ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ছোটগল্প:

“জীবন-প্রেমিক” বিশ্বজিৎ মণ্ডল


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬-৯-২০২৬ সকাল ৯:২৭
শহরের শেষ প্রান্তে যে নদীটি এসে থেমে গেছে, তার নাম কেউ মনে রাখে না। মানচিত্রে নদীটির অস্তিত্ব আছে, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে নেই। বর্ষায় সে ফুলে ওঠে, শীতে শুকিয়ে যায়। তার বুকের ওপর কচুরিপানা জমে থাকে, ঠিক যেমন মানুষের মনে জমে থাকে অব্যক্ত কিছু কথা।
সেই নদীর ধারে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসত অরণ্য ।
বয়স তেত্রিশ। মুখে অকাল ক্লান্তি। চোখের নিচে কালি। অথচ একসময় এই চোখেই নাকি পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখা যেত।
 অরণ্য এখন একটি ছোট ডিজিটাল সংবাদপত্রে কাজ করে। খবর লেখে, মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়, শহরের ফুটপাত থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিস পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়। তার লেখা খুব জনপ্রিয় নয়। কারণ সে চটকদার খবর লেখে না। সে লেখে সেইসব মানুষের কথা, যাদের জীবন সংবাদ হয় না।
কখনও কখনও মনে হয়, নিজের গল্পটাও সে এভাবেই লিখছে।
একদিন বিকেলে সম্পাদক প্রত্যুষা  তাকে বলল,” অরণ্য, তোমার লেখায় এত বিষণ্ণতা কেন?"
অরণ্য কম্পিউটারের পর্দা থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, "বিষণ্ণতা লিখি না। যা দেখি, তাই লিখি।"
"তুমি কি মনে করো পৃথিবী এতটাই খারাপ?"
অরণ্য এবার তাকাল।
"না। পৃথিবী খারাপ নয়। মানুষ ভীষণ ক্লান্ত। ক্লান্ত মানুষ অনেক সময় অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।"
 প্রত্যুষা  কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
অরণ্যের এই কথাগুলোর পেছনে একটা দীর্ঘ ইতিহাস ছিল।
চার বছর আগে সে একটি বহুজাতিক নির্মাণ সংস্থায় হিসাবরক্ষকের কাজ করত। বেতন ভালো ছিল। শহরের একটি ঝকঝকে আবাসনে থাকত। বাবা-মাকে গ্রামের বাড়ি থেকে এনে শহরে রাখার স্বপ্ন ছিল তার।
তারপর একদিন হিসাবের খাতায় চোখে পড়ল অস্বাভাবিক কিছু সংখ্যা।
একটি সরকারি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ কয়েক কোটি টাকা। কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ। বাস্তবে সেখানে অর্ধেক কাজও হয়নি।
অরণ্য প্রথমে ভেবেছিল ভুল হয়েছে।
দ্বিতীয়বার ভেবে দেখল, ভুল নয়—পরিকল্পিত অন্ধকার।
সে অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে গিয়েছিল।
"স্যার, এই হিসাবটা একবার দেখবেন?"
অফিসার কাগজটা দেখে বলেছিলেন, "দেখেছি।"
"কিন্তু কাজ তো পুরো হয়নি।"
"সব কাজ চোখে দেখা যায় না।"
অরণ্য বুঝেছিল, কথাটার অর্থ।
সে বলেছিল, "আমি এই রিপোর্টে সই করতে পারব না।"
অফিসার চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
"অরণ্য , তুমি খুব সৎ ছেলে।"
এই প্রশংসার পরেই এসেছিল হুমকি।
"কিন্তু অতিরিক্ত সৎ মানুষদের সঙ্গে অফিস বেশিদিন চলতে পারে না।"
 
তিন সপ্তাহ পর অরণ্য চাকরি হারিয়েছিল।
তারপর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল—সে নাকি কোম্পানির গোপন নথি চুরি করেছে, ঊর্ধ্বতনদের মানহানি করেছে, নিজের স্বার্থে তথ্য ফাঁস করেছে।
অরণ্য প্রতিবাদ করেছিল।
কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের আদালতে সত্যের কোনো আইনজীবী থাকে না।
একটি মিথ্যে খবর কয়েক ঘণ্টায় হাজার মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। যারা তাকে চিনত না, তারাও মন্তব্য করেছিল—"লোকটা নিশ্চয়ই চোর।"
অরণ্য প্রথমে রাগ করেছিল।
তারপর অপমানিত হয়েছিল।
তারপর একদিন দেখল, সে আর কিছুই অনুভব করছে না।
মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর পরাজয় বোধহয় তখনই ঘটে, যখন অপমানও তাকে আর কাঁদাতে পারে না।
সেই সময় পাশে ছিল শুধু অনিরুদ্ধবাবু—অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, প্রতিবেশী।
এক রাতে অরণ্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অনিরুদ্ধবাবু বললেন, "ঘুমোওনি?"
"ঘুম আসছে না।"
"কী ভাবছ?"
"ভাবছি, আমি কি সত্যিই এত খারাপ?"
বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "তোমার সম্পর্কে অন্যেরা কী বলছে, সেটা নিয়ে এত ভাবছ কেন?"
অরণ্য মৃদু হেসেছিল।
"কারণ মানুষ একা থাকতে পারে না, স্যার।"
"ঠিক। কিন্তু মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একা হয়ে যাওয়া যায়।"
অরণ্য চুপ করে রইল।
"মনে রেখো," অনিরুদ্ধবাবু বলেছিলেন, "সমাজ কখনও কখনও অপরাধী তৈরি করে, তারপর সেই অপরাধীর বিচার করে নিজের বিবেককে শান্ত রাখে।"
কথাটা অরণ্যর মনে গেঁথে গিয়েছিল।
কিন্তু তারও সীমা ছিল।
একদিন সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিল সে। শহর থেকে অনেক দূরে, এমন কোনো জায়গায়, যেখানে কেউ তাকে চেনে না।
 
কিন্তু নদীর ধারে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার মনে হয়েছিল—পালিয়ে গেলে কি সত্যিই মুক্তি পাওয়া যায়?
মানুষ নিজের কাছ থেকে কোথায় পালাবে?
সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে আর নিজের জীবনকে অন্যের রায়ের হাতে তুলে দেবে না।
ছোট সংবাদপত্রে কাজ শুরু করার পর ধীরে ধীরে তার ভেতরের মানুষটি ফিরে এল।
একদিন সে শহরের উপকণ্ঠের একটি বস্তিতে গিয়েছিল। সেখানে আগুন লেগে কয়েকটি ঘর পুড়ে গিয়েছিল। ক্যামেরা নিয়ে অনেক সাংবাদিক এসেছিল। সবাই ছবি তুলছিল।
অরণ্য দেখল, এক কিশোর ছাইয়ের মধ্যে বসে একটি আধপোড়া স্কুলব্যাগ খুঁজছে।
অরণ্য জিজ্ঞেস করল, "কী খুঁজছ?"
ছেলেটি বলল, "আমার বই।"
"পেলে কী করবে?"
ছেলেটি মাথা তুলে বলল, "আবার পড়ব।"
অরণ্য থমকে গিয়েছিল।
একটি শিশুর কাছে জীবন তখনও এত সহজ—ঘর পুড়েছে, বই পুড়েছে, তবু আবার পড়তে হবে।
সেদিন রাতে অরণ্য একটি প্রতিবেদন লিখেছিল। কিন্তু প্রতিবেদনটি শুধু আগুনের খবর ছিল না। ছিল মানুষের আবার শুরু করার গল্প।
লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর বহু মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
 প্রত্যুষা  বলেছিল, "তোমার লেখায় আজ আলো আছে।"
অরণ্য হেসে বলেছিল, "আলো ছিলই। এতদিন আমি শুধু চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম।"
সময়ের সঙ্গে অরণ্যর পুরনো মামলাটিও নতুন মোড় নিল। তদন্তে প্রমাণিত হল, কোম্পানির দুর্নীতির অভিযোগ সত্যি। অরণ্য নির্দোষ।
যারা একসময় তাকে চোর বলেছিল, তাদের কেউ কেউ আবার সামাজিক মাধ্যমে লিখল—"আমরা তো জানতাম অরণ্য নির্দোষ।"
অরণ্য সেই পোস্টগুলো পড়ে হাসল।
 প্রত্যুষা  জিজ্ঞেস করল, "রাগ হচ্ছে না?"
"হচ্ছে না।"
"ক্ষমা করে দিলে?"
"ক্ষমা করেছি কি না জানি না। তবে তাদের নিয়ে আর ভাবি না।"
"এটাই কি তোমার জয়?"
অরণ্য জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, "জয় নয়। বেঁচে থাকা।"
সন্ধ্যায় সে আবার নদীর ধারে গেল।
আকাশে তখন মেঘ। নদীর কালো জলের ওপর ভাঙা আলো পড়েছে।
অনিরুদ্ধবাবুও সেখানে এসে বসেছিলেন।
"আজকাল তোমাকে অনেক বদলে গেছে মনে হয়," তিনি বললেন।
অরণ্য হাসল।
"আগে ভাবতাম, ভালো মানুষ হলে পৃথিবী আমাকে ভালোবাসবে। এখন বুঝেছি, পৃথিবী সব সময় ভালো মানুষকে ভালোবাসে না। তবু ভালো থাকা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।"
বৃদ্ধ শিক্ষক বললেন, "কেন?"
অরণ্য কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, "কারণ অন্যায়ের মতো ঘৃণাও মানুষকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলে। আমি দুটোতেই হারতে চাই না।"
দূরে একটি নৌকা যাচ্ছিল। অন্ধকার জলে তার ক্ষীণ আলো কাঁপছিল।
অরণ্যর মনে হল, জীবনও বুঝি এমনই—দূর থেকে ক্ষীণ, কাছে গেলে গভীর; কখনও শান্ত, কখনও উত্তাল। তবু তার ওপারে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠতেই হয়।
সে উঠে দাঁড়াল।
অনিরুদ্ধবাবু বললেন, "কোথায় যাবে?"
অরণ্য বলল, "বাড়ি। কাল একটা নতুন প্রতিবেদন লিখতে হবে।"
"কী নিয়ে?"
"যারা এখনও বিশ্বাস করে, তাদের নিয়ে।"
"কী বিশ্বাস করে?"
অরণ্য মৃদু্ হেসে বলল, "যে সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও জীবন শেষ হয় না।"
তারপর সে হাঁটতে শুরু করল।
পেছনে পড়ে রইল নদী। সামনে শহরের অসংখ্য আলো।
অরণ্য জানত, তার জীবন থেকে অপমান মুছে যাবে না। হারানো সময়ও ফিরে আসবে না। কিছু মানুষ তাকে ভুল বুঝবেই। কিছু দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ থাকবে।
তবু সে হাঁটছিল।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—জীবন মানে নিখুঁত হয়ে ওঠা নয়; ভেঙে যাওয়ার পরও নিজের ভিতর থেকে একটি ছোট্ট আলো খুঁজে নেওয়া।
যে মানুষ মৃত্যুভয়ের চেয়েও জীবনের প্রতি বেশি আস্থাশীল, তাকে পরাজিত করা কঠিন।
অরণ্য সেই কঠিন মানুষটিই হতে চেয়েছিল।
একজন নিখুঁত মানুষ নয়।
একজন জীবন-প্রেমিক।

শান্তা / শান্তা