লেখকের কষ্ট
একজন লেখকের জীবন বাইরে থেকে যতটা শান্ত, সুন্দর ও সম্মানজনক মনে হয়, ভেতর থেকে ততটাই নিঃসঙ্গ, কঠিন এবং সংগ্রামময়। মানুষ একটি বই হাতে নিয়ে লেখকের নাম দেখে প্রশংসা করে, একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ পড়ে লেখকের চিন্তার গভীরতায় মুগ্ধ হয়, একটি কবিতা পড়ে আবেগাপ্লুত হয়, কিন্তু খুব কম মানুষই জানতে চায়, এই লেখাটির পেছনে কত নির্ঘুম রাত, কত অপমান, কত প্রত্যাখ্যান, কত আর্থিক সংকট, কত আত্মত্যাগ এবং কত নীরব কান্না লুকিয়ে আছে।
একজন লেখক কলম দিয়ে শুধু শব্দ লেখেন না, তিনি নিজের জীবনের সময়, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং আত্মার একাংশ কাগজে রেখে দেন। একটি ভালো লেখা হঠাৎ জন্ম নেয় না। একটি লেখার পেছনে থাকে বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ, অধ্যয়ন, মানুষের সঙ্গে মিশে জীবনকে বোঝার চেষ্টা এবং নিজের সঙ্গে অসংখ্য নীরব কথোপকথন। অথচ পাঠক মাত্র কয়েক মিনিটে সেই লেখা পড়ে শেষ করে ফেলেন। সেই কয়েক মিনিটের পেছনে যে কয়েক মাস বা কয়েক বছরের শ্রম লুকিয়ে থাকে, তার মূল্য খুব কম মানুষই উপলব্ধি করেন। এটা লেখকের কষ্ট নয়।
লেখকের সবচেয়ে কষ্ট হলো মূল্যায়নের অভাব। সমাজে অনেক পেশার মানুষের কাজ তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয়। একজন চিকিৎসক রোগী সুস্থ করেন, একজন প্রকৌশলী একটি সেতু নির্মাণ করেন, একজন ব্যবসায়ী একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কিন্তু একজন লেখক মানুষের চিন্তাকে বদলান, বিবেককে জাগিয়ে তোলেন, সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখান। এই কাজের ফল অনেক সময় দশ বছর, বিশ বছর কিংবা এক প্রজন্ম পরে দৃশ্যমান হয়। অথচ সেই লেখকের আর্থিক ও সামাজিক মূল্যায়ন ততটা হয় না। মাঝেমধ্যে কিছু লেখকের অবদান স্বীকার করলেও অনেক সময় জীবদ্দশায় যথাযথ স্বীকৃতি পায় না।
একজন লেখক যখন একটি নতুন লেখা শুরু করেন, তখন তিনি জানেন না সেটি আদৌ প্রকাশিত হবে কি না, পাঠক গ্রহণ করবে কি না, নাকি কোনো সম্পাদক একটি বাক্য না পড়েই তা ফিরিয়ে দেবেন। এই অনিশ্চয়তা প্রতিটি লেখকের নিত্যসঙ্গী। তবুও তিনি লেখেন। কারণ লেখালেখি তাঁর কাছে পেশার চেয়েও বড়, এটি তাঁর বিবেকের দায়।
একজন প্রকৃত লেখক সমাজের আয়না। তিনি যা দেখেন, তা-ই তুলে ধরতে চান। কিন্তু সত্য লেখা কখনো সহজ নয়। সত্য লিখলে অনেকের অসন্তোষ তৈরি হয়। ক্ষমতাবানরা বিরক্ত হন, দুর্নীতিবাজরা ক্ষুব্ধ হন, স্বার্থান্বেষীরা লেখককে অপছন্দ করতে শুরু করেন। ফলে একজন লেখককে প্রায়ই নানাভাবে চাপ, সমালোচনা, অপবাদ কিংবা সামাজিক একঘরে হওয়ার ঝুঁকি নিতে হয়।
বাস্তব জীবনে অধিকাংশ লেখক বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন না। অনেকেই চাকরি করেন, সাংবাদিকতা করেন, শিক্ষকতা করেন কিংবা অন্য কোনো পেশায় যুক্ত থেকে অবসরের সময়টুকু লেখার জন্য ব্যয় করেন। দিনের শেষে যখন সবাই বিশ্রাম নেয়, তখন লেখক তাঁর টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে শব্দের সঙ্গে লড়াই করেন। কখনো একটি বাক্য লিখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়। কখনো একটি শব্দের জন্য অভিধান, ইতিহাস, গবেষণা ও স্মৃতির ভেতর ডুব দিতে হয়।
লেখকের আরেকটি বড় কষ্ট হলো নিঃসঙ্গতা। সৃষ্টিশীলতার জন্য একাকিত্ব প্রয়োজন, কিন্তু সেই একাকিত্ব ধীরে ধীরে মানসিক ভারে পরিণত হয়। অনেক সময় পরিবারের মানুষও বুঝতে পারেন না, কেন একজন লেখক চুপচাপ বসে থাকেন, কেন তিনি রাত জেগে লিখেন, কেন তিনি একটি বাক্য নিয়ে এত সময় ব্যয় করেন। এই না-বোঝার কষ্টও কম নয়।
একজন লেখকের লেখা যদি সমাজে আলোড়ন তোলে, তখন সবাই লেখাটির প্রশংসা করে। কিন্তু সেই লেখক যখন অসুস্থ হন, আর্থিক সংকটে পড়েন কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, তখন খুব কম মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়ায়। করতালির শব্দ অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী।
লেখকের জীবন অনেকটা প্রদীপের মতো। প্রদীপ অন্যকে আলো দেয়, কিন্তু নিজে ধীরে ধীরে পুড়ে শেষ হয়ে যায়। একজন লেখকও তাঁর জ্ঞান, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার আলো সমাজকে দেন, কিন্তু সেই আলো জ্বালিয়ে রাখতে গিয়ে নিজের অনেক আনন্দ, অনেক স্বপ্ন এবং অনেক ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দেন।
বেদনাদায়ক বিষয় হলো, অনেক লেখকের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তাঁদের মৃত্যুর পরে। জীবদ্দশায় যাঁরা অবহেলিত ছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁদের বই নিয়ে গবেষণা হয়, তাঁদের নামে পুরস্কার দেওয়া হয়, তাঁদের ছবি দিয়ে অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু তখন সেই মানুষটি আর থাকেন না। এই বাস্তবতা ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে। তবুও লেখক লেখা বন্ধ করেন না। কারণ তিনি জানেন, একটি সত্য বাক্য হাজার মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে পারে। একটি প্রবন্ধ একটি সমাজকে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। একটি কবিতা একজন হতাশ মানুষকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দিতে পারে। একটি বই একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। এই বিশ্বাসই একজন লেখককে বারবার কলম হাতে বসায়। এই বিশ্বাসই তাঁকে অপমানের পরও লিখতে শেখায়, প্রত্যাখ্যানের পরও এগিয়ে যেতে শেখায়, নীরবতার মধ্যেও সত্য উচ্চারণ করতে শেখায়। তাই একজন লেখকের কষ্টকে শুধু ব্যক্তিগত কষ্ট বলে দেখলে ভুল হবে। তাঁর কষ্টের ভেতরে লুকিয়ে থাকে সমাজের বিবেক, ইতিহাসের দলিল এবং ভবিষ্যতের বীজ।
লেখকের জীবনের আরেকটি কঠিন বাস্তবতা হলো আর্থিক অনিশ্চয়তা। সমাজে এমন ধারণা প্রচলিত যে, বই লিখলেই লেখক প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলা ভাষার অধিকাংশ লেখক শুধু বই বিক্রির অর্থে সংসার চালাতে পারেন না। একটি বই লিখতে একজন লেখকের ছয় মাস, এক বছর, কখনো দুই-তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কিন্তু সেই বইয়ের সম্মানী অনেক সময় এতই সামান্য যে, তা দিয়ে কয়েক মাসের সংসারও চলে না। ফলে লেখালেখির পাশাপাশি তাঁদের অন্য পেশায় যুক্ত থাকতে হয়। লেখালেখি তখন জীবিকা নয়, জীবনযুদ্ধের মাঝেও বাঁচিয়ে রাখা একটি ভালোবাসা হয়ে ওঠে।
একজন লেখক যখন একটি বই লেখেন, তখন শুধু লেখাই শেষ দায়িত্ব নয়। তথ্য সংগ্রহ, বই পড়া, বিভিন্ন মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া, প্রয়োজন হলে দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করা, পুরোনো দলিল খুঁজে বের করা, তথ্য যাচাই করা, এসব কাজেও সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। একজন গবেষণাধর্মী লেখক একটি তথ্য ভুল না হওয়ার জন্য দিনের পর দিন পরিশ্রম করেন। কিন্তু পাঠক সেই শ্রমের কেবল শেষ ফলটুকুই দেখেন; পরিশ্রমের ইতিহাসটি আর চোখে পড়ে না।
প্রকাশনা জগতের বাস্তবতাও অনেক সময় একজন লেখকের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন লেখকদের অনেকেই প্রকাশক খুঁজে পান না। আবার কোথাও কোথাও বই প্রকাশের জন্য লেখককেই অর্থ ব্যয় করতে হয়। আবার শুধু বইটি প্রকাশ হলেই লেখকের দায়িত্ব শেষ হয় না, তখন শুরু হয় আরেক দায়িত্ব। পাঠক খুঁজে বের করা একটি মহা দায়িত্ব। বইয়ের বিনিয়োগ তুলতে পাঠকের ভূমিকা অপরিসীম। পর্যাপ্ত পাঠক বা ক্রেতা না থাকলে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে ফলে নতুন করে লেখা শুরু করার মানসিক শক্তি হারিয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে লেখককে পাঠকের পিছনে দৌড়াতে হয় বিনিয়োগ উদ্ধার বা লাভের আশায়। আবার পাঠক বা ক্রেতা পাওয়া গেলেও বিক্রির সঠিক হিসাব সবসময় লেখকের হাতে পৌঁছায় না। রয়্যালটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন বহুদিনের। ফলে একজন লেখক নিজের সৃষ্টির ন্যায্য মূল্য থেকেও অনেক সময় বঞ্চিত হন। পাঠকপ্রিয় ভালো বই হলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বইয়ের অবৈধ নকল বা পাইরেসির সমস্যা। একজন লেখক বছরের পর বছর পরিশ্রম করে একটি বই লিখলেন, আর কিছু অসাধু ব্যক্তি সেই বই অবৈধভাবে ছাপিয়ে বা ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে লাভ করল। এতে লেখক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি ক্ষতি সাহিত্য, প্রকাশনা শিল্প এবং পুরো জ্ঞানচর্চার পরিবেশের। একজন লেখকের শ্রমের প্রতি সম্মান দেখানো মানে কেবল তাঁকে সম্মান দেওয়া নয়, জ্ঞানকে সম্মান দেওয়া।
পারিবারিক জীবনেও একজন লেখককে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। যখন পরিবারের অন্য সদস্যরা আনন্দ-আয়োজনে ব্যস্ত থাকেন, তখন তিনি হয়তো একটি লেখা শেষ করার জন্য টেবিলে বসে আছেন। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছা থাকলেও কখনো সময়মতো লেখা জমা দেওয়ার দায় তাঁকে আটকে রাখে। পরিবারের অনেকেই তখন মনে করেন, লেখক ইচ্ছা করেই দূরে থাকছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালন করছেন।
একজন লেখকের মানসিক চাপও অনেক গভীর। তিনি শুধু নিজের কষ্ট নিয়ে ভাবেন না, সমাজের কষ্টও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কোথাও অন্যায় হলে, কোনো নিরীহ মানুষ অবিচারের শিকার হলে, কোনো শিশু নির্যাতিত হলে, কোনো শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে কিংবা কোনো দুর্নীতির খবর সামনে এলে একজন সংবেদনশীল লেখকের মন অস্থির হয়ে ওঠে। তিনি অন্যদের মতো সহজে সবকিছু ভুলে যেতে পারেন না। কারণ তাঁর ভেতরে প্রতিনিয়ত একটি প্রশ্ন কাজ করে ”আমি কি এ বিষয়ে লিখব না?”
এই দায়বোধই একজন লেখককে সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। কিন্তু এই সংবেদনশীলতাই অনেক সময় তাঁর মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়। মানুষের হাসির আড়ালে তিনি কান্না দেখতে পান, উৎসবের আলোয় তিনি অন্ধকার দেখতে পান, উন্নয়নের গল্পের ভেতরে তিনি বৈষম্যের চিহ্ন খুঁজে পান। তাই একজন লেখকের চোখে পৃথিবী কখনোই কেবল সাদা বা কালো নয়। লেখক সব সময় গভীরে লুকিয়ে থাকা সত্যকে খুঁজে বেড়ান।
সমাজে আরেকটি প্রবণতা হলো, অনেকেই লেখকের লেখা পড়েন, উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন, তাঁর ভাবনা থেকে উপকৃত হন; কিন্তু লেখকের নাম উল্লেখ করতে চান না। অনেক লেখা অনুমতি ছাড়া নকল করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখকের পরিচয় মুছে দিয়ে প্রচার করা হয়। এটি শুধু আইনি নয়, নৈতিক অপরাধও। একজন লেখকের পরিচয় তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই পরিচয় মুছে দেওয়া মানে তাঁর শ্রমকে অস্বীকার করা।
সব কষ্টের পরও প্রকৃত লেখক কলম থামান না। কারণ তিনি জানেন, শব্দের শক্তি বন্দুকের গুলির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। একটি সত্যনিষ্ঠ প্রবন্ধ, একটি শক্তিশালী কবিতা, একটি বিবেকবান বই বহু বছর পরেও মানুষের চিন্তাকে আলোড়িত করতে পারে। তাই তিনি ক্ষণিকের লাভের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেন।
হয়তো এই কারণেই ইতিহাসে অনেক লেখক দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও অমর হয়েছেন। তাঁরা অর্থে ধনী ছিলেন না, কিন্তু চিন্তায় ছিলেন অসীম সমৃদ্ধ। তাঁদের লেখা সময়কে অতিক্রম করেছে, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলো দেখিয়েছে। তাই একজন লেখকের প্রকৃত সম্পদ তাঁর ব্যাংক হিসাব নয়, তাঁর প্রকৃত সম্পদ তাঁর সৃষ্টি, তাঁর চিন্তা এবং পাঠকের হৃদয়ে গড়ে ওঠা স্থায়ী আসন।
কিন্তু একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব হলো, লেখককে শুধু মৃত্যুর পর সম্মান জানানো নয়, জীবিত অবস্থাতেই তাঁর শ্রমের যথাযথ মূল্য দেওয়া। কারণ যে সমাজ তার লেখককে সম্মান করে না, সেই সমাজ ধীরে ধীরে চিন্তাশক্তি হারায়। আর যে জাতি চিন্তার শক্তি হারায়, সে জাতি উন্নয়নের পথেও দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
তাই লেখকের কষ্ট বুঝতে হলে শুধু তাঁর লেখা পড়লেই হবে না, তাঁর অদৃশ্য সংগ্রাম, নীরব ত্যাগ, অপূর্ণ স্বপ্ন এবং সত্যের প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতাকেও বুঝতে হবে। তখনই উপলব্ধি করা যাবে, একজন লেখক আসলে শুধু বই লেখেন না, তিনি একটি জাতির বিবেককে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেন।
একজন লেখকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি শব্দের কারিগর নন, তিনি বিবেকের প্রহরী। সমাজ যখন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে, যখন ক্ষমতার ভয় সত্যকে স্তব্ধ করে দিতে চায়, যখন মিথ্যা সত্যের পোশাক পরে মানুষের সামনে দাঁড়ায়, তখন একজন প্রকৃত লেখকই কলম হাতে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস করেন। এই সাহসের মূল্য অনেক সময় তাঁকে একাকীত্ব দিয়ে দিতে হয়, কখনো অপমান, কখনো হুমকি, কখনো অবহেলা, আবার কখনো জীবনের নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। কিন্তু তবুও তিনি লেখেন। কারণ তিনি জানেন, সত্যকে চিরদিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না।
একজন লেখক কখনো শুধু নিজের সময়ের জন্য লেখেন না। তিনি লেখেন ভবিষ্যতের জন্য। আজ যে শিশুটি একটি গল্পের বই পড়ছে, সেই শিশুই হয়তো আগামী দিনের লেখক, বিজ্ঞানী, বিচারক, শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হবে। একজন লেখকের লেখা তার চিন্তাকে প্রভাবিত করবে, তার বিবেককে জাগিয়ে তুলবে, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি তৈরি করবে। তাই একজন লেখকের দায়িত্ব শুধু একটি বই লেখা নয়, তিনি অজান্তেই একটি প্রজন্মের চিন্তার ভিত নির্মাণ করেন।
কিন্তু এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লেখককে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় মানুষের উদাসীনতা। অনেকেই বই কিনতে আগ্রহী নন, কিন্তু মোবাইল ফোন বা বিনোদনের জন্য হাজার থেকে লাখ টাকা ব্যয় করতে দ্বিধা করেন না। বইকে ব্যয় মনে করা হয়, অথচ বই আসলে একটি বিনিয়োগ। জ্ঞান, মূল্যবোধ ও সভ্যতার বিনিয়োগ। যে সমাজে বইয়ের কদর কমে যায়, সেখানে চিন্তার পরিধিও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে।
লেখকের আরেকটি যন্ত্রণা হলো সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্য, নতুন নতুন ঘটনা, নতুন নতুন প্রযুক্তি পৃথিবীকে বদলে দিচ্ছে। একজন লেখক যদি নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ না করেন, যদি পড়াশোনা বন্ধ করে দেন, যদি নতুন বাস্তবতাকে বুঝতে না চান, তাহলে তাঁর লেখাও সময়ের কাছে গুরুত্ব হারাবে। তাই একজন প্রকৃত লেখক আজীবন ছাত্র। তিনি বয়সে প্রবীণ হতে পারেন, কিন্তু শেখার ক্ষেত্রে কখনো অবসর নেন না।
বাস্তবতার আরেকটি নির্মম দিক হলো, অনেক সময় একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সমালোচক তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষও হতে পারেন। পরিবার, বন্ধু কিংবা পরিচিত কেউ কেউ মনে করেন, লেখালেখি করে কি হবে? এতে কি সংসার চলে? এতে কি ভবিষ্যৎ গড়ে? এই প্রশ্নগুলো একজন লেখকের হৃদয়ে গভীর আঘাত করে। কারণ তিনি জানেন, পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতার পেছনে যেমন যোদ্ধাদের অবদান আছে, তেমনি লেখকদেরও অবদান আছে। অস্ত্র একটি ভূখণ্ড জয় করতে পারে, কিন্তু একটি বই মানুষের হৃদয় জয় করার মাধ্যমে পৃথিবী জয় করে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহু মহান লেখক জীবদ্দশায় দারিদ্র্য, অবহেলা এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আর্থিক নিরাপত্তা পাননি। কিন্তু তাঁদের লেখা শত বছর পরও মানুষকে আলো দেখাচ্ছে। অর্থ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু একটি সত্যনিষ্ঠ লেখা যুগের পর যুগ মানুষের বিবেককে জাগিয়ে রাখে।
একজন লেখক যখন একটি বাক্য লেখেন, তখন তিনি শুধু ভাষা ব্যবহার করেন না; তিনি নিজের অভিজ্ঞতা, ব্যথা, ভালোবাসা, ক্ষোভ, আশা এবং বিশ্বাসকে শব্দে রূপ দেন। তাই তাঁর লেখা সমালোচনা করা যায়, মতের বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু তাঁর শ্রমকে অবহেলা করা যায় না। কারণ একটি ভালো লেখা সৃষ্টি করা মানে নিজের জীবনের একটি অংশ পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া।
আজ আমাদের সমাজে লেখকের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু পাঠকের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এটি শুধু লেখকের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক সংকট। যে জাতি পড়ে না, সে জাতি গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখে না। আর যে জাতি চিন্তা করতে শেখে না, সে জাতি কখনো অন্ধকারকে জয় করতে পারে না।
আবার বর্তমানে যে হারে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার বেড়েছে তা উদ্বেগজনক। ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটক, মেসেঞ্জারে চ্যাটিং ও বিভিন্ন ধরণের ভিডিও গেইমে আসক্ত হয়ে বাস্তবতা ভুলে যাচ্ছে। ফলে সহজেই গুজব, বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের বেড়ে যাচ্ছে মারাত্মকভাবে। তাই প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে লেখককে বাঁচাতে এবং ভালো মানের লেখক তৈরি করতে হবে। আর এর জন্য পাঠাভ্যাস টিকিয়ে রাখতে হবে। পরিবারে, বিদ্যালয়ে, গ্রন্থাগারে এবং সমাজে বই পড়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
একজন লেখকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার শুধু টাকা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার তখনই, যখন কোনো পাঠক এসে বলেন ”আপনার লেখা পড়ে আমি নতুন করে ভাবতে শিখেছি”, “আপনার একটি প্রবন্ধ আমার জীবনের সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে”, “আপনার একটি কবিতা আমাকে হতাশা থেকে ফিরে আসতে সাহায্য করেছে।” এই কয়েকটি বাক্যই একজন লেখকের বহু বছরের কষ্টকে সার্থক করে তোলে।
তবুও আমাদের সমাজের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। লেখকের ন্যায্য সম্মানী নিশ্চিত করা, তাঁর মেধাস্বত্ব রক্ষা করা, বইয়ের পাইরেসি বন্ধ করা, গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ করা, নতুন লেখকদের উৎসাহ দেওয়া এবং সাহিত্যচর্চার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব। কারণ লেখককে বাঁচানো মানে শুধু একজন মানুষকে বাঁচানো নয়; একটি জাতির চিন্তাশক্তিকে বাঁচিয়ে রাখা।
লেখকের জীবন কখনো ফুলের বিছানা নয়, কাঁটায় ভরা একটি দীর্ঘ পথ। এই পথে আছে অনিশ্চয়তা, অবহেলা, আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ, প্রত্যাখ্যান, একাকীত্ব এবং অসংখ্য অদেখা ত্যাগ। কিন্তু এসবের মধ্যেও যিনি থেমে যান না তিনিই লেখক। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, একটি সৎ বাক্য, একটি সত্যনিষ্ঠ প্রবন্ধ, একটি মানবিক কবিতা কিংবা একটি যুগান্তকারী বই পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তাই একজন লেখকের কষ্টকে শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর কষ্টের ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি জাতির ভবিষ্যৎ, একটি সমাজের বিবেক এবং একটি সভ্যতার অগ্রযাত্রার স্বপ্ন। যে সমাজ তার লেখককে ভালোবাসে, সে সমাজ নিজেকেই ভালোবাসে। আর যে সমাজ তার লেখককে অবহেলা করে, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বিবেককে হারিয়ে ফেলে।
এই কারণেই লেখকের সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না। তিনি হয়তো জীবদ্দশায় সব স্বীকৃতি পান না, কিন্তু তাঁর লেখা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু সত্যের পক্ষে লেখা শব্দগুলো থেকে যায়, আলোর মতো, বিবেকের মতো, ইতিহাসের মতো। তাই সমাজ, দেশ, জাতি তথা পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্যই লেখকবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। লেখকের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে নতুন করে ভালো লেখক তৈরি হবে না। পাঠক হতে হবে সবাইকে। তাই এখনি সিদ্ধান্ত হোক বই পড়ার অঙ্গীকার। যে সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ গতিপথ।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
এমএসএম / এমএসএম
কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?
লেখকের কষ্ট
বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান
বানিজ্য সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা
অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ
পর্যটন: সেকাল, একাল এবং ভবিষৎকাল
শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র: মানবপ্রেম, আত্মজাগরণ ও সুন্দর সমাজের স্বপ্ন
সরকারি হাজীদের অব্যয়িত অর্থ ফেরত: স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি মাধ্যমে নিরাপদ হজ
মিরকাদিমের ধবল গরু: ভবিষ্যতের জিনগত সম্পদ
শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে এ্যাক্রেডিটেশনের ভূমিকা