রেনং থেকে মাতারবাড়ী: বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড কৌশলগত অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনা
মানচিত্রে ২০°৩৪´ থেকে ২৬°৩৮´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১´ থেকে ৯২°৪১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অবস্থিত ও ১,৪৭,৬১০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট পৃথিবীর একমাত্র ব-দ্বীপটি অর্থনৈতিক দিক থেকে বৃহৎ পরাশক্তিদের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অথচ একবিংশ শতাব্দীর ভূ-অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি এখন আর একক কোনো আঞ্চলিক শক্তির বলয়ে আবদ্ধ নয়। গ্লোবাল সাউথ ও এলডিসি ভুক্ত দেশগুলোও জায়ান্ট অর্থনীতি দেশগুলোর প্রতি ক্রমান্বয়ে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনছে। পৃথিবীর একমাত্র ব-দ্বীপ (বাংলাদেশ) স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (CDP) প্রস্তুতি পর্বের সময়সীমা ৩ বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করার সুপারিশ করেছে ।
এমতাবস্থায় এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর সময় এসে গেছে। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য নীতিতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে থাকার প্রবণতা আমাদেরকে একদিকে যেমন একটি টেকসই ও স্বাধীন অর্থনীতি বিনির্মাণে বাধার সৃষ্টি করেছে ঠিক তেমনি ভাবে একক কোনো দেশের ওপর অতি-নির্ভরতাশীলতা তৈরি করেছে।
এই বাস্তবতায়, বর্তমান প্রগতিশীল সরকারের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' (Bangladesh First) নীতি বাস্তবায়নের এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। আর এই নীতির সফল পথনকশা লুকিয়ে আছে 'লুক ইস্ট' বা পূর্বমুখী কূটনীতির পরিবর্ধিত রূপ এবং 'বিমসটেক' (BIMSTEC) ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের সাথে কৌশলগত বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির মধ্যে।
একক প্রভাবের বলয় থেকে মুক্তির হাতিয়ার:
বৃহৎ পরাশক্তিদের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতায় কিছুটা বহুমাত্রিকতা কিংবা বৈচিত্রতা আনতে বিম্সটেকের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের সাথে বাণিজ্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সহযোগিতা সংস্থা সার্ক দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে অচল হয়ে পরায় এই অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলো নিয়ে গঠিত বিম্সটেক ভূ-অর্থনৈতিক সংযোগের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছে। তবে বিম্সটেকে থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো থাকায় এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করা যে কোন দেশের পক্ষে কিছুটা জটিল। বাংলাদেশ যদি এই জোটে ভারসাম্য (counter-balance) তৈরি করতে চায়, তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি থাইল্যান্ডের সাথে কৌশলগত জোট গঠন করা অপরিহার্য।
বাণিজ্যের সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা:
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকে যায় থাইল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর কী পরিবর্তন আসতে পারে?
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (DCCI) এবং ইউনেস্ক্যাপ (UNESCAP)-এর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক মোট বাণিজ্য প্রায় ১.১৩ বিলিয়ন (১১৩ কোটি) মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের রপ্তানি ১.০৪ বিলিয়ন ডলার ও বাংলাদেশের রপ্তানি ৮৪.৭৭ মিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশের এলডিসি (LDC) গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পর এই সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে । গ্র্যাজুয়েশনের ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশ থাইল্যান্ডের বাজারে তার শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (DFQF) বাজার সুবিধা হারাবে, ঠিক তেমনি ভাবে থাইল্যান্ডের সাথে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) বাস্তবায়িত হলে বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। যা বাংলাদেশের জন্য লাইফলাইন হবে।
একই সাথে সম্পূরক প্রশ্ন থেকে যায় থাইল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশ নিজেদেরকে কিভাবে ব্র্যান্ডিং করতে পারে?
তৈরি পোশাকশিল্পের এক চাটিয়া মার্কেট উদয়মান ঔষধ শিল্প বাংলাদেশকে থাইল্যান্ডের বাজারে ব্রান্ডিয়ে যথেষ্ট সহায়তা করতে পারে।
তৈরি পোশাক শিল্প:
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ২০২৪ সালের তথ্য মতে, বার্ষিক ৩৮.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করে এবং ৬.৯ শতাংশ শেয়ার ধরে রেখে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। এই অবস্থান বাংলাদেশকে একদিকে যেমন থাইল্যান্ডের ফ্যাশন ও খুচরা বাজারে ওভেন ও নিটওয়্যার পণ্যের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে ঠিক তেমনিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির একক নির্ভরতা ও কমিয়ে আনতে পারে।
ঔষধ শিল্প
থাইল্যান্ড বয়স্ক জনগোষ্ঠী ও অসংক্রামক রোগের কারণে জেনেরিক ওষুধের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদন সত্ত্বেও থাইল্যান্ড কিছু সাশ্রয়ী জেনেরিক আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশ কম খরচে উচ্চমানের জেনেরিক (অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টি-ইনফেকটিভ, কার্ডিওভাসকুলার, ডায়াবেটিস ও ওটিসি ওষুধ) গুলো তৈরি করতে পারে, যা থাইল্যান্ডের সরকারি টেন্ডার ও প্রাইভেট বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশ মোট ১৯৪.৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ঔষধ বিশ্ববাজারে রপ্তানি করেছে। যা একদিকে যেমন বাংলাদেশকে উদায়মান ঔষধ শিল্প বা "থ্রাস্ট সেক্টর" হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সহায়তা করেছে ঠিক তেমনি ভাবে থাইল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের চাহিদাকে প্রাসঙ্গিক করেছে।
সুনীল অর্থনীতি ও বঙ্গোপসাগরের সার্বভৌমত্ব রক্ষা:
থাইল্যান্ডের সাথে সম্পর্কের আরেকটি সবচেয়ে বড় ডাইমেনশন হতে পারে ' ব্লু-ইকোনমি' বা সুনীল অর্থনীতি। ২০১৪ সালের ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত (PCA)-এর রায়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সমুদ্রসীমা বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ)-এর আইনগত অধিকার এবং ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেও তার সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন সক্রিয় উপস্থিতি, নজরদারি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কূটনৈতিক লিভারেজ।
বিমসটেকের মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট কো-অপারেশন ও এক্সপার্ট গ্রুপ অন মেরিটাইম সিকিউরিটি কোঅপারেশন -এর (Maritime Domain Awareness, HADR, Blue Economy) এর আওতায় থাইল্যান্ডের কারিগরি দক্ষতা ও বিনিয়োগকে বঙ্গোপসাগরে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার সুনীল অর্থনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
আবার থাইল্যান্ডের 'রেনং বন্দর' (Ranong Port) থেকে বাংলাদেশের 'চট্টগ্রাম' বা 'মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর'-এর সরাসরি নৌ-যোগাযোগ চালু হলে মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমে আসবে এবং বঙ্গোপসাগর একটি অন্যতম শান্ত ও সমৃদ্ধ বাণিজ্য অঞ্চলে পরিণত হবে। যা শুধু বাণিজ্য নয়—বাংলাদেশের EEZ-এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে ডি-ফেক্টো সার্বভৌমত্বও জোরদার করবে।
এই অংশীদারিত্ব কীভাবে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে?
যৌথ গবেষণা, অ্যাকুয়াকালচার, সার্ভেইল্যান্স টেকনোলজি ও মেরিন বায়োটেক প্রকল্প বাংলাদেশকে একদিকে যেমন EEZ-এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে সাহায্য করবে, ঠিক তেমনিভাবে কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর নজরদারির সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
আবার, বিমসটেকের মেরিটাইম সিকিউরিটি গাইডলাইনস ও MDA উদ্যোগ থাইল্যান্ড (আসিয়ান ভুক্ত সদস্য দেশ) থাকায় বাংলাদেশকে একদিকে যেমন একতরফা পদক্ষেপ প্রতিরোধে কূটনৈতিক হাতিয়ার দেবে ঠিক অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
ব্যাংকক ভিশন ও বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতির কৌশলগত মিল:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে (মাল্টিলেটারিজম) বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সবার উপরে স্থান দেয়। অন্যদিকে ব্যাংকক ভিশন ‘Prosperous, Resilient and Open (PRO) BIMSTEC’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দেয়। ফলে থাইল্যান্ডের 'ব্যাংকক ভিশন ২০৩০'-এর সাথে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভীষ্টের এক চমৎকার মিল রয়েছে। উভয়ই একক কোন দেশের প্রতি নির্ভরশীলতা এড়িয়ে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ যদি থাইল্যান্ড-ভারত-মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় হাইওয়ের (Trilateral Highway) সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারে, তবে তা বৃহৎ পরাশক্তিদের বাইপাস করে সরাসরি আসিয়ান (ASEAN) অঞ্চলের বাজারে নিজেদের প্রবেশপথ উন্মুক্ত করবে। এবং বাংলাদেশ ও আসিয়ান বাজারে মধ্যবর্তী বাণিজ্যক মেডিয়েটর হিসেবে থাইল্যান্ড কাজ করার অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। যা বর্তমান সরকারের প্রগতিশীল কূটনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্যের উদাহরণ সৃষ্টি করবে, যেখানে বাংলাদেশ আর কোনো আঞ্চলিক শক্তির 'ল্যান্ডলকড' বা প্রভাবাধীন মনস্তত্ত্বের বেড়াজালে আটকে থাকবে না থাকবে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ সেতু বা 'কৌশলগত হাবে' পরিণত হবে।
এমএসএম / এমএসএম
রেনং থেকে মাতারবাড়ী: বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড কৌশলগত অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনা
অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন: দোষীদের বিচার নিশ্চিতকরণ ও নিরপরাধ শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসঃ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সবার সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা
লক্ষ্মীপূজার তাৎপর্য: সমৃদ্ধির সাধনা, প্রজ্ঞার আলো ও মানবতার জয়
শুভ বিজয়া দশমী: অশুভের বিনাশ, সত্য ও মানবতার জয়
জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২ বছর: ইতিহাসের গৌরব, গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও আগামীর প্রত্যয়
নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ - সবার আগে বাংলাদেশ
বিমানবন্দরে নিরাপত্তাহীনতা-সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনা নির্মূলের বিকল্প নেই
অসুস্থ হওয়ার পরই কি স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভাবনা শুরু হয়?
শিক্ষিত বেকার বাড়ছে: কর্মসংস্থানে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি
শারদীয় দুর্গোৎসব: ইতিহাস, সত্যের জয়গান ও আবহমান বাংলার সম্প্রীতি