সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল ফ্যাসিবাদের আশঙ্কা
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নতুন করে ডিজিটাল ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রস্তাবিত আইনের অস্পষ্ট বিধান ও অপব্যবহারের আশঙ্কা বাক্স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী—বাক্স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি, এনসিপি এ সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিক্ষাবিদ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস। এতে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন— এনসিপির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার, ডেইলি ওয়াদার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ, লেখক, বিশ্লেষক ও নাটশেল টুডের নির্বাহী সম্পাদক অপূর্ব জাহাঙ্গীর এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা। আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আরমান হোসাইন।
ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর পক্ষে সরকার যেসব যুক্তি দিচ্ছে, সেগুলোর যৌক্তিকতা যাচাই করা জরুরি। অনলাইনে উসকানি, সহিংসতার আহ্বান, নারী ও শিশুর প্রতি হয়রানি এবং অপতথ্য ছড়ানোর মতো ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগজনক। তবে এসব কর্মকাণ্ডের অনেকগুলোই বিদ্যমান আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ফলে এসব অপরাধ প্রতিরোধের যুক্তিতে নতুন করে সংশোধনী আনার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বিধানগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা স্পষ্ট করা দরকার।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজবের সংজ্ঞা অস্পষ্ট থাকলে তা নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোন তথ্য গুজব হিসেবে বিবেচিত হবে, কে তা যাচাই করবে এবং যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কী হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি। বিশেষ করে, কোনো অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের সুযোগ না থাকলে অভিযোগ উত্থাপনকারী ব্যক্তি বা পরিবারও আইনি হয়রানির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একইভাবে, অনলাইনে মানহানির বিষয়টি বিবেচনার ক্ষেত্রে জনস্বার্থে সত্য তথ্য প্রকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমগুলো সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।
নাবিলা ইদ্রিস আরও বলেন, অশালীন বক্তব্য বা গালিগালাজ সামাজিকভাবে অনুচিত হলেও সেগুলো নিয়ন্ত্রণের নামে রাষ্ট্রকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। রাষ্ট্র নাগরিকের অভিভাবক নয়, নাগরিকের রাষ্ট্রের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। তাই বাক্শালীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য -‘বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো আইন ব্যবহার করবে না’ - শুধু এ আশ্বাসের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। আইনটি ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা নিশ্চিত করতে এর কাঠামোতেই অপব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তার মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ হয়রানির আশঙ্কায় নিজের মতপ্রকাশ থেকে বিরত থাকে, যা ‘চিলিং ইফেক্ট’ নামে পরিচিত।
নাবিলা ইদ্রিস বলেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর আইন থাকা জরুরি, তবে তা যেন নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন না করে। অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বচ্ছ যাচাইপ্রক্রিয়া, স্বাধীন তদন্তের সুযোগ এবং বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশকারী সাধারণ নাগরিকসহ সবার অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কিছু বিষয় অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যা আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ২৬(ক) ধারার সংশোধনী প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো ব্যক্তি আন্তরিকভাবে ছড়ানো একটি তথ্যের ভিত্তিতে কারও মৃত্যুর খবর বিশ্বাস করে ‘ইন্না লিল্লাহ’ পড়ে তার জন্য দোয়া করলে, সেই ব্যক্তিরাও কি শাস্তির আওতায় আসবেন? তার মতে, আইনে অপরাধের সংজ্ঞা ও প্রয়োগের বিষয়গুলো সুস্পষ্ট না হলে সাধারণ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন।
বিএনপিকে সতর্ক করে তিনি বলেন, অতীতে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যেসব আইন ও বাহিনী গঠন করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলো বিএনপির বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়েছে। তাই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা থেকে সরে এসে আইনের অপপ্রয়োগের ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মঞ্জু আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বন্দর চুক্তি নিয়ে বিএনপি দেশ বিক্রির অভিযোগ তুললেও পরে তারাই একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্দর ইজারার চুক্তি করেছে। বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েও দাম বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের ১৮ মাস পূর্ণ হলে জনগণ অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সঙ্গে তুলনা করবে। তার মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো জটিল সমস্যার সমাধানে একতরফা পদক্ষেপ না নিয়ে বেকারত্ব, জনপরিবহন, যানজট, বিদ্যুৎ-সংকট ও সড়কনিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার ও সংকট মোকাবিলা করতে হবে। নিজের সুবিধামতো আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে কোনো স্বৈরশাসক টিকে থাকতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি অপ্রয়োজনীয় বলে দাবি করলেও বর্তমান সরকার কয়েকটি অধ্যাদেশ প্রায় অবিকল রেখে আইন করেছে। স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত আইনে নির্বাহী আদেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের ক্ষমতা রাখা হয়েছে। অথচ জবাবদিহি নিশ্চিত করার অধ্যাদেশ বাতিল করা হলেও সরকারকে জনপ্রতিনিধি অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাইবার অধ্যাদেশে অনলাইন যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতায় উসকানির মতো বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সাইবার আইনে এমন সংশোধনী আনতে চাইছে, যা ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর থেকে ফেসবুক পোস্টের কারণে ২১ থেকে ২২ জনকে গ্রেপ্তারের খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোই বিদ্যমান সাইবার আইনের আওতায় না পড়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সারোয়ার তুষার বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানহানি, অপমান ও গুজবের মতো বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসবের সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, রাজনৈতিক সচিব ও সরকারপন্থি প্রচারকদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারের ৭০০ অটোরিকশা রয়েছে এবং সেগুলো দিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করা হচ্ছে—এমন দাবি করা হয়েছে। তার প্রশ্ন, গুজব নির্ধারণ করবে কে এবং সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছড়ানো কথার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?
তিনি আরও বলেন, সরকার একদিকে ছয় মাস অপেক্ষা করতে বলেছে, অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের প্রশ্নে ছয় মিনিটও অপেক্ষা করেনি। অতীতের ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা চিরস্থায়ী নিরাপত্তা নয়। জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; অন্যথায় জেন-জি ও জেন-আলফার প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হতে পারে।
লেখক, বিশ্লেষক ও নাটশেল টুডের নির্বাহী সম্পাদক অপূর্ব জাহাঙ্গীর বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী যেভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তাতে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে একধরনের অহমিকার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক সংকট ও পরিবর্তনের পর মানুষ আশা করেছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সরকার সত্যিই এমন আইন প্রণয়ন করতে চায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইনটি আমলাতান্ত্রিক, নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।
তিনি আরও বলেন, কোনটি অপতথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, তা সরকার নিজেই নির্ধারণ করবে, নাকি আদালত কিংবা তৃতীয় কোনো পক্ষ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে—এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার কারণে এ ধরনের বিষয়ে শুধু সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা কঠিন। তবে আইনটি নিয়ে আলোচনা চলমান রাখার উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার প্রস্তাবিত সংশোধনীর ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো পুনর্বিবেচনা করবে এবং এমন একটি আইন প্রণয়ন করবে, যা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
aliul / aliul
হাম উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১০৮৬
বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিপিকেএস জাতীয় লটারির পুরস্কার বিতরণ
প্রগতি সরণিতে সিএনজি থেকে বাংলা মদসহ চালক গ্রেপ্তার
মিরপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা মিঠুসহ গ্রেপ্তার ৩
রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি, রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আটক
চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নারী গ্রেপ্তার
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল ফ্যাসিবাদের আশঙ্কা
প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় স্থগিত হওয়া যুব উন্নয়নের পরীক্ষা হবে ১৬ অক্টোবর
নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, তদন্ত কমিটি গঠন করলো যুব মন্ত্রণালয়
প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে শাহবাগে চাকরিপ্রার্থীদের বিক্ষোভ, চার দফা দাবি
বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রকল্প দেখলেন প্রধানমন্ত্রী
মক্কা-মদিনার প্রশ্নে আপস নয়, মক্কা প্যাক্টে যোগ দিতে আগ্রহী বাংলাদেশ