ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২ বছর: ইতিহাসের গৌরব, গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও আগামীর প্রত্যয়


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ২০-১০-২০২৬ রাত ৯:৪৩

জাতির ইতিহাসে কিছু প্রতিষ্ঠান কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; সেগুলো হয়ে ওঠে একটি জাতির বিবেক, সংগ্রামের প্রতীক এবং স্বাধীন চিন্তার আশ্রয়স্থল। বাংলাদেশের জাতীয় প্রেস ক্লাব তেমনই এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ৭২ বছরের পথচলায় এই প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই এবং রাষ্ট্র ও সমাজের অসংখ্য রাজনৈতিক পালাবদল।

আজ ২০ অক্টোবর ২০২৬। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই ঐতিহাসিক দিনে ফিরে তাকালে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে কেবল একটি সাংবাদিক সংগঠনের ইতিহাস নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক অনন্য দলিল।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রারই এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি প্রজন্মের সাংবাদিকদের কলমে, প্রতিবাদে, সাহসে এবং আত্মত্যাগে রচিত হয়েছে জাতীয় জীবনের অসংখ্য গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান:
সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের পেশা নয়; এটি সত্য অনুসন্ধান, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহান সামাজিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন স্বাধীন চিন্তা, নৈতিক সাহস এবং পেশাগত সততা।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতারা এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সাংবাদিকরা রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা ব্যক্তিগত অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা করতে পারবেন।

সেই স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় জাতীয় প্রেস ক্লাব হয়ে ওঠে সাংবাদিকদের মিলনমেলা, মুক্তচিন্তার কেন্দ্র এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের এক জীবন্ত সাক্ষী।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক সংকটময় মুহূর্ত এসেছে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নীরব থেকেছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভক্ত হয়েছে, কিন্তু সাংবাদিক সমাজের একটি সাহসী অংশ সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রাঙ্গণ বহুবার সেই প্রতিবাদী চেতনার আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ: কলমের অবিস্মরণীয় ভূমিকা:
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে আলাদা করা যায় না।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজ যখন রাজপথে আন্দোলন করছিল, তখন সাংবাদিকদের একটি অংশ সেই আন্দোলনের সংবাদ, প্রতিবাদ ও জনমত গঠনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের প্রতিবাদে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের আইন পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ ছিল নৈতিক সাহসের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিক সমাজের অবদান জাতীয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর সামরিক অভিযানে সংবাদপত্রের কার্যালয় ও সাংবাদিকতার অবকাঠামোও আক্রমণের শিকার হয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবও সেই সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি।

একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখকরাও।

তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্য প্রকাশের সংগ্রাম কখনো কখনো জীবনের সর্বোচ্চ মূল্য দাবি করে।

সাংবাদিকতা ও সাহিত্য: একই চেতনার দুই প্রবাহ
জাতীয় প্রেস ক্লাবের অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো সাংবাদিকতার সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক।

বাংলাদেশের বহু খ্যাতিমান সাংবাদিক একই সঙ্গে ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁদের লেখনীতে সংবাদ ও সাহিত্য পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে।

আবুল মনসুর আহমদ, ফয়েজ আহমদ, নির্মল সেন, শামসুর রাহমান, শহীদুল্লাহ কায়সার, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, রাহাত খান, মাহফুজউল্লাহ, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজসহ অসংখ্য সাংবাদিক-সাহিত্যিক আমাদের জাতীয় মনন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।

সাংবাদিকতা আমাদের জানায় কী ঘটেছে; সাহিত্য আমাদের উপলব্ধি করতে শেখায় কেন ঘটেছে এবং তার মানবিক তাৎপর্য কত গভীর।

সংবাদপত্রের ভাষা যেখানে তথ্যের নির্ভুলতা দাবি করে, সাহিত্যের ভাষা সেখানে মানুষের অনুভূতি, কল্পনা ও বিবেককে আলোড়িত করে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক-লেখকরা দীর্ঘদিন ধরে এই দুই ধারার মধ্যে এক অসাধারণ সেতুবন্ধ রচনা করেছেন।

এই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

গণতন্ত্রের সংগ্রামে জাতীয় প্রেস ক্লাব:
জাতীয় প্রেস ক্লাবের পরিচয় শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসেও এর রয়েছে বিশেষ স্থান।

স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবি, সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং নাগরিক অধিকারের আন্দোলনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রাঙ্গণ বহুবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এই প্রাঙ্গণে কখনো উচ্চারিত হয়েছে প্রতিবাদের স্লোগান, কখনো অনুষ্ঠিত হয়েছে সংবাদ সম্মেলন, কখনো রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিরসনে আলোচনার উদ্যোগ।

একসময় জাতীয় প্রেস ক্লাবকে গণতন্ত্রের এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ভিন্নমতের মানুষও এখানে কথা বলার সুযোগ পেতেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আজও কি আমরা সেই উদারতা, সহনশীলতা এবং পেশাগত ঐক্যের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছি?

সাংবাদিকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকতে পারে; কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সত্য, ন্যায়, নিরপেক্ষতা এবং জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ বিবেচনা।

জাতীয় প্রেস ক্লাব কোনো রাজনৈতিক দলের সম্প্রসারিত কার্যালয় নয়; এটি হওয়া উচিত বাংলাদেশের সব মত ও পথের পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদাপূর্ণ অভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

স্বাধীন সাংবাদিকতার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ:
একবিংশ শতাব্দীর সাংবাদিকতা এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রযুক্তির বিস্তার, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংবাদ পরিবেশনের প্রচলিত কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছে।

একসময় একটি সংবাদ প্রকাশের জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সম্পাদকীয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হতো। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি তথ্য বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

কিন্তু এই গতির সঙ্গে বেড়েছে ভুল তথ্য, অপপ্রচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার ঝুঁকি।

সংবাদমাধ্যমের মালিকানা ও বিজ্ঞাপননির্ভরতা অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং গভীর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনের গুরুত্ব কখনো কখনো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় জাতীয় প্রেস ক্লাবকে শুধু ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে থাকলে চলবে না; সাংবাদিকতার আধুনিকায়ন, নৈতিকতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির অন্যতম নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে হবে।

সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে সেই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সাংবাদিকের বিবেক, সততা এবং দায়িত্ববোধের ওপর।

রাজনৈতিক বিভাজন নয়, প্রয়োজন পেশাগত ঐক্য:
বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের অন্যতম বড় সংকট রাজনৈতিক বিভাজন।

দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি পেশাগত সংহতি ও পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, সাংবাদিক হিসেবে তাঁর অধিকারই সবার আগে বিবেচিত হওয়া উচিত।

কোনো সংবাদমাধ্যমের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি হলে দলীয় অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে সাংবাদিকতার নামে অপপ্রচার, অসত্য তথ্য পরিবেশন কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে পেশার অপব্যবহারও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হলো—সাংবাদিক সমাজের মধ্যে পেশাগত ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের পুনর্জাগরণ।

মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু সত্যের প্রশ্নে বিভক্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

প্রবাসী সাংবাদিকতা ও বিশ্ববাংলার নতুন বাস্তবতা:
আজ বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের জীবন, সংগ্রাম, সাফল্য ও সমস্যাও বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিকরা দেশের সঙ্গে প্রবাসী সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগসেতু তৈরি করেছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত প্রবাসী সাংবাদিকরা শুধু প্রবাসীদের সংবাদ পরিবেশন করছেন না; তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গঠনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছেন।

এই বাস্তবতায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের উচিত প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাদার সাংবাদিকদের সঙ্গে আরও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা বিনিময়, পেশাগত প্রশিক্ষণ, প্রবাসী সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে জাতীয় প্রেস ক্লাব একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।

বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে শুধু দেশের সীমানায় আবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।

আগামী দিনের জাতীয় প্রেস ক্লাব কেমন হওয়া উচিত?
৭২ বছরের ঐতিহ্য একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি দায়িত্বেরও।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের আগামী দিনের পথচলায় কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিকাশে প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রবীণ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা এবং তরুণ সাংবাদিকদের উদ্ভাবনী চিন্তার মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থত, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, কল্যাণ ও মর্যাদা রক্ষায় জাতীয় প্রেস ক্লাবকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

পঞ্চমত, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, গবেষণা এবং সংস্কৃতিচর্চার ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নিয়মিত প্রকাশনা, সাহিত্যসভা ও জ্ঞানচর্চার পরিসর সম্প্রসারণ করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, জাতীয় প্রেস ক্লাবকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, বিতর্ক থাকবে, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কখনো হারিয়ে যাবে না।

৭২ বছরের গৌরব থেকে নতুন জাগরণের আহ্বান:
জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপন, স্মৃতিচারণ কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন নয়। এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং নতুন অঙ্গীকার গ্রহণেরও এক ঐতিহাসিক উপলক্ষ।

আমাদের পূর্বসূরিরা যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল সত্যের প্রতি আনুগত্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং মানুষের কল্যাণে সাংবাদিকতার নিরন্তর সাধনা।

আজ সেই উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকদের।

আমরা এমন একটি জাতীয় প্রেস ক্লাব দেখতে চাই, যেখানে কোনো সাংবাদিক তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হবেন না; যেখানে সত্য প্রকাশের সাহসকে সম্মান জানানো হবে; যেখানে তরুণ সাংবাদিকরা প্রবীণদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখবেন এবং প্রবীণরা নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাকে উৎসাহিত করবেন।

আমরা এমন একটি সাংবাদিক সমাজ চাই, যারা ক্ষমতার প্রশংসায় নয়, সত্যের অনুসন্ধানে নিবেদিত থাকবে; যারা ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে জনগণের অধিকারকে বড় করে দেখবে; যারা রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে পেশাগত সততাকে অধিক মর্যাদা দেবে।

কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্য, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতার ভিত্তিও সুদৃঢ় হতে পারে না।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২ বছরের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—কলমের শক্তি বন্দুকের শক্তির চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, সত্যের শক্তি ক্ষমতার চেয়ে মহৎ এবং বিবেকের স্বাধীনতা যেকোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে মূল্যবান।

এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই আমাদের আহ্বান—ফিরে আসুক জাতীয় প্রেস ক্লাবের সেই উদার, গণতান্ত্রিক, সাহসী ও সৃজনশীল ঐতিহ্য। দূর হোক রাজনৈতিক বিভাজন, পেশাগত সংকীর্ণতা এবং ব্যক্তিস্বার্থের অন্ধ প্রতিযোগিতা।

জাতীয় প্রেস ক্লাব হয়ে উঠুক আবারও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, মুক্তচিন্তার আলোকবর্তিকা এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনার এক অটল প্রহরী।

মনে রাখতে হবে, জাতীয় প্রেস ক্লাবের গৌরব শুধু তার অতীতে নয়; তার প্রকৃত মহত্ত্ব নির্ধারিত হবে আগামী দিনে সত্য, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের পক্ষে কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে, তার ওপর।

৭২ বছরের অর্জন হোক নতুন শতাব্দীর সাংবাদিকতার শক্তিশালী ভিত্তি। ইতিহাসের গৌরব হোক ভবিষ্যতের প্রেরণা।

জাতীয় প্রেস ক্লাব বেঁচে থাকুক সাংবাদিকদের ঐক্যে, সমৃদ্ধ হোক মুক্তচিন্তায়, আর চিরজাগ্রত থাকুক সত্য ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে।

শুভ ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, জাতীয় প্রেস ক্লাব।

লেখক পরিচিতি:
মোহাম্মদ আনোয়ার
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট। 

এমএসএম / এমএসএম

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২ বছর: ইতিহাসের গৌরব, গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও আগামীর প্রত্যয়

নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ - সবার আগে বাংলাদেশ

বিমানবন্দরে নিরাপত্তাহীনতা-সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনা নির্মূলের বিকল্প নেই

অসুস্থ হওয়ার পরই কি স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভাবনা শুরু হয়?

শিক্ষিত বেকার বাড়ছে: কর্মসংস্থানে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

​শারদীয় দুর্গোৎসব: ইতিহাস, সত্যের জয়গান ও আবহমান বাংলার সম্প্রীতি

সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?

বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা