ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঋণখেলাপি ইউনিটেক্সের কারখানা চালুর পরই কাঁচামাল সংকটে বন্ধ


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭-৯-২০২৬ দুপুর ৪:২৬

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ইউনিটেক্স গ্রুপের বড় অঙ্কের ঋণ ও আর্থিক সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডে। প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ টন বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে কারখানাটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে গেলেও কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারায় ধীরে ধীরে উৎপাদন কমে আসে। একপর্যায়ে কাঁচামালের সংকটে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এতে পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।

আনোয়ারা উপজেলার চাতুরী-চৌমুহনী এলাকায় অবস্থিত এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেড ইউনিটেক্স গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এখানে পলিয়েস্টার ফুললি ড্রন ইয়ার্ন (এফডিওয়াই), ড্রন টেক্সচারড ইয়ার্ন (ডিটিওয়াই), ডোপ ডায়েড, মেলাঞ্জ, থিক-থিন, স্প্যানডেক্সযুক্ত এয়ার কাভার্ড সুতা ও টু-টোনসহ বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক সুতা উৎপাদনের কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ২০২২-২৩ সালের তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি ৭৫ লাখ কেজি বা প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ টন উল্লেখ করা হয়েছে। আর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) নথিতে প্রতিষ্ঠানটিতে ৪৮০ জন শ্রমিকের তথ্য রয়েছে।

কারখানা সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করে। শুরুতে প্রতিদিন প্রায় ৬০ টন সুতা উৎপাদন করা হলেও পরবর্তী সময়ে কাঁচামাল সংকটের কারণে উৎপাদন কমতে থাকে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের দিকে দৈনিক উৎপাদন নেমে আসে ১৮ থেকে ২০ টনে।

সূত্রের দাবি, কারখানাটিতে প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার মেট্রিক টন কাঁচামাল প্রয়োজন। সে হিসাবে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন কাঁচামালের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ওই সময়ে মাত্র প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন কাঁচামালের জন্য এলসি পাওয়া যায়। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি।

কারখানা সূত্র আরও জানায়, উৎপাদনের কাঁচামাল চীন ও জার্মানি থেকে আমদানি করা হতো। কারখানার মেশিনপত্রও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর প্রতিষ্ঠানটি অর্থসংকটে পড়ে। রূপালী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে প্রত্যাশিত অর্থায়ন না পাওয়ায় কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এলসি খোলা সম্ভব হয়নি বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

এর মধ্যে ধাপে ধাপে কর্মী ছাঁটাইও শুরু হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, ছাঁটাই করা শ্রমিকদের শ্রম আইন অনুযায়ী শেষ মাসের বেতন ও প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলসের উৎপাদন বন্ধের পেছনে ইউনিটেক্স গ্রুপের সামগ্রিক আর্থিক সংকটও সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউনিটেক্স গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে রূপালী ব্যাংক থেকে ৩২৬ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪৭ কোটি এবং এক্সিম ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা ঋণের তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।

ইসলামী ব্যাংকের ঋণের মধ্যে ইউনিটেক্স স্টিলের নামে ৮১৪ কোটি টাকা এবং ইউনিটেক্স এলপিজির নামে ২ হাজার ২৩ কোটি টাকা নেওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে এসেছে। এ ছাড়া ইউনিটেক্স কম্পোজিট স্পিনিংয়ের নামে ৬০৭ কোটি এবং ইউনিটেক্স গ্র্যান্ড স্পিনিংয়ের নামে ২৯৩ কোটি টাকা ঋণের তথ্য রয়েছে।

ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব ঋণের বিপরীতে থাকা জামানতের মূল্য এবং কয়েকটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও ইউনিটেক্সের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়ে অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনিটেক্স-সংশ্লিষ্ট ইসলামী ব্যাংকের ঋণের বড় একটি অংশ বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ঋণ আদায়ে বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগও নিয়েছে ব্যাংকটি।

তবে ইউনিটেক্সের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলমান প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর প্রভাব পুরো গ্রুপের ওপর পড়তে পারে।

শিল্প খাতে বড় বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও আর্থিক সংকটে এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলসের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানে এর প্রভাব পড়েছে। ডিআইএফইর হিসাবে কারখানাটিতে ৪৮০ শ্রমিকের তথ্য রয়েছে। তবে কারখানা সূত্রের দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক মিলিয়ে সেখানে পাঁচ শতাধিক মানুষ কর্মরত ছিলেন।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সদস্য তালিকাতেও এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডের নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এটি ইউনিটেক্স গ্রুপের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

ফলে প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ টন বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতার একটি আধুনিক সিনথেটিক সুতা কারখানা চালুর পরপরই কাঁচামাল ও অর্থসংকটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ইউনিটেক্স গ্রুপের চলমান আর্থিক সংকটের বিষয়টি সামনে এসেছে।

কারখানাটির তৎকালীন এইচআর ও প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, অর্থ ও কাঁচামাল সংকটে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। কাঁচামাল সংকটের কারণে আর উৎপাদনে যেতে পারেনি। আমিও এখন সেখানে কর্মরত নেই। এই কারখানার বিষয়ে আমার আর বিস্তারিত জানা নেই।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সহ-সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প খাতের জন্য মোটেও ভালো দিক নয়। ইউনিটেক্স গ্রুপের মালিকপক্ষের কেউ হয়তো বর্তমানে দেশে নেই। সরকার চাইলে এ ধরনের বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। তবে এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণের বিষয়টিও জড়িত। মালিকপক্ষকে ব্যাংক ঋণের বিষয়টি দ্রুত সুরাহা করতে হবে। সারা দেশে এভাবে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে, যা দেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য ভালো কোনো দিক নয়।

সরেজমিন আনোয়ারা উপজেলার চাতুরী-চৌমুহনী এলাকায় অবস্থিত এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডে গিয়ে কারখানাটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ইউনিটেক্স গ্রুপের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো যোগাযোগ করা যায়নি।

aliul / aliul

গ্যাস পেয়ে উৎপাদনে, দুই দিন না যেতেই ফের বন্ধ সিইউএফএল

ঋণখেলাপি ইউনিটেক্সের কারখানা চালুর পরই কাঁচামাল সংকটে বন্ধ

টিসিবিতে এআই নজরদারির উদ্যোগ, ডিজিটাল কার্ডে মিলবে ভর্তুকির পণ্য

ভ্রমণ ও কেনাকাটায় বাড়তি সুবিধা, নতুন ক্রেডিট কার্ড আনল সিটি ব্যাংক

সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি : বিজিএমইএ সভাপতি

সবজি খাতে রপ্তানি বাড়াতে একমত সরকারি-বেসরকারি অংশীজন

আবারও বাড়ল কমদামি সিগারেটের দাম

সূচকের মিশ্র প্রবণতায় পুঁজিবাজারে লেনদেন

জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বিপিসি

ডিজিটাল টিকিটিংয়ে ভাড়ায় স্বচ্ছতা, বাড়বে সরকারি রাজস্ব

ইতালির বিনিয়োগ আকর্ষণে চামড়া খাতে সহযোগিতা বাড়াতে আলোচনা

পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়কে সৌরবিদ্যুৎ, বছরে সাশ্রয় ৪৮ লাখ টাকা

মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ল ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা