ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

সবুজ অর্থায়নের কৌশলগত বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও সুযোগ


সাকিফ শামীম photo সাকিফ শামীম
প্রকাশিত: ৫-৭-২০২৫ দুপুর ২:২০

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ প্রকল্পকে উৎসাহিত করতে নীতিমালা ও অর্থায়ন প্রকল্প চালু করেছে। তবে, নীতিগত অসামঞ্জস্যতা, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা, দুর্বল অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এই বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বর্তমান পরিবেশ যথেষ্ট সহায়ক নয়। এই সমস্যা সমাধানে নীতিগত সংহতি ও স্থিতিশীলতা আনা প্রয়োজন ।
সবুজ অর্থায়ন বলতে পরিবেশ-বান্ধব কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে এমন ঋণ বা বিনিয়োগকে বোঝায়, যার মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং সবুজ অবকাঠামো নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত। এটি কেবল পরিবেশ সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা প্রদান করে। বৈশ্বিক সবুজ অর্থায়ন বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবুজ প্রকল্পের উপকরণগুলির মধ্যে রয়েছে সবুজ বন্ড, সবুজ ঋণ, সবুজ বন্ধকী, সবুজ ক্রেডিট কার্ড এবং টেকসই বিনিয়োগ তহবিল। 
২০০৯ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০২০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা পূরণ হয়নি। সম্প্রতি, ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০% এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, যা ২০৩১-২০৪০ সময়কালে বার্ষিক ১.৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। এই বিপুল তহবিলের জন্য বৃহৎ আকারের বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। ভিয়েতনাম, চীন, ভারত এবং মরক্কোর মতো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সফল মডেলগুলি সুসংগত নীতিগত প্রণোদনা, ঝুঁকি লাঘব এবং শক্তিশালী পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের গুরুত্ব তুলে ধরে। এইসকল দেশের মডেলসমূহ হতে ধারনা নিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নিজস্ব স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে। 
বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ অর্থায়নকে উৎসাহিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে, যেখানে ২০১৬ সাল থেকে ব্যাংকগুলিকে তাদের মোট ঋণের ন্যূনতম ৫% সবুজ অর্থায়নে বরাদ্দ করতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়াও জিটিএফ (Green Transformation Fund) এর মতো পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কম খরচে তহবিল সরবরাহ করা হয়। আইইইএফএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই তহবিল ব্যবহারের হার কমই রয়ে গেছে (যেমন, জিটিএফ-এর জন্য ১৯.০৫%)। এই প্রকল্পগুলির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সমন্বয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত নীতিগত অসংগতি এবং নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অফ ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই অ্যাক্ট (QEEESA) ২০১০ বাতিল এবং ৩০টিরও বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প স্থগিত করা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুন্ন করেছে। মাতারবাড়িতে নতুন কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুনরুজ্জীবিত করার বিবেচনা জলবায়ু উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক । ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য প্রণোদনার অভাবও একটি বড় সমস্যা। নীতিগত সংহতি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সৌরশক্তির সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ব্যবহার। বছরে ৩০০ দিনের বেশি রৌদ্রোজ্জ্বল দিন থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ একটি আদর্শ স্থান। সবুজ অর্থায়নের আওতায় সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সোলার হোম সিস্টেম ও কৃষি সেচ ব্যবস্থায় সৌর পাম্প ব্যবহারের মতো সবুজ প্রকল্প (green project) গুলোয় বিনিয়োগে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। 
সবুজ ভবনের (green building) ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল অর্জন হলো ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের লিড গোল্ড সার্টিফিকেট অর্জন—যা আন্তর্জাতিকভাবে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য, শক্তি দক্ষতা এবং জল ব্যবস্থাপনার মানদণ্ডে একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি। হাসপাতালটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে এটি আমার জন্য এক বিশেষ অর্জন। এই হাসপাতালটি শুধু চিকিৎসা সেবাতেই নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। হাসপাতাল চত্বরজুড়ে ছায়াঘেরা সবুজ গাছপালা, উদ্ভিদ-বেষ্টিত গার্ডেন এবং আলো-বাতাস প্রবাহের স্বাভাবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। 
বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন বাজার থেকে বছরে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করার সম্ভাবনা রাখে, কিন্তু একটি স্পষ্ট জাতীয় নীতির অভাবে এই খাতের বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে উন্নত রান্নার চুলা এবং সৌর হোম সিস্টেমের মতো কার্বন-হ্রাসকারী উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। তবে, দুর্বল নীতি কাঠামো এবং বেসরকারি খাতের সীমিত অংশগ্রহণের কারণে দেশটি তার সম্ভাবনার খুব সামান্যই কাজে লাগাতে পারছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫-এ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সার্টিফিকেট (REC) প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যকে প্রতিনিধিত্ব করবে। তবে, বর্তমানে কার্বন ট্রেডিং থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ ভারতীয় পরামর্শকদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা দেশীয় নিয়ন্ত্রণে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশমালাগুলি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করবে।


সাকিফ শামীম
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার
ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ

এমএসএম / এমএসএম

সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?

বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান