ঢাকা রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

এস ডি সুব্রত

“বহু ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ”


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১-৭-২০২৬ বিকাল ৬:১৮

ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাগরণ ও বাঙালি চেতনা বিকাশের অগ্রদূত ছিলেন শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বহু ভাষাবিদ ও জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জগতে অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের আগেই তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলার দাবি তুলে ধরতে থাকেন। তিনি প্রায় ৩০টি ভাষা জানতেন। ১৮টি ভাষায় ছিলেন সুপণ্ডিত। কিন্তু তার অন্তরের ভাষা ছিল বাংলা। তিনি বলেছিলেন, মা, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু। বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তাঁকে বলা হতো ‘চলন্ত এনসাইক্লোপেডিয়া’। বিভিন্ন ভাষার প্রতি ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর অদম্য আগ্রহ। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের ২৪ পরগণার পেয়ারা গ্রামে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ১৮৮৫ সালের ১০ ই জুলাই। মৃত্যুবরন করেন ১৩ জুলাই ১৯৬৯ সালে। পশ্চিমবঙ্গে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করার পর ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে যান। কলকাতা মাদ্রাসা (ঐ মাদ্রাসার একটি ইউনিট তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিল) থেকে এফ.এ.  পাশ করার পর ১৯১০ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি এম.এ. এবং আইন পড়েন। ১৯২৮ সালে প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট লাভ করেন। ডক্টরেট শেষ করার আগেই তিনি গবেষণার কাজ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনার কাজ করেন ১৯২১ সাল থেকে। ১৯৪৪ সালে কয়েকবছর বগুড়া কলেজে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করার পর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আবার ফিরে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবং সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। চর্যাপদ বিষয়ক গবেষণা, বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে তার মতবাদ, বাংলাভাষার জন্মসাল বিষয়ে তার বক্তব্য, বাংলা বর্ষপঞ্জির সংস্কার, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখা, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন সবই তার উল্লেখযোগ্য কীর্তি। তিনি বাঙালি মুসলমানকে শিখিয়েছিলেন মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ। তিনি ইসলাম ধর্মের অনুশাসনগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলতেন। অথচ তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মকেও তিনি যতটা বুঝতেন ততোটা অন্য অনেক ধর্ম বিষয়ক পণ্ডিতও বুঝতেন কিনা সন্দেহ। কারণ একাধারে কোরআন হাদিস ও গীতা, বেদ, বাইবেল পড়া মানুষ, আরবি, ফার্সি, হিব্রু এবং সংস্কৃত, পালি, প্রাচীন পাহলবি এবং ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান জানা মানুষ সারা বিশ্বেই বিরল। করাচিতে ঊর্দু অভিধান বোর্ডের প্রধান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি প্রফেসর এমিরেটাস হন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রফেসর এমিরেটাস।

পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান তৈরি করে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন। বাংলা অ্যাকাডেমির ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক পদেও কাজ করেছিলেন তিনি। এছাড়াও বাংলা অ্যাকাডেমির পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি হিসাবে কাজ করেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি লেখার মধ্যে দিয়ে, যেটা তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। কমরেড পত্রিকায় একটি লেখা তিনি লেখেন, 'দ্য ল্যাঙ্গোয়েজ প্রবলেম অফ পাকিস্তান'। এই নিবন্ধে যে কথাগুলো তিনি বলেন, সেগুলো হচ্ছে এই যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাংলাভাষী অংশে, যদি বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতা হবে পরাধীনতারই নামান্তর। একথা তিনি বলেন ১৯৪৭ সালের তেসরা অগাস্ট বলেন তার ছেলে তকিউল্লাহ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা। তিনি বাংলা ভাষার ইতিহাস দু খণ্ডে লিখেছিলেন। একসময় বিদ্যাপতির যে পদগুলো ছিল, সেগুলো সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। তাঁর আরেকটি বিরাট কৃতিত্ব হচ্ছে প্রাচীন বাংলার  প্রথম নিদর্শন  চর্যাপদের সম্পাদনা করেছিলেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর লেখা বইসমুহ হল- ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, দীওয়ানে হাফিজ, রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম, বিদ্যাপতি শতক, বাংলা সাহিত্যের কথা (২ খণ্ড), বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ইত্যাদি। ফ্রান্সের সরকার তাকে নাইট অফ দ্যা অর্ডার্স এন্ড আর্টস এন্ড লেটার্স পদক দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদ্যাবাচস্পতি উপাদি পান। পাকিস্তান আমলে তিনি প্রাইড অফ পারফরম্যান্স এবং হিলাল ই ইমতিয়াজ উপাধি পেয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স তাকে সম্মানীত ফেলো হিসেবে মনোনীত করেছিলো, কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাকে অনুমতি না দেওয়ায় তিনি তা গ্রহণ করতে পারেননি। ১৯৬৯ সালে এই ক্ষণজন্মা বাঙালী ভাষাবিদ মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে ঢাকা হলের পাশে সমাহীত করা হয় এবং তখন থেকে ঢাকা হলের নামকরণ করা হয় শহীদুল্লাহ হল। বহু ভাষাবিদ ও জ্ঞানতাপস ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মের মাধ্যমে।

 

শান্তা / শান্তা