বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় নতুন সরকারের ঘাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বোঝা
দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। এই বিশাল দেনার বোঝা নিয়েই বিদ্যুৎ খাতে পথচলা শুরু করছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। রমজানের পরপরই সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়া সরকারে জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বর্তমানে চাহিদা চলছে ১৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বিদ্যুৎ বিভাগের ধারণা, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে এ চাহিদা সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান, আর্থিক সংকট ও বকেয়া পরিশোধ এই তিনের সমন্বয় এ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
নবনিযুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, পরিকল্পনা আছে, তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎকে টোট্যালি ফিনান্সিয়ালি করাপ্ট করে দিয়েছে। অনেক বকেয়া, অনেক দেনা পাওনা। জ্বালানি নেই, জ্বালানি ইমপোর্ট করতে হবে। মোট কথা হলো ভেরি কমপ্লিকেটেড। কাজ করে এগুলি সমাধান করতে হবে।
সরকারি হিসাব বলছে, জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানি সক্ষমতা যুক্ত হয়ে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের গ্রাহক প্রায় ৪ কোটি ৯৪ লাখ। দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২৩ জুলাই ২০২৫ সালে ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।
তবু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। উদ্যোক্তাদের দাবি, গত সাত-আট মাস ধরে তাঁরা বিল পাননি।
এত বকেয়া কীভাবে জমেছে, এই প্রশ্নে পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম বলেন, এটা ফ্রম দা বিগিনিং কিউমিলিটিভ হারে হতে হতে এ অবস্থায় এসেছে। আমরা যেটা পাচ্ছি সরকারের থেকে সাবসিডি- সেটা মাইনাস হচ্ছে, এভাবে হতে হতে এ পর্যায়ে এসেছে। এর মধ্যে আরো কিছু মাইনাস হবে, আমরা সরকার থেকে আরও কিছু টাকা পাবো সাবসিডি।
বেসরকারি উদ্যোক্তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের এই বকেয়া নতুন সরকারের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁদের ভাষায়, দ্রুত পরিশোধ না হলে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হবে। কারণ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির বড় অংশই উদ্যোক্তাদের নিজস্ব আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
বেসরকারি উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিপপা সতর্ক করেছে, বিলের বকেয়ার একটি বড় অংশ পরিশোধ না করলে তেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়বে। এলসি খোলার পর দেশে তেল আসতে ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে। ইতোমধ্যে তেলের নিট মজুদ কমে আসছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পিডিবির বকেয়া এক পর্যায়ে তিন মাসে নেমে এসেছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে আর কোনো বিল পরিশোধ করেনি বলেও জানায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা। তারা বলেন, এ পরিস্থিতি নতুন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে কি না, সে সন্দেহের কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ প্রসঙ্গে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেছেন, টাকার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের উপর নির্ভর করে, এখানে ইচ্ছাকৃত বকেয়া রাখার কোনো ইস্যু নেই। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, সরকারের শেষ পর্যায়ে ২ হাজার কোটি টাকা ছাড় করার একটা ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলার মজুদ, সরকারের সামনে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। জ্বালানি আমদানি বাড়ানো মানেই বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এখন থেকে এক মাস পরে মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আমরা যদি মনে করি, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার করব, এলএনজি ইমপোর্ট করব এবং কয়লা আমদানি করব। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এটার জন্য যতটুক খরচা হবে, যতটা ডলার লাগবে, সেটা কি দেয়া হবে কি না!
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেশি। মোট সক্ষমতার ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, কয়লা ও তেলের ব্যবহার হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি করতে হয়। তেল ও কয়লার ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা প্রায় পুরোপুরি।
ড. ইজাজ হোসেনের হিসাব অনুযায়ী, আমি একটা হিসেব করেছি, যদি আমরা সব এনার্জি আমদানি করি তাহলে ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার লাগবে। আমাদের তো আরও বেশি লাগবে। ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে ২৫ বিলিয়ন ডলারের মত লাগে। কিন্তু এত টাকার বাড়ি কোধায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই, কোন পথ ধরে এগোবে সরকার? জ্বালানি আমদানি বাড়িয়ে চাহিদা মেটানো, নাকি ডলার সাশ্রয়ের দিকে বেশি জোর দেওয়া?
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আপাতত স্বল্পমেয়াদি সংকট সামাল দেওয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তিনি বলেন, এখন প্রায়োরিটি রোজার মধ্যে বিদ্যুৎ চালানো, সেচের সময় বিদ্যুৎ চালানো, মানুষের কষ্ট যাতে কম হয় সেটার জন্য চেষ্টা করব। কয়লা আনতে হবে। এলপিজি, এলএনজি আনতে হবে। এদিকে পাহাড় পরিমাণে বাকি করে গেছে, বকেয়া করে গেছে, এই সব মিলিয়ে ফিন্যান্সিয়ালি একটা বড় চ্যালেঞ্জ আছে।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের সামনে চাহিদা, জ্বালানি, ডলার ও বকেয়া ছাড়াও গরম যত এগিয়ে আসছে, এই সমীকরণ ততই কঠিন হয়ে উঠছে। তবে সরকারের যথেষ্ট আন্তািরকতা থাকবে বলে জানান তিনি।
এমএসএম / এমএসএম
বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় নতুন সরকারের ঘাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বোঝা
দ্রুত বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
ভরিতে ৩ হাজার বাড়ল সোনার দাম
ইইউতে পোশাকের দামে পতন
এফইআরবির নতুন চেয়ারম্যান আজিজ নির্বাহী পরিচালক সিরাজ
তৈরি পোশাক রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলার করতে নতুন সরকারের সহযোগিতা চান মালিকেরা
নীতি সুদহার অপরিবর্তিত, বাড়ানো হয়েছে বিনিয়োগ লক্ষ্য
চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পথে থাইল্যান্ড উপকূলে ডুবল পণ্যবাহী জাহাজ
বিমানের নতুন এমডি হুমায়রা
ভোটের আগে চাঙা রেমিট্যান্স, জানুয়ারিতে এলো ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার
১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সব ব্যাংক বন্ধ
বেশি দামে তেল বিক্রির প্রস্তাবে তোপের মুখে বিপিসি