ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান


আহসান হাবিব বরুন photo আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশিত: ৭-১০-২০২৬ দুপুর ৪:৭

রাজনীতিতে সত্যকে সাময়িকভাবে চাদরচাপা দিয়ে রাখা গেলেও চিরতরে চেপে রাখা যায় না। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ও দুনিয়া কাঁপানো ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর অনুসারীরা যে বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরির অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন, সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের হাইকমিশনারের বক্তব্যে তা কাচের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। 

ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর কর্ম অধিবেশনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী—যিনি মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন—এমন কিছু বিস্ফোরক ও অপ্রিয় সত্য উন্মোচন করেছেন, যা শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভণ্ডামি ও মিথ্যাচারের মুখোশ আবারও বিশ্ব দরবারে খুলে দিয়েছে।
 
আমি এর আগেও একাধিক কলামে তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেছিলাম যে, শেখ হাসিনা ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর দলের নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত করতে এবং নিজের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার জন্য চরম মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি নানা জায়গায় দাবি করার চেষ্টা করেছিলেন যে, তাঁকে ভুল বুঝিয়ে বা না জানিয়ে গোপালগঞ্জে নেওয়ার কথা বলে বিমানে তোলা হয়েছিল এবং ভারতের বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। কিন্তু আমি বরাবরই স্পষ্ট ভাষায় লিখেছি—এগুলো শেখ হাসিনার স্বভাবসুলভ রাজনৈতিক কৌশল ও বানোয়াট গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। আজ ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রকাশ্য বক্তব্যে আমার সেই পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণই শতভাগ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। ত্রিবেদী সরাসরি আমার সেই কথারই প্রতিধ্বনি করলেন।
 
হাইকমিশনার ত্রিবেদী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে খোলস ছেড়ে বের হয়ে এসে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে ভারতের কোনো সামরিক বা বিমানবাহিনীর বিমানে করে ভারতে নেওয়া হয়নি। তিনি ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন বাংলাদেশের সামরিক বিমানে চড়ে এবং ভারতে প্রবেশের আবেদন তিনি নিজেই করেছিলেন। ত্রিবেদীর ভাষায়, যখন শেখ হাসিনা ঢাকা ছাড়েন, তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তৎকালীন প্রতিবেশী দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর সেই অনুরোধে সাড়া না দিয়ে অবতরণের অনুমতি না দেওয়ার মতো কোনো বিকল্প ভারতের হাতে ছিল না। ত্রিবেদী সোজা ভাষায় আসল সত্যটি জানিয়ে দিলেন—শেখ হাসিনা কোনো পরিস্থিতির শিকার হয়ে ভুল করে যাননি, বরং নিজের প্রাণ বাঁচাতে ভারতের কাছে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছিলেন এবং ভারত কেবল সরকারের অনুরোধ রক্ষার্থেই সেই আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিল।
 
এখানে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শিউরে ওঠার মতো বিষয় উদ্ঘাটিত হয়, যা শেখ হাসিনার রাষ্ট্রদ্রোহী ও গণবিরোধী চরিত্রের চরম রূপ উন্মোচন করে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মুখে যখন শেখ হাসিনার পতন একপ্রকার অনিবার্য ও সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠেছিল, ঠিক সেই অন্তিম মুহূর্তে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি দেশকে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার হীন চেষ্টা চালিয়েছিলেন। বিশ্বস্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সূত্র এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার যে, সেই চরম মুহূর্তে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সামরিক বা কূটনৈতিক আক্রমণ ও হস্তক্ষেপ চালানোর জন্য ভারতের কাছে আকুল আহ্বান জানিয়েছিলেন। 

অর্থাৎ, নিজের দেশের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লবকে দমন করতে তিনি বিদেশি শক্তিকে নিজ মাতৃভূমির ওপর চড়াও হওয়ার আমন্ত্রণ জানাতেও দ্বিধা করেননি! কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারকরা তখনকার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর অভূতপূর্ব জাগরণ প্রত্যক্ষ করে শেখ হাসিনার সেই চরম বিপজ্জনক ও দেউলিয়া প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। ভারত যখন শেখ হাসিনার কথায় সায় দিয়ে কোনো প্রকার সামরিক বা বাহ্যিক হস্তক্ষেপে রাজি হলো না, তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে ক্ষমতার তাসের ঘর পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। আর ঠিক তখনই, নিজের কৃতকর্মের বিচার এড়িয়ে কেবল প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে, তিনি ভারতের কাছে আশ্রয় চান। এভাবেই তিনি আওয়ামী লীগের অগণিত নেতাকর্মীকে গভীর অনিশ্চয়তা ও সংকটে ফেলে ভারতে আশ্রয় নেন। এবং পরে নেতাকর্মীদের বোকা বানাতে গোপালগঞ্জে যাওয়ার গল্প বানান। এটাই হচ্ছে ঐতিহাসিক ও বাস্তব সত্য।
 
নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, যে রাজনীতিবিদের পুরো ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে ছিল মিথ্যাচার, দমন-পীড়ন আর ক্ষমতার দম্ভের ওপর, জীবনের সবচেয়ে চরম সংকটে পড়েও তিনি মিথ্যা গল্প বানিয়ে নিজের দল, নেতাকর্মী ও পুরো জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন—একবার নয়, বহুবার। নিজের পরাজয় ও পালিয়ে যাওয়ার দায় অন্যের কাঁধে চাপানোর এই রাজনৈতিক ভণ্ডামি শেখ হাসিনার অস্থিমজ্জায় মিশে গেছে। আর এই লাগামহীন মিথ্যাচার, অগণতান্ত্রিক আচরণ ও জনগণের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার সর্বগ্রাসী লোভের কারণেই আজ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো একটি শতবর্ষী ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল চরম অস্তিত্ব সংকট ও মহাসংকটের মুখে নিপতিত হয়েছে।
 
এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখা ভালো যে,দীনেশ ত্রিবেদী তাঁর বক্তব্যে যেসব বিস্ফোরক সত্যের অবতারণা করেছেন, তার ফলে গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে জল্পনা-কল্পনার ফানুস উড়ছিল, তা এক মুহূর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) অজিত দোভাল নাকি গোপনে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন—এমন একটি ভিত্তিহীন গুজব ঢাকার রাজনৈতিক বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদের দোসর ও বয়ান উৎপাদনকারী একদল কথিত সাংবাদিক এবং পেটোয়া ইউটিউবার দিন-রাত সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের কানভারী করছিল। তারা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বুক চাপড়ে দাবি করছিল যে, “হাসিনা তো ডিসেম্বরেই ফিরে আসছেন! এজন্যই নাকি অজিত দোভাল গোপনে ঢাকা এসে সবকিছু সেট করে গেছেন!” ত্রিবেদীর এই স্পষ্ট, প্রাতিষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক বক্তব্য সেই গুজববাজ চক্রের গালে এক কষে থাপ্পড় মেরেছে এবং তাদের মুখে চরম ছাই ও চুনকালি একে দিয়েছে। ভারত সরকারের মন্ত্রী পদমর্যাদার হাইকমিশনার যখন নিজেই ঘোষণা দেন যে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া চলমান এবং তাঁর ভারতে প্রবেশ কেবল অনুরোধের বাধ্যবাধকতা ছিল, তখন অজিত দোভালের তথাকথিত গোপন সফর বা ‘হাসিনার ডিসেম্বরে ফিরে আসা’র মতো সস্তা প্রোপাগান্ডা যে কতটা দেউলিয়া আর হাস্যকর গুজব ছিল, তা আর বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।
 
তবে দীনেশ ত্রিবেদীর এই বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল শেখ হাসিনার পলায়নের সত্য উন্মোচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তনের বার্তা বহন করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক দিক হলো—শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো বা প্রত্যর্পণের দাবির বিষয়ে ভারতের আগের অস্পষ্ট অবস্থান থেকে বড় ধরনের সরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ইতিপূর্বে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বারবার শুধু এটুকু বলতেন যে, “শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি ভারতের নিজস্ব আইন ও আদালত অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।” কিন্তু ঢাকায় মন্ত্রী পদমর্যাদার হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী অত্যন্ত স্পষ্ট ও খোলাসা করে বলেছেন, “শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।”
 
এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্থ অত্যন্ত গভীর। ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা’ আর ‘প্রক্রিয়া চলমান থাকা’—কূটনৈতিক ভাষায় এই দুইয়ের পার্থক্য বিশাল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরবর্তী ধাপই হলো বাস্তবায়নের বা প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারত সরকার এখন আইনগত কাঠামোর ভেতরে থেকেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি করার বা ফেরত পাঠানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে। ত্রিবেদীর এই বক্তব্যে স্পষ্ট আভাস মিলছে যে, ভারত এখন আর এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা পতিত স্বৈরাচারকে রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশের বিপুল জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সার্বভৌম সম্পর্কের সঙ্গে শত্রুতা করতে রাজি নয়।
 
এই যে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ইতিবাচক ও অভূতপূর্ব গুণগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা আকাশ থেকে পড়েনি। আমি মনে করি, এটা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বাধীন, সাহসী এবং সুসংহত ‘সার্বভৌম কূটনীতির’ এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন। এমনকি তিনি ভারত সফরের জন্য এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেননি—যার পেছনে অন্যতম প্রধান মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক কারণ যে শেখ হাসিনার উপস্থিতি এবং প্রত্যর্পণ ইস্যু, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তারেক রহমানের এই দূরদর্শী diplomatic leverage এবং ‘ভারতের চোখে চোখ রেখে’ কথা বলার যে রাজনৈতিক সাহস, তার সামনে দাঁড়িয়ে ভারত আজ বাস্তবতা বুঝতে বাধ্য হচ্ছে। ঢাকা আজ দিল্লির দাসত্ব স্বীকার না করে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মমর্যাদার সঙ্গে কথা বলছে, আর তার ফলশ্রুতিতেই ভারতের কূটনৈতিক ভাষায় এসেছে এই বিস্ময়কর পরিবর্তন।
 
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য বিস্তারিত পর্যালোচনা করলে আরও একটি চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় বেরিয়ে আসে। সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি শেখ হাসিনা যে পরিস্থিতিতে ভারত গিয়েছিলেন, সেটিকে খোলাখুলিভাবে ‘বিয়োগান্তক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন এবং স্পষ্টভাবে ‘নিরীহ মানুষের প্রাণহানি’র কথা উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথমবার ভারতের কোনো উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি বা মন্ত্রী পদমর্যাদার হাইকমিশনারের মুখে জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নির্দেশে ঘটানো গণহত্যা ও অগণিত নিরপরাধ মানুষের নির্মম মৃত্যুর কথা প্রকাশ্যে উচ্চারিত হলো। পরোক্ষভাবে হলেও ভারত এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, বাংলাদেশের মাটিতে এক স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে নিরপরাধ ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরেছে। ভারত অনুধাবন করতে পেরেছে যে, একজন গণহত্যাকারীকে দীর্ঘকাল আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বৈরিতা কুড়ানো কোনো চতুর কূটনীতি হতে পারে না।
 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে পরোয়ানা জারি রয়েছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। এমতাবস্থায় ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ (Extradition Treaty) অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার আইনগত সুযোগ কতটুকু?
 
এখানে ২০১৩ সালে সম্পাদিত এবং ২০১৬ সালে সংশোধিত ভারত-বাংলাদেশ বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আইনি ধারাগুলো বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি:
 
১. চুক্তির অনুচ্ছেদ ১ এবং ২ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হন বা দণ্ডপ্রাপ্ত হন, যা উভয় দেশের আইনেই অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং যার ন্যূনতম শাস্তি ১ বছরের কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড, তবে তাঁকে প্রত্যর্পণ করতে উভয় দেশ বাধ্য। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে গণহত্যার অভিযোগ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে, তা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন এবং ভারতের দণ্ডবিধি—উভয় দেশেই গুরুতর প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।
 
২. চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী, কোনো অপরাধ যদি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ (Political offense) হয়, তবে অভিযুক্তকে ফেরত না দেওয়ার বা প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার বা সুযোগ ভারতের রয়েছে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ২০১৬ সালের সংশোধনী!অনুচ্ছেদ ৬-এর উপ-ধারা (২)-এ স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, কতগুলো নির্দিষ্ট অপরাধকে কোনোভাবেই ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তার মধ্যে অন্যতম হলো: হত্যা (Murder), গণহত্যা (Genocide), অপহরণ, বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ। যেহেতু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগই হচ্ছে নির্বিচারে ছাত্র-জনতা হত্যা ও গণহত্যা, সেহেতু অনুচ্ছেদ ৬-এর রাজনৈতিক বাহানা দিয়ে ভারতকে রক্ষা করার আইনি সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
 
৩. চুক্তিটির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে কিছু মানবিক বা প্রযুক্তিগত কারণে প্রত্যর্পণ না করার সুযোগ রাখা হয়েছে—যেমন, যদি আবেদনটি ‘সুনির্দিষ্ট বিচারে অনিচ্ছাকৃত বা অসৎ উদ্দেশ্যে’ (not in the interest of justice) করা হয়, কিংবা যদি অপরাধটি অত্যন্ত পুরোনো হয়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেখানে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করছে, সেখানে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে পার পাওয়ার সুযোগ ভারতের জন্য আইনগত ও নৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল।
 
ফলে আইনি কাঠামোর দিক থেকেও ভারত সরকারের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়ার মতো শক্ত কোনো আইনি যুক্তি নেই। হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যখন বলেন যে “আইনি প্রক্রিয়া চলমান”, তখন তা পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে ভারত এখন এই প্রত্যর্পণ চুক্তির আইনি ধারাগুলোর আলোকেই বিষয়টি এগোতে দিচ্ছে।
 
আমি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, ভারত এতদিন শেখ হাসিনাকে তাদের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে একটি ‘কার্ড’ বা দাবার গুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে আসছিল। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং দেখছিল যে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকার কতটা স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তা দেখাতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি এই স্বাধীন, শক্ত ও সমমর্যাদার কূটনৈতিক পথ ধরে রাখতে পারে, তবে ভারতের সামনে নতুন করে চিন্তা করা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না। দিল্লির সাউথ ব্লক এতদিনে বুঝে গেছে যে, বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি এবং বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবার বা ব্যক্তির ওপর বাজি ধরা আত্মঘাতী। বাংলাদেশের সার্বভৌম জনমত এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান জানানোই এখন ভারতের একমাত্র বুদ্ধিমানের কাজ।

পরিশেষে বলতে চাই, বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর এই স্বীকারোক্তি ও খোলামেলা বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনীতির এক ঐতিহাসিক ও মাইলফলক জয়। শেখ হাসিনার পলায়নের মনগড়া সত্য ফাঁস হওয়া যেমন একদিকে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভণ্ডামির ওপর চপেটাঘাত, তেমনি তাঁর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া চলমান থাকা এবং গণহত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে নেওয়া বাংলাদেশের জনগণের সত্যের লড়াইয়ের এক বিরাট নৈতিক বিজয়। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ সরকার কীভাবে এই আইনি ও কূটনৈতিক অগ্রগতিকে চূড়ান্ত রূপ দিয়ে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করে এবং দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করে। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
 
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, ‘আমার দিন’।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com  
 

এমএসএম / এমএসএম

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান

বানিজ্য সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

পর্যটন: সেকাল, একাল এবং ভবিষৎকাল