ছাড়া সাংবাদিকতা অনেক সময় বক্তব্যের সংকলনে পরিণত হয়। একজন সাংবাদিককে তাই তথ্যের পাশাপাশি বিশ্লেষণী ক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
I (আই) মানে Inquisitive (ইনকুইজিটিভ) অনুসন্ধিৎসু বা নতুন তথ্য জানার প্রবল আগ্রহ থাকা। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তার প্রশ্ন করার ক্ষমতা। ‘কেন?’ ‘কীভাবে?’ ‘কার জন্য?’ ‘কোথায়?’ ‘কত টাকা?’ ‘নথি কোথায়?’ ‘এর আগে কী হয়েছিল?’ ‘এর পরিণতি কী?’ এই প্রশ্নগুলোই সাংবাদিকতাকে জীবন্ত রাখে। যে সাংবাদিক প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেন, তার সাংবাদিকতাও ধীরে ধীরে থেমে যায়। নতুন তথ্যের প্রতি আগ্রহ, অজানা বিষয় জানার চেষ্টা এবং ঘটনার গভীরে যাওয়ার মানসিকতা একজন সাংবাদিককে অন্যদের থেকে আলাদা করে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার শুরুই হয় একটি প্রশ্ন থেকে। একটি ছোট প্রশ্ন কখনো কখনো কোটি টাকার দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম কিংবা মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কারণ সামনে নিয়ে আসতে পারে।
S (এস) মানে Sincere (সিনসিয়ার) অর্থাৎ কাজের প্রতি সৎ ও আন্তরিক হওয়া। সাংবাদিকতার সবচেয়ে নীরব কিন্তু শক্তিশালী গুণ হলো আন্তরিকতা। একজন সাংবাদিক অনেক কিছু না জানলেও শিখতে পারেন, ভুল করলে সংশোধন করতে পারেন, অভিজ্ঞতা না থাকলে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। কিন্তু কাজের প্রতি আন্তরিকতা না থাকলে কোনো দক্ষতাই দীর্ঘদিন কাজে আসে না। সাংবাদিক যদি সংবাদকে শুধু উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন, মানুষের সমস্যা যদি তার কাছে কেবল ‘কনটেন্ট’ হয়ে যায়, তাহলে সাংবাদিকতার মানবিক দিকটি হারিয়ে যায়। সত্যিকারের সাংবাদিক মানুষের কথা মন দিয়ে শোনেন। তিনি একটি প্রতিবেদন করেন শুধু নিজের নাম প্রকাশের জন্য নয়, কোনো সমস্যাকে মানুষের সামনে আনা এবং তা সমাধানের জন্য।
শেষ অক্ষর T (টি) মানে Truthful অর্থাৎ সত্যবাদী, সৎ বা যথার্থ। আর হয়তো এটাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সাংবাদিকতার সব গুণের শেষ ঠিকানা সত্য। একজন সাংবাদিক যদি অনেক দক্ষ হন, ভালো লিখতে পারেন, দ্রুত সংবাদ দিতে পারেন, সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, কিন্তু সত্যের জায়গায় আপস করেন, তাহলে তার সাংবাদিকতার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়।
সত্য প্রকাশ করা সবসময় সহজ নয়। কখনো সত্য প্রকাশ করলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হতে পারেন। কখনো বিজ্ঞাপন হারানোর ভয় থাকতে পারে। কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। কখনো চাপ আসতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার মর্যাদা তখনই রক্ষা পায়, যখন সাংবাদিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে অগ্রাধিকার দেন। তবে সত্য প্রকাশের অর্থ যাচাইহীন অভিযোগ প্রকাশ করা নয়। সত্যের পথে যেতে হলে তথ্য, নথি, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ সাংবাদিক কখনো গুজবকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবেন না।
এবার আসি সাংবাদিকতার আত্মজিজ্ঞাসায়। JOURNALIST-এর এই ১০টি অক্ষরকে যদি আমরা একজন সাংবাদিকের ১০টি গুণ হিসেবে বিবেচনা করি এবং প্রতিটির জন্য ১০ নম্বর ধরি, তাহলে মোট ১০০ নম্বরের একটি আত্মমূল্যায়ন দাঁড়ায়।
কিন্তু এই পরীক্ষার সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো, এখানে পরীক্ষক অন্য কেউ নন, পরীক্ষার্থী নিজেই। নিজের নম্বর নিজেকেই দিতে হবে। আর নিজের প্রতি সৎ না হলে সেই নম্বরের কোনো মূল্য নেই।
এখন প্রত্যেকে নিজের খাতা নিজেই খুলে বসতে পারি। আবার ১০টি শব্দ; দিয়ে যেমন জার্নালিস্ট শব্দ তৈরি হয়েছে সেখানে দশটি ভালো দিকের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে যদি আমরা দেখি আমাদেরও দশটি ”দিক” আছে। সচরাচর আমরা পূর্ব,পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ এই চারটি দিক বহুল প্রচলিত হলেও ঈশান (উত্তর-পূর্ব), বায়ু (উত্তর-পশ্চিম), অগ্নি (দক্ষিণ-পূর্ব) , নৈঋত (দক্ষিণ-পশ্চি), উর্ধ্ব (আকাশের দিক) ও অধঃ (পাতালের দিক)। একজন সাংবাদিককে এসব দশদিকের খবরই রাখতে হয়। যিনি রাখতে পারেন তিনিই সাংবাদিক আর বাকিরা পরিচয়পত্রে সাংবাদিক।
অনেকেই হয়তো অবগত আছেন N- (North) E- (East) W- (West) S- (South) অর্থাৎ উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ এই চারটি দিকের শব্দ নিয়ে তৈরি হয়েছে NEWS (নিউজ) অর্থাৎ সংবাদ। প্রকৃতপক্ষে চারটি দিক নিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করা যায় কিন্তু প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবে গড়ে ওঠতে হলে আপনাকে ১০টি দিক সম্পর্কেই পারদর্শী হতে হবে অর্থাৎ সবদিকের সব খবর রাখতে হবে। আর সংবাদ লেখার সূত্র হিসেবে পরিচিত 5W1H অর্থাৎ ৫টি ডব্লিউ ও ১টি এইচ ফর্মূলা ফলো করে থাকি। 5W1H বলতে আমরা বুঝি Who, What, When Where, Why & How অর্থাৎ কে, কি, কখন, কোথায়, কেন এবং কিভাবে। এই সূত্র ধরে একটি ঘটনার বিশ্লেষণ একটি সংবাদ তৈরি হয়ে যায়। তবে লেখার ক্ষেত্রে অবশ্যই উল্টো পিরামিড কাঠামো ফলো করতে হবে অর্থাৎ বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগে আসবে আর কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যায়ক্রমে, পরে আসবে। তবে সংবাদে পক্ষ বিপক্ষেরই বক্তব্য প্রকাশের চেষ্টা করতে হবে। বর্তমানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে যারা অপরাধ করেন তারা সচরাচর সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। ফোন রিসিভ করেন না, অফিসে গেলেও নানা অযুহাতে কথা না বলার বাহানা খোঁজেন তাদের ক্ষেত্রে একান্তই কথা বলা সম্ভব না হলে বক্তব্য ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করা যাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে রাগ বা ক্ষোভের বশে যাতে অতিরিক্ত অশালিন শব্দের প্রয়োগ না হয়।
আমরা অনেক সময় অন্য সাংবাদিকের ভুল খুব সহজে দেখতে পাই। অমুক পক্ষপাতদুষ্ট, তমুক যাচাই না করে সংবাদ করেছে, কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদ করেছে, কেউ আবার পরিচয়পত্রকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, এসব নিয়ে আলোচনা করতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগে না। কিন্তু নিজের সংবাদ, নিজের আচরণ, নিজের পক্ষপাত, নিজের ভুল এবং নিজের পেশাগত সীমাবদ্ধতার দিকে তাকানোর সময় আমরা কতটা সাহসী?
সাংবাদিকতার প্রকৃত উন্নতি শুরু হবে তখনই, যখন আমরা অন্যকে বিচার করার আগে নিজেদের বিচার করতে শিখব।
কারণ শুধু পরিচয়পত্র থাকলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। প্রেস কার্ড সাংবাদিকতার দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মর্যাদা ধরে রাখতে পারে না। সেটি ধরে রাখে সততা, দক্ষতা, নিরপেক্ষতা, অনুসন্ধিৎসা, দায়িত্ববোধ এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকার।
আজ সাংবাদিকতার জগতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। কে কোন প্রতিষ্ঠানের কার্ড ব্যবহার করছেন, সেটির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কি কাজ করছেন। কে কত বড় প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বহন করছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার প্রতিবেদনের মান। কে কতজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সঙ্গে ওঠাবসা করেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ মানুষের কতটা আস্থা তিনি অর্জন করেছেন।
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রেস কার্ড নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পদবি নয়, তথ্য। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার পরিচিতি নয়, সততা। আর একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্যামেরা বা কলম নয়, তার বিবেক।
তাই আসুন, সাংবাদিকতার পরিচয় নিয়ে অহংকার করার আগে নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করি JOURNALIST শব্দটির ১০টি গুণের মধ্যে আমি কতটি সত্যিকার অর্থে ধারণ করি?
যদি ১০০-এর মধ্যে ৯০ পাই, তবে আত্মতুষ্ট হওয়ার কারণ নেই; বরং বাকি ১০ পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যদি ৭০ পাই, তবে ঘাটতিগুলো পূরণ করতে হবে। যদি ৫০ পাই, তবে নতুন করে শেখার সময় এসেছে। আর যদি খুব কম নম্বর পাই, তাহলে পরিচয়পত্রটি গলায় ঝোলানোর আগে নিজের সাংবাদিকতাকে নতুন করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কারণ সাংবাদিকতা কোনো পরিচয়পত্রের ব্যবসা নয়। এটি বিশ্বাসের পেশা। এটি মানুষের অধিকার ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর দায়িত্ব। এটি ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন করার সাহস। এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরার অঙ্গীকার।
পরিচয়পত্র একজন মানুষকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তার কাজই প্রমাণ করে তিনি সত্যিকার অর্থে সাংবাদিক কি না। সাংবাদিকতার কার্ড পকেটে রাখুন, কিন্তু সাংবাদিকতার নীতিকে রাখুন হৃদয়ে। পরিচয়পত্র গলায় ঝুলুক, কিন্তু সত্য থাকুক বিবেকে। কারণ কার্ডের মেয়াদ শেষ হতে পারে, প্রতিষ্ঠান বদলাতে পারে, পদবি বদলাতে পারে, কিন্তু একজন সৎ সাংবাদিকের কর্ম ও বিশ্বাসযোগ্যতা মানুষের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।
তাই আসুন, অন্যের নম্বর দেওয়ার আগে নিজের খাতা খুলে বসি। JOURNALIST এর ১০টি অক্ষরের প্রতিটি গুণে নিজেকে ১০-এর মধ্যে নম্বর দিই। দেখি ১০০-এর মধ্যে আমি কত? সেই নম্বরই হয়তো আমাদের বলে দেবে, আমরা শুধু পরিচয়পত্রধারী, নাকি সত্যিকার অর্থেই সাংবাদিক।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সভাপতি. রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
এমএসএম / এমএসএম
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক
হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা
কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?
প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?
লেখকের কষ্ট
বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান
বানিজ্য সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা