ঢাকা রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ৩-১০-২০২৬ রাত ১০:৫৭

মাদকাসক্ত, সহিংস এবং সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং এখন আর রাজধানীর কয়েকটি মহল্লার বিচ্ছিন্ন অপরাধচিত্র নয়। ধীরে ধীরে এটি আমাদের লিভিং স্পেসের এক ভয়ংকর বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। যে যুব-কিশোরদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে উড়াল দেওয়ার স্বপ্ন দেখে, সেই প্রজন্মেরই একটি অংশ যদি স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, মাদকে আসক্ত হয়, মাদক বিক্রি করে, চাঁদাবাজি-দখলবাজির বাহিনীতে পরিণত হয় এবং সংঘবদ্ধ অপরাধকে জীবিকার সহজ পথ হিসেবে দেখতে শেখে, তাহলে সমস্যাটি আর শুধু আইনশৃঙ্খলার থাকে না। এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে হামলা, ভাঙচুর, দখলচেষ্টা, চাঁদাবাজি এবং গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার যেসব ঘটনা ও অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলো উদ্বেগজনক। তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হওয়া—টাকা, স্থানীয় প্রভাব এবং সংঘবদ্ধ কিছু তরুণকে ব্যবহার করতে পারলে জমি-ফ্ল্যাট দখল করা যায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করা যায়, কাউকে এলাকা ছাড়া করা যায় কিংবা প্রতিপক্ষকে ‘শিক্ষা’ দেওয়া যায়।

কোনো সমাজের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক সংকেত খুব বেশি নেই। কারণ অপরাধের চেয়েও ভয়ংকর হচ্ছে অপরাধীর মনে দায়মুক্তির বিশ্বাস জন্মানো।

যদি কোনো কিশোর মনে করে তার পেছনে একজন ‘বড় ভাই’ আছেন, যদি সেই বড় ভাই মনে করেন রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব তাকে রক্ষা করবে, আর সাধারণ নাগরিক যদি মনে করেন থানায় গিয়ে লাভ নেই—তাহলে আইনের শাসনের জায়গাটি কোথায় দাঁড়ায়?

এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। অভিযান প্রয়োজন। অপরাধীকে গ্রেপ্তারও করতে হবে। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা সমস্যাটির শেষ প্রান্তে বেশি মনোযোগ দিচ্ছি, শুরুর জায়গাটিতে নয়। একজন কিশোর অপরাধী হওয়ার পর তাকে ধরছি। কিন্তু সে অপরাধী হওয়ার আগের পাঁচ বছর আমরা কোথায় ছিলাম?

সে যখন স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়ছিল, তখন কে তার খোঁজ নিয়েছে? সে যখন পড়াশোনা ছেড়ে দিল, তখন রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান কি তার দরজায় গিয়েছিল? যখন প্রথম মাদক গ্রহণ করল, পরিবার ছাড়া আর কে বিষয়টি জানল? যখন এলাকার অপরাধী চক্র তাকে অল্প সময়ে টাকা আয়ের পথ দেখাল, তখন তার সামনে রাষ্ট্র কী বিকল্প রেখেছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ালে সমস্যার সাময়িক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হতে পারে, স্থায়ী সমাধান নয়।

কিশোর অপরাধ ও কারাব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলতে গিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের অভিজ্ঞতা শুনে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে—একই তরুণের অপরাধ, গ্রেপ্তার, মুক্তি এবং আবার অপরাধে ফিরে যাওয়ার একটি চক্র তৈরি হচ্ছে। সংশোধন ও পুনর্বাসনের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধজগতের পুরোনো যোগাযোগ অক্ষুণ্ন থেকে যায়, কখনো নতুন যোগাযোগও তৈরি হয়। পরিবারও অনেক সময় অসহায়। মাদকাসক্তি, শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা এবং অপরাধী নেটওয়ার্ক—এই তিনটির মধ্যে আটকে যাওয়া একজন কিশোরকে কয়েক মাস আটকে রেখে আবার একই পরিবেশে ফিরিয়ে দিলে তার জীবন বদলানোর সম্ভাবনা কতটুকু?

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত, কারাগারে কতজন গেল—তা নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, ফিরে এসে কতজন আর অপরাধে গেল না।

এই জায়গাটিতেই বাংলাদেশের জনমিতিক বাস্তবতার সঙ্গে কিশোর অপরাধের সম্পর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০১৭ সালের ১০ মে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘ভিশন ২০৩০’ উপস্থাপন করেছিলেন। সেই দলিলে বাংলাদেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কথা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষ মোট জনসংখ্যার ৬৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে এমন একটি জনমিতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা একটি জাতির জীবনে বারবার আসে না।

অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় demographic dividend—জনমিতিক লভ্যাংশ।

কিন্তু demographic dividend কোনো স্বয়ংক্রিয় পুরস্কার নয়। একটি দেশে কোটি কোটি তরুণ থাকলেই সেই দেশ উন্নত হয়ে যায় না। তরুণদের শিক্ষা দিতে হয়, দক্ষ করতে হয়, সুস্থ রাখতে হয়, নৈতিক ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল করে তুলতে হয় এবং সর্বোপরি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া তার জনমিতিক সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে। পৃথিবীতে আবার এমন দেশও আছে, যারা বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতির কারণে প্রত্যাশিত সুফল পায়নি।

বাংলাদেশ কোন পথে যাবে?
এই প্রশ্ন আজ আরও জরুরি।

২০২৩ সালের ১৩ জুলাই উপস্থাপিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফাতেও যুবসমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক যুব উন্নয়ন নীতি এবং demographic dividend কাজে লাগানোর কথা এসেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের অঙ্গীকারও সেখানে রয়েছে।

এখন সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সময়।

কারণ শিক্ষাব্যবস্থার কয়েকটি সাম্প্রতিক সংখ্যা আমাদের স্বস্তি দেয় না। ২০২৬ সালের SSC ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে; অকৃতকার্য হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার। HSC পর্যায়েও বিপুলসংখ্যক নিয়মিত শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার মূল প্রবাহে থাকেনি।

এখানে একটি কথা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন। পরীক্ষায় ফেল করা কোনো তরুণ অপরাধী নয়। স্কুল থেকে ঝরে পড়া কোনো কিশোরও অপরাধী নয়। পরীক্ষায় ভালো ফল করাই মানুষের মূল্য নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।

বরং রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা শুরু হয় একজন তরুণ পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর।

তার জন্য দ্বিতীয় দরজাটি কোথায়?

যে ছেলেটি গণিত বা ইংরেজিতে পাস করতে পারেনি, সে হয়তো অসাধারণ ওয়েল্ডার হতে পারে। কেউ দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান হতে পারে, কেউ গাড়ির মেকানিক, কেউ refrigeration technician, কেউ heavy-equipment operator, কেউ programmer, কেউ কৃষি উদ্যোক্তা, কেউ logistics professional। কিন্তু আমরা কি তাকে সেই পথ দেখাচ্ছি?

নাকি একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর সমাজ তাকে ‘ফেল করা ছেলে’ হিসেবে চিহ্নিত করে ছেড়ে দিচ্ছে?

এই সামাজিক প্রত্যাখ্যানের জায়গাটিতেই অপরাধী অর্থনীতি সুযোগ নেয়।

মাদক বিক্রি করলে দ্রুত নগদ টাকা পাওয়া যায়। চাঁদাবাজির দলে থাকলে এলাকায় পরিচিতি তৈরি হয়। একজন ‘বড় ভাই’ মোটরসাইকেল দেয়, খাওয়ায়, প্রয়োজনে মামলা দেখার আশ্বাস দেয়। যে কিশোর পরিবার, স্কুল ও সমাজে গুরুত্ব পাচ্ছে না, অপরাধী গ্যাং তাকে একটি পরিচয় দেয়।

এটাই বিপদ।

তাই কিশোর গ্যাং দমনের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একজন ১৫ বা ১৬ বছরের কিশোর সাধারণত নিজে একটি বড় অপরাধী অর্থনীতি তৈরি করে না। তাকে কেউ ব্যবহার করে। কেউ মাদক দেয়, কেউ অর্থ দেয়, কেউ নির্দেশ দেয়, কেউ চাঁদার ভাগ নেয় এবং কেউ প্রভাব বিস্তার করে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।

তাহলে শুধু কিশোরকে ধরলে হবে কেন?
তার পেছনের ‘বড় ভাই’ কোথায়?
মাদক সরবরাহকারী কোথায়?
অর্থদাতা কোথায়?
অপরাধের লাভের টাকা কোথায় যাচ্ছে?

প্রতিটি বড় কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রে law-enforcement investigation-এর পাশাপাশি financial investigation এবং command-chain investigation হওয়া প্রয়োজন। একজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করে ছবি প্রকাশ করা সহজ। কিন্তু যে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তাকে অপরাধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, তাকে আইনের আওতায় আনাই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য।

এখানে দলীয় পরিচয়েরও কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করুক, বিরোধী দলের পরিচয় ব্যবহার করুক কিংবা নিজেকে স্থানীয় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দিক—অপরাধীর পরিচয় হওয়া উচিত একটাই: অপরাধী।

আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বিরোধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ নয়; নিজের ঘরের অপরাধীর বিরুদ্ধেও একই আইন প্রয়োগ করতে পারা।

বর্তমান সরকারের সামনে তাই একটি বড় সুযোগ রয়েছে। কিশোর গ্যাং সমস্যাকে শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযান হিসেবে না দেখে একটি জাতীয় মানবসম্পদ সংকট হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সমন্বয়ে শিক্ষা, স্বরাষ্ট্র, যুব ও ক্রীড়া, সমাজকল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থান, স্থানীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে একটি সমন্বিত Youth Rescue, Rehabilitation, Skills and Employment Mission বিবেচনা করা যেতে পারে।

দেশে কোথায় কত শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে, কারা দীর্ঘদিন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছে, কারা বারবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে—আইনসম্মত গোপনীয়তা রক্ষা করে তাদের শনাক্ত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন।

প্রতিটি জেলা ও বড় মহানগরে Second Chance Education and Skills Programme থাকতে পারে। সেখানে ছয় মাস বা এক বছরের বাজারমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে—electrical work, welding, plumbing, automobile maintenance, refrigeration, construction trades, logistics, agriculture technology, driving, coding এবং digital services-এর মতো বিষয়ে।

একজন মাদকাসক্ত কিশোরের জন্যও শুধু শাস্তি যথেষ্ট নয়। চিকিৎসা, counselling, পরিবারভিত্তিক intervention, শিক্ষা এবং vocational rehabilitation একই ব্যবস্থার অংশ হতে হবে।

আর কারাগার বা সংশোধনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পরই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না। পুনর্বাসিত তরুণটি পড়াশোনায় ফিরল কি না, প্রশিক্ষণ নিল কি না, চাকরি পেল কি না, আবার পুরোনো গ্যাংয়ের কাছে ফিরে গেল কি না—তার একটি কার্যকর follow-up ব্যবস্থা প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতকেও এখানে এগিয়ে আসতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণ কোম্পানি, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও সেবা খাতে প্রশিক্ষিত ঝুঁকিপূর্ণ তরুণদের apprenticeship ও চাকরির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। রাষ্ট্র চাইলে এর জন্য প্রণোদনাও বিবেচনা করতে পারে।

তবে শুধু কর্মসংস্থান দিয়ে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না। পরিবার, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক বন্ধনও গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, পরিবার, ক্রীড়া সংগঠন ও স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে এই পুনর্গঠনের অংশ করতে হবে।

একটি কিশোর যখন প্রথম স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে, তখনই আমাদের কাছে সেটি একটি signal হওয়া উচিত। যখন সে মাদক নিতে শুরু করে, তখন intervention দরকার। যখন সে গ্যাংয়ের সঙ্গে চলতে শুরু করেছে, তখন পুলিশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।

রাষ্ট্রের সাফল্য তাই শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো সেই সংখ্যায় মাপা উচিত নয়।

আমি বরং দেখতে চাই সরকার প্রতিবছর ঘোষণা করছে—কতজন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে; কতজন মাদকাসক্ত তরুণ চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে; কতজন কিশোর অপরাধী vocational training সম্পন্ন করেছে; কতজন চাকরি পেয়েছে বা উদ্যোক্তা হয়েছে; এবং পুনর্বাসনের পর কতজন আর অপরাধে ফিরে যায়নি।

এই সংখ্যাগুলোই হবে প্রকৃত সাফল্যের পরিমাপক।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি ভবিষ্যৎ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, দক্ষ কর্মী, কৃষি উদ্যোক্তা এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের প্রতিভাবান তরুণ।

অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন, কর্মহীন, হতাশ, মাদকাসক্ত এবং অপরাধী নেটওয়ার্কের দিকে এগিয়ে যাওয়া আরেক দল তরুণ।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দ্বিতীয় দলটিকে প্রথম বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা।

আজকের ১৫ বছরের কিশোরটি ১০ বছর পর ২৫ বছরের যুবক হবে। তখন সে একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান হবে, উদ্যোক্তা হবে, প্রবাসী দক্ষ কর্মী হবে, করদাতা হবে—নাকি মাদক ব্যবসায়ী, গ্যাং লিডার অথবা কারাগারের বন্দি হবে—এই পরিণতি শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রও এর অংশীদার।

এ কারণেই বর্তমান সরকারের সামনে বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার challenge নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

ভিশন ২০৩০ এবং রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফায় যে মানবসম্পদভিত্তিক বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে, সেটিকে বাস্তবে দেখানোর একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে এই তরুণ জনগোষ্ঠী।

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একটি নীতি পরিষ্কার হওয়া দরকার—কোনো রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া কিশোর গ্যাংকে রক্ষা করবে না; কোনো মাদক ব্যবসায়ী ‘বড় ভাই’ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না; কোনো অসাধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য অপরাধী চক্রকে সহায়তা করে দায়মুক্তি পাবে না। একই সঙ্গে কোনো বিপথগামী কিশোরকেও রাষ্ট্র চিরদিনের জন্য অপরাধী হিসেবে পরিত্যাগ করবে না।

অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতা এবং মানুষের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ—দুটিই একসঙ্গে থাকতে হবে।

আমাদের সামনে সময়ও অসীম নয়। জনমিতিক সুযোগের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। আজ যে বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা, যথাযথ শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান ছাড়া আগামী দিনে তার একটি অংশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপেও পরিণত হতে পারে।

তাই এখনই সিদ্ধান্তের সময়।

আমরা কি শুধু নতুন কারাগার বানাব, নাকি নতুন দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও বানাব?

আমরা কি শুধু গ্যাং সদস্যের তালিকা করব, নাকি স্কুল থেকে হারিয়ে যাওয়া কিশোরটিরও খোঁজ রাখব?

আমরা কি শুধু মাদক বহনকারী কিশোরকে ধরব, নাকি মাদকের অর্থ, সরবরাহকারী এবং আশ্রয়দাতার পথ অনুসরণ করে পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙব?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি একজন ব্যর্থ, ঝরে পড়া বা বিপথগামী কিশোরকে আবার স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেব?

একটি জাতির ইতিহাসে demographic dividend-এর সুযোগ বারবার আসে না।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার অবকাঠামো, বন্দর, জ্বালানি সম্পদ বা বৈদেশিক বিনিয়োগ নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। আর সেই মানুষের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অংশ তার তরুণ প্রজন্ম।

তাদের একটি অংশকে যদি মাদক, অপরাধ, বেকারত্ব এবং শিক্ষাবিচ্ছিন্নতার অন্ধকারে হারিয়ে ফেলি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কাছে এর হিসাব চাইবে।

আর যদি তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি—স্কুলে, প্রশিক্ষণে, কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে—তাহলে সেটি শুধু কয়েক লাখ তরুণের জীবন বদলাবে না; বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও।

গ্রেপ্তারের সংখ্যায় নয়, ফিরে আসা তরুণের সংখ্যায় রাষ্ট্রের সাফল্য মাপা হোক।

কারণ একটি কিশোরকে অপরাধী হিসেবে কারাগারে পাঠানো রাষ্ট্রের শেষ কাজ হতে পারে না।

রাষ্ট্রের বড় সাফল্য হবে—তাকে এমনভাবে ফিরিয়ে আনা, যেন তাকে আর কোনোদিন সেখানে ফিরে যেতে না হয়।

লেখক:
মোহাম্মদ আনোয়ার
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট।

এমএসএম / এমএসএম

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান

বানিজ্য সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা

অগ্নিঝরা প্রীতিলতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম বাঙালি নারী শহীদ

পর্যটন: সেকাল, একাল এবং ভবিষৎকাল

শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র: মানবপ্রেম, আত্মজাগরণ ও সুন্দর সমাজের স্বপ্ন

সরকারি হাজীদের অব্যয়িত অর্থ ফেরত: স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি মাধ্যমে নিরাপদ হজ

মিরকাদিমের ধবল গরু: ভবিষ্যতের জিনগত সম্পদ

শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন