দুধ থেকে স্বপ্নের স্বাদ: ভেটেরিনারি শিক্ষার্থীদের এক মিষ্টিময় পাঠশালা
সকালটা ছিল অন্যসব দিনের মতোই। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের করিডোরে ক্লাসের প্রস্তুতি, ল্যাবরেটরিতে যন্ত্রপাতির শব্দ আর শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত পদচারণা। কিন্তু সেই পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে জন্ম নিচ্ছিল এক ভিন্ন আয়োজন। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল দুধের ঘ্রাণ, চিনির মিষ্টি সুবাস আর তরুণ উদ্যমের উষ্ণতা। মনে হচ্ছিল, বিজ্ঞান আর শিল্প যেন হাত ধরাধরি করে প্রবেশ করেছে এক অনন্য উৎসবে।
যারা প্রতিদিন প্রাণীর স্বাস্থ্য, রোগতত্ত্ব কিংবা গবেষণার জটিল সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তারাই সেদিন হয়ে উঠেছিলেন মিষ্টান্নশিল্পী। স্ক্যালপেল আর মাইক্রোস্কোপের জায়গা নিয়েছিল ছানা, চিনি, ক্ষীর আর রঙিন সাজসজ্জা। আর সেই রূপান্তরের সাক্ষী ছিল গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস অনুষদ।
ডেইরি প্রোডাক্ট টেকনোলজি কোর্সের অংশ হিসেবে সোমবার (২৩ জুন) শিক্ষার্থীরা আয়োজন করে এক ব্যতিক্রমী ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম। সেখানে তৈরি হয় নাটোরের ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লা, রসমালাই, সন্দেশ, চমচম, পায়েস, পাটিসাপটা, ডিমবিহীন আমের পুডিং, দই, মাঠাসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন।
তবে এই আয়োজনের গল্প শুরু হয়েছিল আরও আগে।
রবিবার সন্ধ্যা নামতেই অনুষদের ভেতরে শুরু হয় ব্যস্ততার নতুন অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি টিচিং ফার্ম থেকে আনা হয় তাজা দুধ। বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয় প্রয়োজনীয় উপকরণ। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ রাতের প্রস্তুতি। দুধ জ্বাল দেওয়া, ছানা তোলা, ক্ষীর ঘন করা, চিনি মেশানো আর স্বাদের নিখুঁত ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ার নিরলস প্রয়াস।
যখন ক্যাম্পাসের অধিকাংশ মানুষ ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে, তখন ভেটেরিনারি শিক্ষার্থীদের আবাসিক কক্ষগুলো যেন পরিণত হয়েছে ছোট ছোট মিষ্টান্ন কারখানায়। বড় বড় হাঁড়িতে দুধ জ্বলছে, কারও হাতে কাঠের খুন্তি, কারও হাতে ছানার নরম দলা। কেউ রসমালাইয়ের রস নিয়ে ব্যস্ত, কেউ কাঁচাগোল্লার গড়ন ঠিক করছেন, কেউ আবার চমচমের রঙ নিয়ে চিন্তিত।
এর মাঝেই ভেসে আসে হাসির শব্দ।
“মামা, কাল যদি স্যাররা প্রশংসা করে, ক্রেডিট কিন্তু আমারও আছে। এতক্ষণ ধরে পাশে বসে তোদের মনোবল বাড়িয়ে যাচ্ছি!”
একজনের এমন কথায় হেসে ওঠে পুরো দল। ক্লান্ত চোখে তখনও ঘুম নেই। আছে কাজ শেষ করার তাড়না, আছে নিজেদের সেরাটা তুলে ধরার ইচ্ছে। খুনসুটি, গল্প আর হাসির ফাঁকে ফাঁকেই রাত ধীরে ধীরে গলে গিয়ে মিশে যায় দুধের কড়াইয়ে। সময় যেন তখন আর ঘড়ির কাঁটায় মাপা যায় না; মাপা যায় ফুটতে থাকা দুধের ঘনত্বে, তৈরি হতে থাকা মিষ্টির সুবাসে।
পরদিন সকালেই শুরু হয় আরেক আয়োজন।
এবার স্বাদের সঙ্গে যোগ হয় সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা।
আটটি দলে বিভক্ত ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নিজেদের তৈরি মিষ্টান্নগুলোকে শুধু সুস্বাদু করেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা সেগুলোকে পরিণত করেছে শিল্পকর্মে। কোথাও চেরিফলের লাল আভা, কোথাও পেস্তা বাদামের সবুজ ছোঁয়া, কোথাও কিসমিসের নকশা। কেউ নিখুঁতভাবে সন্দেশ সাজাচ্ছেন, কেউ ট্রের ওপর নিজেদের দলের নাম লিখছেন শিল্পীর মমতায়। প্রতিটি টেবিল যেন হয়ে উঠেছিল স্বাদ, সৌন্দর্য আর সৃজনশীলতার একেকটি প্রদর্শনী।
এই ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মনেও তৈরি করেছে বিশেষ অনুভূতি।
শিক্ষার্থী নামিছুল আখবার খিয়াম বলেন, “জীবনে এই প্রথম আমরা নিজেরা মিষ্টি তৈরি করেছি। রাতভর পরিশ্রম করেছি। কিন্তু আজ শিক্ষক, পরিদর্শক ও সহপাঠীদের প্রশংসা শুনে মনে হচ্ছে সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। এটি শুধু একটি ক্লাস ছিল না, ছিল নতুন কিছু শেখার আনন্দ।”
আসলে এটি কেবল মিষ্টি তৈরির আয়োজন ছিল না। এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল খাদ্যপ্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি, দলগত সমন্বয় এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। বইয়ের পাতায় শেখা তত্ত্ব সেদিন রূপ নিয়েছিল হাতে ছোঁয়া বাস্তবতায়।
শিক্ষার্থীদের এই পুরো কার্যক্রমে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেন অ্যানিমেল প্রোডাকশন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ড. মো. জামিনুর রহমান এবং একই বিভাগের প্রভাষক ডা. কাজী মোহাম্মাদ নোমান।
ড. জামিনুর রহমান বলেন, “শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করলেই যথেষ্ট নয়। সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাতভর শ্রম দিয়ে তারা যে মানসম্পন্ন মিষ্টান্ন তৈরি করেছে, তা তাদের শেখার আগ্রহ, দায়িত্ববোধ এবং দলগত দক্ষতার উজ্জ্বল উদাহরণ।”
শিক্ষার্থীদের এই স্বাদভরা আয়োজন পরিদর্শন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন, রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. ওহিদুজ্জামান, ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. জহিরুল ইসলাম খানসহ বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
পরিদর্শন শেষে অধ্যাপক ড. জহিরুল ইসলাম খান বলেন, “তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি হাতে কলমে এমন অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বাড়ায়। পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের নিষ্ঠা, ধৈর্য ও সৃজনশীলতা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, “এ ধরনের ব্যবহারিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় এমন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে, যা শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও বাস্তবমুখী মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।”
এমএসএম / এমএসএম
পবিপ্রবিতে ভেট সায়েন্স অ্যান্ড এএইচ স্টুডেন্টস' অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি
হামহাম জলপ্রপাতে আহত ডিআইইউ শিক্ষার্থী, ৯৯৯-এ ফোনের পর উদ্ধার ১০ পর্যটক
সরকারি কলেজের ১৪৫ প্রদর্শককে পদোন্নতি
টিএ চালুর ঘোষণা, স্বতন্ত্র কোডের আশ্বাস—সমাধানের পথে শেকৃবির এএসভিএম সংকট
শহীদের স্মরণে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন
পবিপ্রবিতে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ ফাইনাল, উৎসবমুখর ক্যাম্পাস
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন আইনুল ইসলামের পদত্যাগ, নতুন দায়িত্বে শাওলী মাহবুব
দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতির দায় নীতিনির্ধারকদের
বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি এসোসিয়েশনের নতুন নেতৃত্বে আনোয়ার-ফিরোজ
পবিপ্রবিতে হেলথ সায়েন্স অনুষদ অনুমোদন, চালু হচ্ছে ফিজিওথেরাপি, নার্সিং ও স্পোর্টস বিভাগ
কুবিতে ‘স্টুডেন্টস সাপোর্ট সার্ভিস ইউনিট’ চালু করা হবে: উপাচার্য
সাইবার বুলিংয়ে অতিষ্ঠ নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা