ডিজিটাল টিকিটিংয়ে ভাড়ায় স্বচ্ছতা, বাড়বে সরকারি রাজস্ব
কাগজের টিকিটের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, তথ্যনির্ভর ও যাত্রীবান্ধব করতে ডিজিটাল টিকিটিং চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নীতিনির্ধারক ও খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ডিজিটাল টিকিটিংয়ের মাধ্যমে ভাড়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রী চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে রুট পরিকল্পনা, পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান উন্নয়ন করা সম্ভব।
তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু প্রযুক্তি চালু করাই যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন পরিবহন ও পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য লেনদেন, সব পক্ষের সুবিধাজনক নীতি প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) নীতিসংলাপ প্ল্যাটফর্ম বেঞ্চমার্ক ডায়ালগ আয়োজিত ‘ডিজিটাল টিকিটিং টু ট্রান্সফর্ম লাইভস’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সহজের সহযোগিতায় আয়োজিত এ আলোচনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক, প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবাখাত, যাত্রীকল্যাণ সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন বেঞ্চমার্ক ডায়ালগের চেয়ারম্যান আশরাফ কায়সার।
আলোচনায় ডিজিটাল টিকিটিং নিয়ে স্বাগত বক্তব্য দেন সহজডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কর্নেল (অব.) আমিনুল হক। ডিজিটাল টিকিটিংয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেন সহজডটকমের পরিচালক (টিকিট) শাকিল জোয়াদ রহিম।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত এখনো উন্নত বিশ্বের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। অন্যরা বাংলাদেশকে নিয়ে পরিকল্পনা করলেও দেশের ভেতর থেকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা ও উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিমানকে এ ক্ষেত্রে আরও আগে এগিয়ে আসার সুযোগ ছিল।
তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এগিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি বা ওটিএ নিয়েও বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে। অথচ ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থার ফলে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার পরিবর্তে আরও সহজ ও আধুনিক সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ফ্যান্টাসি আইল্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর (অব.) মাকসুদুর রহমান আদনান বলেন, দেশে চার শতাধিক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক রয়েছে এবং এ খাতের বার্ষিক বাজার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। বছরে প্রায় ১০ লাখ মানুষ এসব সেবা গ্রহণ করেন। এখন মানুষ ঘরে বসেই পার্কের টিকিট কাটছেন।
তিনি বলেন, এ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করতে ইউনিফায়েড বাই ইউনি-কার্ড ধরনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে সহজের মতো প্ল্যাটফর্মও যুক্ত হতে পারে। এতে বিভিন্ন সেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
শ্যামলী পরিবহনের পরিচালক রজত ঘোষ বলেন, পরিবহন খাতের প্রকৃতিই হচ্ছে এটি সবসময় চলমান। ফলে দীর্ঘদিন ধরে খাতটি অনেকটাই এলোমেলোভাবে পরিচালিত হয়েছে। সেই জায়গা থেকে টিকিটিং ব্যবস্থাকে শতভাগ ডিজিটালাইজেশনে এনে একটি শৃঙ্খলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবের সময়ে অনলাইনে টিকিটের চাহিদা বাড়লেও স্বাভাবিক সময়ে অনেক যাত্রী এখনো কাউন্টারে গিয়ে টিকিট কাটেন। যত্রতত্র কাউন্টার না রেখে টার্মিনালভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে টিকিটিংও শতভাগ ডিজিটালাইজ করা যাবে।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ও উদ্যোক্তা ফজলুল হক বলেন, অনলাইন টিকিটিং বা ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাওয়ার ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সরকার এ বিষয়ে সক্রিয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও এর সঙ্গে রয়েছে। এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে পুরো ব্যবস্থাকে অনলাইনভিত্তিক করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যবহারকারীদের আচরণ, বিশেষ করে টিকিট নিয়ে দর-কষাকষির প্রবণতা একটি চ্যালেঞ্জ। কাউন্টারে দর-কষাকষির সুযোগ থাকায় অনেকেই অনলাইনে যেতে আগ্রহী হন না, যা একধরনের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি করে। এসব বিষয়কে একটি শৃঙ্খলায় আনার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি শুধু রেগুলেশনের নয়, ক্যাশ মুভমেন্ট ও লেনদেন ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিআরটিসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) শুকদেব ঢালী বলেন, বিআরটিসির কার্যক্রম, বিশেষ করে টিকিটিং সিস্টেমকে ডিজিটালাইজ করার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। পিংক বাসে এরই মধ্যে পুরোপুরি অনলাইন টিকিটিং চালু হয়েছে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল টিকিটিংয়ের মাধ্যমে একজন যাত্রী যখন নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করেন, তখন তার কাছে অর্থটি যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা তৈরি হয়। এর ফলে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব। সাধারণ মানুষের হাতে এখন স্মার্টফোন রয়েছে। ফলে অনলাইনে যাওয়ার বাস্তব প্রয়োজন ও সুযোগ দুটিই তৈরি হয়েছে।
বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, বাংলাদেশ ডিজিটালাইজেশনে পুরোপুরি পিছিয়ে নেই; বরং বড় ঘাটতি রয়েছে একটি কার্যকর ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে। শুধু ডেটা সংগ্রহ করলেই হবে না, সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে ব্যবহার করতে হবে।
তিনি বলেন, কোন রুটে কখন বেশি চাপ তৈরি হচ্ছে, কোন সময়ে যাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা সম্ভব। বাস অপারেটরদের জন্যও এ ধরনের ডেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারকেও ডেটা ব্যবহার করে পরিবহন পরিকল্পনা করতে হবে। যেসব রুটে বেশি চাপ, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পরিবহন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা যেতে পারে। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে যাত্রী নিরাপত্তা ও সেফটি ব্যবস্থাপনাকেও আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, ই-কমার্স খাতে অতীতে স্ক্যামের ঘটনা ডিজিটাল ব্যবস্থায় জবাবদিহির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। তাই টিকিটিংসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলো যতটা সম্ভব স্বয়ংক্রিয় করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ডিজিটাল ও অ্যানালগ—দুই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন পাশাপাশি চলতে থাকলে মানুষ ডিজিটাল ব্যবস্থায় পুরোপুরি আসতে আগ্রহী হবেন না। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনোভাবেই তা যেন বেহাত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি কমানো ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ডিজিটালাইজেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় ভোক্তার স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিভিন্ন দেশে গেলে বোঝা যায়, ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে মানুষের যাতায়াত কতটা সহজ ও ঝামেলামুক্ত হতে পারে। দেশে ট্যাক্স দেওয়া, ব্যাংকিং এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা যখন অনলাইনে যাচ্ছে, তখন পরিবহন খাতকেও আরও সংগঠিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে ইনক্লুসিভিটি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সবাই এ সেবা ব্যবহার করতে পারে। যাত্রীদের জন্য প্রক্রিয়াটি হ্যাসেল-ফ্রি করতে হবে এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রাইসিং ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে এবং মানুষের ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি শরীফ রফিকুজ্জামান, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন শাখার সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. নবীর উদ্দিন, সেনাকল্যাণ ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের বিজনেস ডিভিশন ৭-এর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ খালেদ কামাল প্রমুখ।
aliul / aliul
জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বিপিসি
ডিজিটাল টিকিটিংয়ে ভাড়ায় স্বচ্ছতা, বাড়বে সরকারি রাজস্ব
ইতালির বিনিয়োগ আকর্ষণে চামড়া খাতে সহযোগিতা বাড়াতে আলোচনা
পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়কে সৌরবিদ্যুৎ, বছরে সাশ্রয় ৪৮ লাখ টাকা
মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ল ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা
দিলকুশায় গ্রাহক ফোরাম, শাপলা চত্বর ঘুরে প্রেস ক্লাবে চাকরিচ্যুতরা
ইউএফএস-প্রগতি লাইফ ইউনিট ফান্ডের অবসায়ন প্রস্তাব অনুমোদন
খেলাপি ঋণ ৯ মাসে কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ
সর্বজনীন পেনশনে আসছে বড় পরিবর্তন, মিলবে ঋণ-স্বাস্থ্যবিমা
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমায় দেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ করল মুডিস
শেয়ারবাজারে অর্থপাচার ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারি
এক সপ্তাহে ইলিশের দাম কমল কেজিতে ৮০০ টাকা