সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে এল নিনোর প্রভাব: দাবানল, বিদ্যুৎ সংকট ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনো আবহাওয়াচক্রের প্রভাবে এ সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, দাবানল এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ব্যাংকক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরণে পরিবর্তন আনে এল নিনো। চলতি বছরের এই প্রাকৃতিক আবহাওয়াচক্র বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রায় কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তার চিত্র তুলে ধরা হলো।
ইন্দোনেশিয়া ও আমাজনে দাবানল, উদ্ধার ওরাংওটাং
এল নিনোর সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ায় তীব্র খরার সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বোর্নিও দ্বীপ ও দক্ষিণ সুমাত্রা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বনভূমি এবং বাগান কয়েক মাস ধরে দাবানলে পুড়ছে।
এসব দাবানলের কারণে পুরো অঞ্চলে ধোঁয়ার সংকট দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে মালয়েশিয়া কয়েকটি অঞ্চলে স্কুল বন্ধ করে দেয়। ধোঁয়াশাজনিত অসুস্থতার চিকিৎসা নিতে আগ্রহীদের জন্য ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিঙ্গাপুর।
ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের বৈঠক ডেকেছে মালয়েশিয়া। পাশাপাশি দাবানল মোকাবিলায় সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়ায় বছরের পর বছর বন উজাড় এবং পিটভূমি থেকে পানি নিষ্কাশনের কারণে শুষ্ক মৌসুমে দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে।
দাবানলে হাজার হাজার মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এদিকে, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া ও আগুনে আটকে পড়া কয়েক ডজন ওরাংওটাংকে উদ্ধার করেছেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা। তাদের মধ্যে রয়েছে নোভিতা নামের একটি নারী ওরাংওটাং। হাত ও পায়ে দগ্ধ অবস্থায় গাছের চূড়ায় আঁকড়ে থাকা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
মধ্য কালিমান্তান প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থার প্রধান আন্দি মুহাম্মদ খাদাফি বলেন, ‘সেটিকে নিজের আবাসস্থল ছেড়ে আসতে হয়েছিল। মূলত আগুনের কারণেই আমাদের তাকে উদ্ধার করতে হয়েছে।’
দাবানলের ধোঁয়ায় ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলের বৃহত্তম শহর মানাউসও ঢেকে যায়। সেখানে শুক্রবার সরকারি স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হয়।
আমাজোনাস রাজ্যে গত সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি অগ্নিকাণ্ডের হটস্পট শনাক্ত হয়েছে। শুধু বুধবারই সেখানে ৭৪৯টির বেশি স্থানে আগুন জ্বলছিল।
মিয়ানমারে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা, প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিলিপাইন
মিয়ানমারে মৌসুমের বাইরের তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ বেড়েছে। কর্তৃপক্ষ এ পরিস্থিতির জন্য এল নিনোকে দায়ী করেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কায় নাগরিকদের সতর্ক করেছে দেশটি।
মিয়ানমারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, ‘প্রবল এল নিনো পরিস্থিতির প্রভাবে সারা দেশে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বিদ্যুতের ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে।’
আবহাওয়া কর্মকর্তারা দেশটিতে ‘অস্বাভাবিক’ বৃষ্টিপাত, খরা, তীব্র গরম এবং খাবার পানির সংকটেরও সতর্কতা দিয়েছেন।
ফিলিপাইনের জ্বালানিমন্ত্রী শ্যারন গারিন বলেন, গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘জনসাধারণের প্রতি আমাদের আহ্বান, বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হোন। যাতে আমরা সবাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মানসিকতা গড়ে তুলতে পারি।’
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’ আইএমএফ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এএফপিকে বলেছেন, এল নিনোর বৈশ্বিক প্রভাব, বিশেষ করে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে তিনি ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’।
তিনি আরও বলেন, এল নিনোর প্রভাব সামাল দিতে হিমশিম খেতে পারে—এমন দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য আইএমএফ ‘প্রস্তুতি নিচ্ছে’।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিও (ইউএনডিপি) রোববার সতর্ক করে বলেছে, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং শক্তিশালী এল নিনোর সম্মিলিত প্রভাবে ‘নিখুঁত এক ঝড়’ তৈরি হয়েছে। এর ফলে কোটি কোটি, এমনকি কয়েক শ কোটি মানুষ আবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।
মাদাগাস্কারের দক্ষিণাঞ্চলে ত্রাণকর্মীরা এএফপিকে জানান, তাঁরা ইতোমধ্যে দুর্ভিক্ষের প্রভাব মোকাবিলা করছেন। চলতি মাস থেকে আফ্রিকায় এল নিনোর পূর্ণ প্রভাব শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা যা বলছেন-
জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) গত বৃহস্পতিবার জানায়, ডিসেম্বর মাসে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানো পর্যন্ত এল নিনো আরও শক্তিশালী হবে।
সংস্থাটির মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এটি বিশ্বের বড় একটি অংশে গড়ের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা সৃষ্টি করতে পারে এবং বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবা জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গত মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ‘সর্বকালের সর্বোচ্চ’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এদিকে, জাপানের আবহাওয়া সংস্থা শুক্রবার জানায়, চলমান এল নিনোর তীব্রতা রেকর্ডে থাকা ঘটনাগুলোর মধ্যে ‘সর্বোচ্চ’।
তবে এল নিনোর তীব্রতা নির্ধারণে সব আবহাওয়াবিদ একই মানদণ্ড ব্যবহার করেন না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তুলনামূলক বিশ্লেষণকে জটিল করে তুলেছে।
পরিসংখ্যানে এল নিনো-
- প্রশান্ত মহাসাগরের একটি অংশে কোপার্নিকাসের রেকর্ড করা সর্বকালের সর্বোচ্চ সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৯.৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
- চলতি আটলান্টিক মৌসুমে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ১টি। এল নিনোর কারণে এ মৌসুমে ঘূর্ণিঝড়ের তৎপরতা অস্বাভাবিকভাবে কম। বিপরীতে প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম বেশ সক্রিয়।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে থাইল্যান্ডে বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা- ৭১ জন ।
- আগস্ট থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার দাবানল থেকে কর্তৃপক্ষ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ওয়াইআইএআরআইয়ের উদ্ধার করা ওরাংওটাংয়ের সংখ্যা ৪৬টি।
‘সুপার এল নিনো’ কী-
এল নিনোর সঙ্গে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এ আবহাওয়াচক্র যত শক্তিশালী হয়, বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাবে সৃষ্ট চরম আবহাওয়ার ধরন—যেমন খরা বা অতিবৃষ্টি—তত তীব্র হয়।
চলতি বছরের এল নিনোকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হচ্ছে। তবে অনেক বিজ্ঞানী একে ‘অতি শক্তিশালী’ এল নিনো হিসেবে অভিহিত করেন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা গত মাসে জানায়, ডিসেম্বর মাসে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর আগে চলতি এল নিনো এ শ্রেণিতে পড়বে বলে তারা ধারণা করছে।
এ শ্রেণিবিন্যাসের প্রধান মানদণ্ড হলো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার স্বাভাবিক মাত্রা থেকে বিচ্যুতি। বর্তমানে সেখানে তাপমাত্রা রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা আগে থেকেই বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ জটিল হয়ে উঠেছে। তবে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের এই পূর্ববর্তী প্রভাব বাদ দিয়ে তাপমাত্রার প্রকৃত বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেন।
সূত্র : বাসস
aliul / aliul
সৌদির তিন স্থাপনা থেকে সবাইকে সরে যাওয়ার নির্দেশনা হুথিদের
ইয়েমেনের রাজধানীতে ব্যাপক বিমান হামলা চালাতে যাচ্ছে সৌদি
‘ভয়ে’ হুথিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সহায়তা নিলো না সৌদি
যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র দেখালেন কিম
অনিশ্চিত বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতিগত তাগিদ
নিরাপত্তা শঙ্কায় এক প্রাসাদ থেকে আরেক প্রাসাদে যাচ্ছেন প্রিন্স সালমান
প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে স্থল হামলার পরিকল্পনা ইরানের
সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে এল নিনোর প্রভাব: দাবানল, বিদ্যুৎ সংকট ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দিল্লিতে আন্দোলনের পেছনে বাংলাদেশের হাত রয়েছে: পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী
মঙ্গলে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভ্রমণের রেকর্ড করল নাসার পারসিভিয়ারেন্স
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ : সিজেপির ২ শীর্ষনেতা আটক
হুথিদের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় সব দেশকে এক হওয়ার আহ্বান আমিরাতের