ঢাকা রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

শাবানা

চোখে পানি এসে পড়েছিল


বিনোদন ডেস্ক photo বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৮-৯-২০২৬ দুপুর ৪:৪৮

ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং সেখানেই সপরিবার থিতু হয়েছেন।  বিউটিকুইন-খ্যাত এ অভিনেত্রী তাঁর অভিনয়জীবন ও চলচ্চিত্র জগৎ নিয়ে মাঝেমধ্যে খুবই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বলেন জীবনের নানা অজানা অধ্যায়ের কথা। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে হোয়াটসঅ্যাপে বলা তাঁর অভিনয়জীবনের কিছু কথা তুলে ধরেছেন 
‘চকোরী’ আমার অভিনয় জীবনের মাইলস্টোন-

১৯৬০ সালে ‘নতুন সুর’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর ‘তালাশ’-এ কাজ করি। এটা সম্ভবত ১৯৬৩ সাল হবে। তালাশে একটা ‘গ্রুপ ডান্সে’ অংশ নিয়েছিলাম। ওই সময় আমার নাম রত্না ছিল। এরপর আরও কয়েকটি ছবিতে কাজ করি। এ চরিত্রগুলোও অনুল্লেখযোগ্য। ফিল্মের ভাষায় ‘এক্সট্রা’। এর জন্য অবশ্য আমার এখন খারাপ লাগে না। বরং গর্ববোধ করি যে, একদম ছোট থেকে নিজের ক্ষমতাবলে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি। ১৯৬৩-৬৫ সালের দিকে ক্রমেই ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তোলার চেষ্টা করছিলাম। তখন বনবাসে রূপবান, ডাকবাবু ও ভাইয়া ছবিতে ‘সহনায়িকা’র সুযোগ পাই। সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তখন এটা ছিল আমার জন্য বিরাট সুযোগ। আসলে তখন ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনয়টা এখনকার মতো এত ব্যবসায়িক হয়নি। কাজ করলে শিল্পীমূল্যটা পাওয়া যেত। এখন হয়তো শিল্পীরা তখনের চেয়ে অনেক বেশি টাকা পান; কিন্তু সেই আন্তরিকতা আর সম্মান পাওয়া খুব কঠিন। আমার প্রথম পরিচালক এহতেশাম হলেও ইবনে মিজান আমাকে নায়িকা হিসেবে কাস্ট করেন তাঁর ছবি ‘জংলী মেয়ে’তে। ইবনে মিজানের সঙ্গে পরিচয় হয় ‘আবার বনবাসে রূপবান’ ছবিতে কাজ করার সময়। ওই সময় তিনি আমার কাজ দেখে সন্তুষ্ট হন এবং আশ্বাস দেন তাঁর পরের কোনো এক ছবিতে নায়িকা করবেন। তবে এ ডাক যে এত তাড়াতাড়ি পাব ভাবতে পারিনি। সে সময় দাপুটে পরিচালক ছিলেন এহতেশাম ও মোস্তাফিজ। এদের ছবিতে কাজ করা সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল। ‘জংলী মেয়ে’তে কাজ করার সময় এক দিন ডাক পাই এহতেশামের ‘চকোরী’তে। তরুণী রত্নার কাছে এটা ছিল চাঁদ হাতে পাওয়া। আর এ ছবি থেকেই আমার নতুন অধ্যায়ের শুরু। এহতেশাম আমার রত্না নাম পাল্টে নতুন নাম দেন শাবানা। আমি এখন শাবানা হলেও সেই রত্নাকেও ভুলিনি। আসলে ‘চকোরী’ ছিল আমার নতুন জীবনের প্রথম মাইলস্টোন। ছবিটি আশাতীত ব্যবসা করে। আগের সময়টা কষ্টকর হলেও মনে হয় না তাতে আমার কোনো ক্ষতি হয়েছে।

মাত্র ৯ বছর বয়সে অভিনয়ে আসি-

যখন ছবিতে আসি ছবির জগৎটাই অন্যরকম ছিল। মাত্র ৯ বছর বয়সে প্রথম পর্দায় আসি। ছবিটা ছিল ‘নতুন সুর’। শিশু চরিত্রে অভিনয় করি। কেমন করেছিলাম মনে নেই। তবে আগে থেকে কোনো কিছু জানাশোনা ছিল না। হঠাৎ করে সুযোগ পেয়ে যাই। বাবা কোর্টে চাকরি করলেও বরাবরই তাঁর মধ্যে একটা শিল্পীসুলভ মন কাজ করত। এজন্যই মুসলমান মেয়েদের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হলেও বাবা আমাকে অভিনয় করতে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তো তিনি নিজেও পরিচালক হন। আমার ডাকনাম ছিল রত্না, ভালো নাম আফরোজা। এ দুটো নামের কোনোটাই শেষ পর্যন্ত থাকেনি। হয়ে যাই শাবানা। তবে সেই রত্নাকে ভুলে থাকতে চাই না। রত্না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি বটে, তবে সব শিখেছিল জীবন থেকে। আর এজন্যই রত্নার শিক্ষা আজকের শাবানার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। আমার নিজের কাছেই অবাক লাগে মায়ের আঁচলে মুখ মোছা রত্না কীভাবে আজকের শাবানায় রূপান্তরিত হলো। অভিনয় তখন আমার কাছে নেশায় পরিণত হতে চলেছে। ভালো লাগত। কেন লাগত বলতে পারব না। অভিনয় সম্পর্কে কোনো শিক্ষা কারও কাছ থেকে পাইনি। আমার সব শিক্ষা আমার চারপাশের জগৎ থেকে আর বিভিন্ন পরিচালকের কাছ থেকে পেয়েছি।

একশ্রেণির দর্শক-নির্মাতা আমাকে এড়িয়ে চলতেন-

বাণিজ্যিক ছবিতে আমার রমরমা চাহিদা থাকলেও একশ্রেণির দর্শক ও নির্মাতা আমাকে এড়িয়ে চলতেন। আমার বিরুদ্ধে তাদের সমালোচনার অন্ত ছিল না, আমি বেঁটে, আমার কণ্ঠ ভালো না, আমার হাসি-কান্না আলাদা করা যায় না- ইত্যাদি। এসব সমালোচনার একটা মোক্ষম জবাব দেওয়ার সুযোগ খুঁজছিলাম। সেটি এসে যায় ১৯৭৭ সালে ‘জননী’ ছবিতে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর। এটা ছিল আমার প্রথম জাতীয় পুরস্কার।

চোখে পানি এসে পড়েছিল-

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়ার ঘোষণা শুনে আমার চোখে পানি এসে পড়েছিল। এত দিনে আমার কাজের স্বীকৃতি পেলাম। অবশ্য কোনো শিল্পীর জন্য পুরস্কারটাই প্রধান হতে পারে না। তাঁর জন্য বড় পুরস্কার দর্শকদের ভালোবাসা। সেই পুরস্কার অনেক আগেই পেয়েছিলাম। তারপরও পুরস্কার শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করে। কাজ করে যেতে উৎসাহ জোগায়। চলচ্চিত্রশিল্পের সেই আগের পরিবেশ এখন নেই। থাকার কথাও নয়। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সবকিছু। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে, পুরোনো দিনের কথা মনে হলে।

সে সময় সবাই এক পরিবার ছিল-

সে সময় ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই একটা পরিবার হয়ে কাজ করত। সহশিল্পীদের মধ্যে ছিল আন্তরিকতা। ইউনিটের একজন অসুস্থ হলে সবাই তাঁর খোঁজ নিত। পরিচালক ছিলেন পরিবারের বাবার মতো। খুঁটিনাটি সবকিছু তিনিই তদারক করতেন। আমরা কেউ অভিনয়ে খারাপ করলে পরিচালক নিজে সেই অংশ দেখিয়ে দিতেন।  আমার অভিনয়জীবনে পরিচালকদের ভূমিকাটা প্রথম। আমি যা শিখেছি তার সবটুকুই বিভিন্ন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করে। তাঁরা আমাকে হাত ধরে শিখিয়েছেন। আর এ ক্ষেত্রে এহতেশাম ও মোস্তাফিজ ভাইয়ের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।

শান্তা / শান্তা