পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি মানুষের জীবনকে যেমন সহজ ও গতিশীল করেছে, তেমনি নতুন কিছু সামাজিক ও মানসিক সমস্যারও জন্ম দিয়েছে। এসব সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো পর্নোগ্রাফি আসক্তি। একসময় যা সীমিত পরিসরে এবং নির্দিষ্ট মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ তা স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং উচ্চগতির ইন্টারনেটের কল্যাণে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। ফলে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ, এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশও এই আসক্তির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পর্নোগ্রাফি আসক্তি এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্নোগ্রাফি আসক্তিকে কেবল নৈতিক অবক্ষয় বা ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মস্তিষ্কের পুরস্কার বা ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল আচরণগত সমস্যা। পর্নোগ্রাফি দেখার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক রাসায়নিকের মাত্রা বেড়ে যায়, যা সাময়িক আনন্দ ও উত্তেজনার অনুভূতি সৃষ্টি করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের উদ্দীপনার সংস্পর্শে থাকলে মস্তিষ্ক স্বাভাবিক আনন্দ অনুভব করার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে। তখন ব্যক্তি আরও বেশি সময়, আরও বেশি কনটেন্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও চরম ধরনের উপাদানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এভাবেই তৈরি হয় নির্ভরতার চক্র।
এই আসক্তির সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। অতিরিক্ত পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের ফলে মনোযোগের ঘাটতি, উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে। অনেকেই বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম আনন্দে আশ্রয় খোঁজেন। ফলে ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা কমে যায়, পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হয় এবং পেশাগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পর্নোগ্রাফির আরেকটি গুরুতর ক্ষতি হলো এটি মানুষের সম্পর্কের ধারণাকে বিকৃত করে। বাস্তব জীবনের ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আবেগ এবং দায়িত্ববোধের পরিবর্তে এটি অবাস্তব ও কৃত্রিম প্রত্যাশা তৈরি করে। ফলে দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক সম্পর্কে অসন্তোষ বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব, অবিশ্বাস এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমানে পারিবারিক অশান্তি ও সম্পর্কের অবনতির পেছনে পর্নোগ্রাফি আসক্তিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও কিশোররা। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন মানুষের মানসিক, সামাজিক এবং নৈতিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়। কিন্তু এই সময়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে এলে তাদের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ এবং আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাস্তব সম্পর্ক সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় তারা যৌনতা ও মানবিক সম্পর্ককে কেবল ভোগের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। ফলে সুস্থ সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে এই আসক্তি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মাদকাসক্তির মতো এর দৃশ্যমান লক্ষণ সবসময় চোখে পড়ে না। একজন ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে এই সমস্যায় ভুগতে পারেন, অথচ পরিবার বা বন্ধুরা তা বুঝতেই পারেন না। ব্যক্তিগত স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গোপন অনলাইন ব্যবহারের সুযোগ সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই বাস্তবতায় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর সচেতন নজরদারি রাখা। কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিভাইস খোলা স্থানে ব্যবহার নিশ্চিত করা, নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা এবং শিশুদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করা জরুরি। শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান যেন যেকোনো সমস্যা বা কৌতূহল নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। পর্নোগ্রাফি আসক্তিকে লজ্জা বা গোপনীয়তার বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। এটি একটি মানসিক ও আচরণগত স্বাস্থ্য সমস্যা, যার জন্য প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নেওয়া জরুরি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং আসক্তি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল দিতে পারে।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের কাউন্সেলিং ও চিকিৎসাসেবা এখন পাওয়া যায়। কিন্তু সামাজিক কলঙ্ক ও সচেতনতার অভাবের কারণে অনেকেই সময়মতো সাহায্য নিতে এগিয়ে আসেন না। এই বাধা দূর করতে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।
পর্নোগ্রাফি আসক্তি নিঃসন্দেহে ডিজিটাল যুগের একটি নীরব মহামারি। এর প্রভাব ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে জাতীয় উন্নয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই এখনই প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। কারণ একটি সুস্থ, মানবিক ও উৎপাদনশীল সমাজ গড়তে হলে আমাদের প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর ক্ষতিকর দিকগুলো মোকাবিলায়ও সমানভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম
লেখক ও কলামিস্ট
এমএসএম / এমএসএম
সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?
বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক
হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা
কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?
প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?
লেখকের কষ্ট