মোঃ নাজির হোসেন
“হৈমন্তীর ফুলসজ্জা”
রাত গভীর। শহরের কোলাহল থেমে এসেছে, কিন্তু পুরনো লাল ইটের সেই গলির আলো তখনও নিভেনি। রঙিন বাতির নিচে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন নারী। কারও ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, কারও চোখে গাঢ় কাজল, কারও গায়ে উজ্জ্বল শাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তারা যেন উৎসবের সাজে সেজেছে। কিন্তু এই সাজের নাম উৎসব নয়—জীবিকার দায়ে "ফুলসজ্জা"।
তাদের একজনের নাম হৈমন্তী । বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। ছোটবেলায় সে স্বপ্ন দেখত শিক্ষক হবে। বাবা ছিলেন দিনমজুর, মা মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না। হঠাৎ বাবার মৃত্যু, তারপর মায়ের অসুস্থতা—সবকিছু বদলে গেল। জীবনে চলে এলো অনাকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন।
এক আত্মীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হৈমন্তীকে শহরে নিয়ে আসে। কিন্তু যে চাকরির কথা বলা হয়েছিল, তা কখনোই ছিল না। প্রতারণা, জোরজবরদস্তি আর অসহায়তার এক অন্ধকার চক্রে আটকে যায় সে। পালানোর চেষ্টা করেছিল বহুবার, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়। বছর কেটে যায়।
এখন প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলে হৈমন্তী আয়নার সামনে বসে। ধীরে ধীরে মুখে পাউডার লাগায়, ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়, চুলে ফুল গুঁজে। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে কখনো কখনো মনে হয়—এই মুখটা কি সত্যিই তার?
একদিন নতুন এক মেয়ে আসে। নাম মায়া। বয়স মাত্র উনিশ। সারাক্ষণ কাঁদছে। হৈমন্তী তার পাশে গিয়ে বসে।
—"কাঁদছ কেন?"
মায়া চোখ মুছে বলে,
—"আমি তো এখানে থাকতে চাই না।"
হৈমন্তী মৃদু হেসে বলে,
—"আমাদের কেউই এখানে থাকতে চাইনি।"
সেই হাসির ভেতরে ছিল না আনন্দ, ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা কান্না।
হৈমন্তী মাঝে মাঝে রাতে ছাদে উঠে আকাশ দেখে। দূরে কোনো বাড়ির জানালায় আলো জ্বলে। কোথাও হয়তো মা তার সন্তানকে ঘুম পাড়াচ্ছেন, কোথাও বাবা গল্প শোনাচ্ছেন। হৈমন্তীরও একটি মেয়ে আছে। গ্রামের এক আত্মীয়ের কাছে মানুষ হচ্ছে। মেয়েটি জানে, তার মা শহরে কাজ করে। কিন্তু কী কাজ—সেটা সে জানে না।
প্রতি মাসে হৈমন্তী যতটুকু পারে টাকা পাঠায়। সে চায়, তার মেয়ে যেন পড়াশোনা করে, সততার সহিত বাঁচতে পারে। জীবনের যে অন্ধকার পথে তাকে হাঁটতে হয়েছে, সেই পথে যেন আর কাউকে হাঁটতে না হয়।
একদিন এক সমাজকর্মী সেখানে এলেন। তিনি স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে কথা বললেন। অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করেনি। কারণ বহুবার বড় বড় প্রতিশ্রুতি শুনেও তারা কিছু পায়নি। তবু হৈমন্তীর মনে ক্ষীণ একটি আশার আলো জ্বলে উঠল।
সে বুঝেছিল, মানুষকে শুধু অতীত দিয়ে বিচার করলে ভবিষ্যৎ বদলানো যায় না।
হৈমন্তী প্রায়ই বলত,
"আমাদের সাজ দেখে অনেকে বিচার করেন। কিন্তু এই সাজের নিচে কত ভাঙা স্বপ্ন, কত অপূর্ণ গল্প, কতই না- না বলা কান্না লুকিয়ে আছে, তা কেউ দেখে না।"
এই পেশায় থাকা প্রতিটি নারীর গল্প এক নয়। কেউ প্রতারণার শিকার, কেউ দারিদ্র্যের কারণে, কেউ পারিবারিক সহিংসতা থেকে পালিয়ে এসে, আবার কেউ অন্য কোনো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে এখানে পৌঁছেছেন। তাদের প্রত্যেকের জীবনের পেছনে আছে আলাদা ইতিহাস।
সমাজের উচিত তাদের মানুষ হিসেবে দেখা—অপমানের চোখে নয়, সহমর্মিতার চোখে। নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আইনি সহায়তা এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়লে অনেকেই নতুন জীবন শুরু করতে পারেন।
রাত শেষে যেমন ভোর আসে, তেমনি অন্ধকার জীবনেরও পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে। হৈমন্তী এখনও স্বপ্ন দেখে—একদিন সে ছোট্ট একটি ফুলের দোকান করবে। সেখানে সত্যিকারের ফুল সাজাবে, জীবিকার জন্য নিজের মনকে আর সাজাতে হবে না।
সেদিন তার "ফুলসজ্জা" হবে আরেক রকম—সম্মান, স্বাধীনতা আর নতুন জীবনের ফুলসজ্জা।
লজ্জার নয়—জীবিকার জন্য বেঁচে থাকার সংগ্রামই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আর প্রতিটি মানুষই প্রাপ্য- মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং নতুন করে বাঁচার একটি সুযোগ।
শান্তা / শান্তা
“পাতার টাকা”
“মধুমাস”
“ঝুম ঝুম বৃষ্টি”
“আজ আকাশের মন ভালো নেই”
“নিরামিষ নেকড়ে”
“হৈমন্তীর ফুলসজ্জা”
“ব্যথিত কথামালা”
আমরাই ভবিষ্যৎ যোদ্ধা
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ডে ২০২৬ উদ্যাপন
তিস্তা নদী
ফুলি চাচির সম্ভাব্য রেডকার্ড
বাবার হুইল চেয়ার