ঢাকা শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

৭ নভেম্বর ও জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শন একটি জাতিকে গড়ার স্বপ্ন


‎ড:সুলতান মাহমুদ রেজা photo ‎ড:সুলতান মাহমুদ রেজা
প্রকাশিত: ৭-১১-২০২৬ রাত ১০:১২

‎বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

৭ নভেম্বর ১৯৭৫ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অস্থির ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন অর্থনৈতিক সংকট প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামরিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তখন দেশ এক গভীর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক বাঁক তৈরি করে। ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় অনস্বীকার্য। এর পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা জাতীয়তাবাদ অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন সামনে আসে নতুন গুরুত্বে।

‎এই প্রেক্ষাপটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শিক্ষা দর্শনের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। কারণ একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেবল রাজনৈতিক কাঠামো দিয়ে নির্মিত হয় না। সেই ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় মানুষের জ্ঞান দক্ষতা নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে।

‎জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের পথ হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা। তাঁর সময়ে সাধারণ শিক্ষা কারিগরি শিক্ষা শিক্ষক প্রশিক্ষণ গণশিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল তার পেছনে ছিল একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তা শিক্ষিত মানুষই হবে উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের প্রধান শক্তি।

‎৭ নভেম্বর  অস্থিরতার ভেতর নতুন পথের সন্ধান

‎১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে সময়টি ছিল গভীর অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তরে এর প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ৬ নভেম্বরের মধ্যরাত পেরিয়ে ৭ নভেম্বরের ভোরে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। সিপাহী ও জনতার অংশগ্রহণে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী সময়ে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি পায়।

‎৭ নভেম্বরের ঘটনাকে কেউ দেখেন জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মোড়বদল হিসেবে। কেউ দেখেন ধারাবাহিক সামরিক রাজনৈতিক অস্থিরতার অংশ হিসেবে। ইতিহাসের মূল্যায়নে এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন সামনে আনেন সেখানে জাতীয় ঐক্য উৎপাদন আত্মনির্ভরতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

‎রাজনীতি থেকে শিক্ষা রাষ্ট্রচিন্তার বিস্তৃত পরিসর

‎জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনায় সাধারণত জাতীয়তাবাদ বহুদলীয় রাজনীতি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু এর সঙ্গে তাঁর শিক্ষা ভাবনাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

‎তিনি উপলব্ধি করেছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়। যখন একটি জাতি জ্ঞান দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার দিক থেকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তাই তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় শিক্ষার সঙ্গে অর্থনীতি কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের একটি যোগসূত্র তৈরি করার চেষ্টা দেখা যায়।

‎তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল শুধু চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতি নয়। শিক্ষা ছিল মানুষকে কর্মক্ষম দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভর করে তোলার প্রক্রিয়া।

‎গণমুখী শিক্ষার ভাবনা

‎স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা সংকটে জর্জরিত ছিল। শিক্ষক সংকট অবকাঠামোর ঘাটতি। শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য এবং বিপুলসংখ্যক নিরক্ষর মানুষ সব মিলিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল বড় ধরনের পুনর্গঠনের।

‎এই বাস্তবতায় গণশিক্ষার প্রসারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার উদ্যোগ। নৈশ বিদ্যালয় ও বিভিন্ন গণশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজের বৃহত্তর অংশকে শিক্ষার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়।

‎এই চিন্তার মূল কথা ছিল সহজ শিক্ষা যেন কেবল শহরের মধ্যবিত্ত বা সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের সম্পদ হয়ে না থাকে। শিক্ষা পৌঁছে যাক গ্রাম প্রত্যন্ত জনপদ এবং সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে।

‎একটি দরিদ্র ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য এই চিন্তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়নের প্রথম শর্তই হলো মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

‎প্রাথমিক শিক্ষা জাতির ভিত নির্মাণ

‎একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো প্রাথমিক শিক্ষা। এই স্তর দুর্বল হলে ওপরের স্তরের যত উন্নয়নই হোক তার সুফল সীমিত থেকে যায়।

‎জিয়াউর রহমানের সময় প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার। শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার ধারণাকে জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সামনে আনার প্রচেষ্টাও ছিল।

‎গ্রামের একটি শিশুও যেন শহরের শিশুর মতো শিক্ষার সুযোগ পায় এই সমতার ধারণাই ছিল এ ধরনের উদ্যোগের অন্তর্নিহিত দর্শন।

‎কারিগরি শিক্ষা সনদের বাইরে দক্ষতার বাংলাদেশ

‎জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা।

‎তিনি বুঝেছিলেন কেবল সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুলসংখ্যক তরুণ তৈরি করে তাদের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কৃষি শিল্প নির্মাণ যন্ত্রপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন উৎপাদন খাতে দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন।

‎এই উপলব্ধি থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইউনেসকোর ১৯৮০ সালের একটি প্রতিবেদনে ১৯৭৬-৭৭ ও ১৯৭৭-৭৮ সময়ে নতুন পাঠ্যক্রম নিরক্ষরতা দূরীকরণে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মৌলিক শিক্ষা সংক্রান্ত একাডেমি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি চারটি পলিটেকনিক ও ৫৭টি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

‎এই উদ্যোগগুলোর তাৎপর্য শুধু প্রতিষ্ঠান সংখ্যা বৃদ্ধিতে নয়। এর পেছনে ছিল একটি মৌলিক ধারণা দক্ষতা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না।

‎আজ যখন দক্ষ মানবসম্পদ কারিগরি শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার নিয়ে এত আলোচনা  তখন সেই সময়ের এই ভাবনাটির গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা যায়।

‎শিক্ষক শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ

‎কোনো শিক্ষানীতি যত আধুনিকই হোক দক্ষ শিক্ষক ছাড়া তার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

‎প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন এবং শিক্ষাদান পদ্ধতির আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিক্ষককে কেবল পাঠ্যবই পড়ানোর ব্যক্তি নয় বরং জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা এ সময়ের শিক্ষা ভাবনায় স্পষ্ট ছিল।

‎কারণ একটি শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক কখনো কখনো একটি পুরো প্রজন্মের চিন্তার ধরন বদলে দিতে পারেন।

‎উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রশ্ন

‎জাতীয় উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়েও জিয়াউর রহমানের সময় গুরুত্বারোপ করা হয়। উচ্চশিক্ষাকে কেবল ডিগ্রি অর্জনের পর্যায়ে না রেখে গবেষণা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

‎একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই সত্যিকার অর্থে জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়। যখন সেখানে শুধু পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা হয় না নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয়। গবেষণা হয় এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়।

‎এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার যে প্রচেষ্টা দেখা যায় তা বাংলাদেশের পরবর্তী শিক্ষা পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে।

‎শিশুদের জন্য আলাদা পৃথিবীর স্বপ্ন

‎শিক্ষা দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শিশুদের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশ।

‎শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্যক্রম জাতীয় শিশু পুরস্কার নতুন কুঁড়ি ধরনের প্রতিযোগিতা শিশুদের বিনোদন ও বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শিশুদের শুধু পরীক্ষার খাতার শিক্ষার্থী হিসেবে না দেখে তাদের সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল।

‎শিশুর হাতে বই যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন খেলাধুলা সংস্কৃতি বিজ্ঞানচর্চা ও কল্পনার স্বাধীনতা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে এই ভাবনাটি ছিল তাঁর শিক্ষা দর্শনের মানবিক দিক।

‎ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ

‎জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনায় ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছিল। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ এবং ইসলামী শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মীয় শিক্ষা লাভের সুযোগের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

‎একটি বহুধর্মীয় সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা সহনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই জায়গায় শিক্ষা শুধু জ্ঞান দেয় না মানুষকে মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলে।

‎শিক্ষা ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা

‎জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শনকে তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।

‎তিনি কৃষি শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। আর এসব ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানুষ। ফলে শিক্ষা ও অর্থনীতিকে একই বৃহত্তর উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় পাওয়া যায়।

‎একজন শিক্ষিত কৃষক আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারেন। একজন প্রশিক্ষিত যুবক শিল্পে দক্ষ কর্মী হতে পারেন। একজন কারিগরি শিক্ষার্থী নিজের কর্মসংস্থান নিজেই সৃষ্টি করতে পারেন। আর একজন গবেষক দেশের নতুন সমস্যার নতুন সমাধান খুঁজে দিতে পারেন।

‎অর্থাৎ শিক্ষা তাঁর কাছে ছিল উৎপাদনশীল শক্তি।

‎৭ নভেম্বরের শিক্ষা রাষ্ট্রের চেয়েও বড় মানুষ

‎৭ নভেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক যতই থাকুক একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার মানুষের ওপর।

‎রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন অবকাঠামো প্রয়োজন কিন্তু এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হয় মানুষকে।

‎জিয়াউর রহমানের শিক্ষা-ভাবনার মূল্যায়ন করতে গেলে এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছিলেন সেখানে মানুষ হবে শিক্ষিত কর্মক্ষম ও আত্মনির্ভর তরুণরা শুধু চাকরির প্রত্যাশী হবে না তারা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের অংশীদার হবে গ্রাম ও শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমবে আর শিক্ষা হবে জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

‎ইতিহাসের আলোয় মূল্যায়ন

‎তবে ইতিহাসের কোনো ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর সময় সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হয়। জিয়াউর রহমানের সময় ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রশাসনিক নানা চ্যালেঞ্জে পূর্ণ। তাঁর শিক্ষা উদ্যোগের সব লক্ষ্য যে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল এমন দাবি ইতিহাসসম্মত হবে না।

‎তবে তাঁর সময়ে শিক্ষা গণশিক্ষা শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল তা বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের ইতিহাসে আলোচনার দাবি রাখে।

‎বিশেষ করে কর্মমুখী শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির যে ধারণা তখন গুরুত্ব পেতে শুরু করেছিল। বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় তার প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

‎আজকের বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের শিক্ষা-দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা

‎আজ বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। কিন্তু একই সঙ্গে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেই হবে না গবেষণার মান বাড়াতে হবে। শুধু সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই হবে না। প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে হবে। শুধু শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নত হলেই হবে না প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীকেও সমান সুযোগ দিতে হবে।

‎এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনার কয়েকটি দিক নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে গণমুখী শিক্ষা কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রামীণ শিক্ষার প্রসার গবেষণা এবং আত্মনির্ভর মানবসম্পদ তৈরি।

‎একটি জাতি যখন নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায় তখন তার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানুষের মেধা ও দক্ষতায়।

‎পরিশেষ

‎ইতিহাসের কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় থাকে না তারা একটি জাতির রাজনৈতিক স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন।

‎আর জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শনকে যদি সেই সময়ের বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে দেখা হয় তাহলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।তিনি শিক্ষাকে রাষ্ট্রের অলংকার হিসেবে নয় রাষ্ট্র নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।

‎একটি দরিদ্র যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত দেশকে দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন ছিল শিক্ষিত মানুষ দক্ষ জনশক্তি এবং আত্মনির্ভর নাগরিক। সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁর শিক্ষা ভাবনায় সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ গণশিক্ষা গ্রামীণ শিক্ষার বিস্তার এবং গবেষণার গুরুত্ব সামনে আসে।

‎আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেই চিন্তার দিকে ফিরে তাকালে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে আমরা কেমন শিক্ষা চাই।

‎শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থী নাকি এমন মানুষ যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে অন্যের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। দেশকে ভালোবাসে যুক্তিবোধসম্পন্ন এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সমাজের নেতৃত্ব দিতে পারে।

‎সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার পদ্ধতি বদলাবে প্রযুক্তি বদলাবে পাঠ্যক্রম বদলাবে। কিন্তু একটি জাতির অগ্রগতির জন্য শিক্ষাকে মানুষের শক্তিতে রূপান্তর করার যে মৌলিক দর্শন তার প্রয়োজন কখনো ফুরায় না।

‎সেই অর্থে ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনাও বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

‎

‎সরকারি অধ্যাপক মনোবিজ্ঞান বিভাগ ড: সুলতান মাহমুদ রেজা  শাহ মখদুম  কলেজ রাজশাহী

‎০১৭৯৫০৭৪৩২৫

‎

এমএসএম / এমএসএম

৭ নভেম্বর ও জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শন একটি জাতিকে গড়ার স্বপ্ন

জিয়ার ১৯ দফা থেকে তারেক রহমানের ৩১ দফা: ৭ নভেম্বর কি দেখাবে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন পথ?

রেনং থেকে মাতারবাড়ী: বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড কৌশলগত অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনা

অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন: দোষীদের বিচার নিশ্চিতকরণ ও নিরপরাধ শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসঃ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সবার সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা

​লক্ষ্মীপূজার তাৎপর্য: সমৃদ্ধির সাধনা, প্রজ্ঞার আলো ও মানবতার জয়

শুভ বিজয়া দশমী: অশুভের বিনাশ, সত্য ও মানবতার জয়

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২ বছর: ইতিহাসের গৌরব, গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও আগামীর প্রত্যয়

নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ - সবার আগে বাংলাদেশ

বিমানবন্দরে নিরাপত্তাহীনতা-সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনা নির্মূলের বিকল্প নেই

অসুস্থ হওয়ার পরই কি স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভাবনা শুরু হয়?

শিক্ষিত বেকার বাড়ছে: কর্মসংস্থানে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি