“অন্ন ও অন্যায়” সুলেখা আক্তার শান্তা
নতুন অফিসে জয়েন করেছি। এই অফিসের সবকিছুই কেমন যেন একটু অগোছানো, আর তারমধ্যেই চালিয়ে যেতে হয় কাজ। এখানকার সবারই একটা আলাদা ভাব, নতুন কেউ আসলে তাকে তেমন একটা পাত্তা দিতে চায় না। তাদের ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে অফিসে আছে মানেই তারাই সব জানে এবং বোঝে। আমার সাথে কোনো দরকার না থাকলেও তারা নিজে থেকেই এসে অযথা কর্তৃত্ব খাটায়, এটা এভাবে না ওটা ওভাবে করতে হবে।’ যেন নতুন যে আসে, সে কিছুই জানে না বা বোঝে না। একটা আলগা দাপট দেখানোই তাদের স্বভাব, আর বিশেষ করে নারী কর্মী দেখলে তো কথাই নেই, ভাব দেখানোর মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
অফিসে বশির কর্মরত আছেন ম্যানেজার হিসেবে আর জামিল অফিস পিয়ন। তবে বশির ও জামিলের মধ্যে বেশ ভালো মিল। বশিরের কারো ওপর রাগ হলে সে তার বেতন আটকে দেয়। নানান অজুহাতে বলে, ‘এই মাসে একটু ঝামেলা আছে, বেতন দেওয়া যাবে না। কোম্পানি লসের মধ্যে আছে।’ এমনকি সে প্রকাশ্যেও বলে, ‘আমার সাথে লাগতে আসলে আমি তার বেতন আটকে দেবো।’ অফিসের বস তেমন একটা অফিসে বসেন না, আর অফিসের বেশিরভাগ দায়দায়িত্বই বশিরের ওপর ন্যস্ত। সেই ক্ষমতার দাপট সে অনেকের ওপরই প্রয়োগ করে এবং যখন যাকে ইচ্ছা চাকরি থেকে বাদ দিয়ে দেয়। অফিসের কাজের প্রয়োজনে কোনো কিছু দরকার হলে তাও সে সহজে দেয় না। ‘দেব, দেব’ বলে এক-দেড় মাস পার করে দেয়। সেই জিনিসটার কথা মনে করিয়ে দিতে গেলে উল্টো ধমক দেয়, ‘আরে ভাই, এককথা বারবার বলেন কেন? কাজে ব্যস্ত দেখেন না? দেবো তো বলেছি! যান যান, কাজ করুন।’ আবার কোনো কারণে যদি কাজের সমস্যা বা বিষয়টি বসের কানে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন তার সুর পাল্টে যায়। তখন বশির বলে, দেখছেন না কত কাজে ব্যস্ত আমি? অফিসের কাজের প্রতি আপনার কোনো মনোযোগই নেই! মনোযোগ থাকলে তো এই দরকারী জিনিসটার জন্য আমাকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে পারতেন!’ কত যে বাহানা তার!
এই অফিসে সবাই সবার পিছে লেগে থাকে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমি কাজের কথা ছাড়া কারো সাথেই পারতপক্ষে কথা বলি না। তবে রাতুল আমাকে দেখলেই খুব প্রাণোচ্ছ্বল ভাবে বলে, ‘আপু, কেমন আছেন?’ ‘হ্যাঁ ভালো, তুমি?’ ‘আমিও ভালো।’
রাতুল, জামিলসহ আরও কয়েকজন এই অফিসেই থাকে এবং রান্না করে খায়। সবার সাথে সবার মোটামুটি বনিবনা থাকলেও জামিলের সাথে এদের কারোরই মিল হয় না। রান্নাবান্না ও খাওয়া-দাওয়া নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগে। জামিল বয়সের দিক থেকে এদের চেয়ে অনেক বড়, কিন্তু দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানে থাকার প্রভাব সে এদের ওপর খাটায়। জামিল কখনো রান্না করতে চায় না, তার কথা হলো ‘আমি রান্না করব কেন? তোরাই রান্না করবি, বাজার করবি, আমি এসব পারব না! আর শোন, তোরা বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু খাবারের টাকা আটকে দেবো!’ ‘কেন, আপনি টাকা আটকে দেবেন কেন? আমরা কি আপনার টাকায় খাই নাকি পরি?’ ‘কী! এত বড় কথা?’ রেগে গিয়ে জামিল বশিরকে বলে, কয়েকদিন যেন ওদের বাজার খরচের টাকা না দেওয়া হয়। ‘তাহলে বাজার চলবে কেমনে?’ ‘চলবে কেমনে, সেটা পরে দেখা যাবে। আগে তো ওদের একটু শায়েস্তা করে নেই! এতে ওদের তো কষ্ট হবে, তখন দেখব মজা?’
রাতুল বশিরকে গিয়ে বলে, ‘তিন দিন ধরে বাজার করা হয় না, আমরা খাচ্ছি কী, পরছি কী তার কি আপনারা কোনো খোঁজ নেন?’ ‘কেন, বাজারের টাকা তো তোদের দেওয়া হয়েছে।’ অথচ বাজারের টাকা আসলে জামিলের কাছেই রয়ে যায়।
এটার একটা সমাধান দরকার। উনার কাছে টাকা থাকলে উনি বাজার করবেন না, আর আমরা না খেয়ে থাকব, এর চেয়ে বরং উনাকে আলাদা টাকা দেওয়া হোক আর আমাদের আলাদা। উনি আমাদের বাজারের টাকা নিজের কাছে রেখে দেবেন আর আমরা না খেয়ে থাকব, তার চেয়ে উনি আলাদা থাকলেই ভালো।
এই কথা শুনে জামিল খুব ক্ষেপে যায়। সে বলে, ‘শোনো বশির, আমি এখানে দীর্ঘ বছর ধরে আছি। বসও আমাকে খুব ভালো করে চেনে। ওরা আমার সাথে এরকম করলে আমিও ওদের উপযুক্ত শিক্ষা দেবো!’
এরপর থেকে সিদ্ধান্ত হয় রাতুলদের সাথে জামিল আর খাবে না। রাতুলদের সপ্তাহের টাকা সপ্তাহে দিয়ে দেওয়া হয় ঠিকই, তবে অফিসগতভাবে বাজারের জন্য যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ থাকে, তার চেয়ে দুই-এক হাজার টাকা কম দেওয়া হয়। রাতুল বশিরকে বলে, ‘ভাই, এভাবে কষ্ট দিলে তো কাজ করা যায় না! মানুষ কাজ করে খাবারের জন্য, পেটে যদি ঠিকমতো ভাতই না পড়ে, তবে কাজ করবে কীভাবে? মানুষকে এভাবে খাবারে কষ্ট দেওয়া কি ঠিক?’
রাতুলের এই কথা এসে পড়ে আমার কানে। এমন কথা শুনে আমার খুব খারাপ লাগলো। খাবারের মতো একটি মৌলিক প্রয়োজনের জন্য এত কাকুতি-মিনতি করতে হয় দেখে আমার হৃদয় কেঁপে উঠল।
জামিল গম্ভীর মুখে বলে, ‘কী রে রাতুল, তোদের কোথায় খাবার কষ্ট দেওয়া হচ্ছে? আমি কি আমার বাড়ি থেকে টাকা এনে দেবো? বস খাবারের জন্য যা দেয়, আমি তো সেটাই তোদের দেই।’ বশির আর জামিল তখন খুব আনন্দ নিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘এদের এমনই সাজা দিতে হবে, যাতে নিজেদের পকেটও গরম হয়! আর একটা কাজ করতে হবে গ্যাস শেষ হলে আর গ্যাস আনা যাবে না।’
দুই দিন ধরে রাতুলকে অফিসে দেখছি না। কী ব্যাপার, কোনো কাজে ব্যস্ত, নাকি বাড়ি গেছে? অফিস থেকে বাসায় ফিরছি, একটু সামনে যেতেই পেছন থেকে পরিচিত কন্ঠ ভেসে এলো ‘আপু!’ তাকিয়ে দেখি রাতুল দাঁড়িয়ে আছে। ‘আপু, আপনি তো আমার একটু খোঁজও নিলেন না!’ ‘আমি তো তোমাকে মনে মনে খুঁজছিলাম। তোমার কী হয়েছে?’ ‘আমার তো জ্বর, আপু।’ ‘ও ভাইয়া, তোমার জ্বর? ডাক্তার দেখিয়েছো?’ ‘না, ভাবছি বাড়ি গিয়েই ডাক্তার দেখাবো।’ ‘এই অসুস্থ শরীরে যেতে পারবে?’ ‘একটু কষ্ট হবে, তাও যাব। ছুটি বেশি একটা নেব না, দু-একদিন থেকেই আবার চলে আসব।’ ‘ঠিক আছে যাও, ঘুরে এসো।’
একদিন অফিসের বেসিনের কাপ-পিরিচ ধোয়ার সময় জামিল খুব আনন্দ নিয়ে অফিসের মুহিতের কাছে বলে, ‘খুব তো শিক্ষা দিয়েছি! কয়দিন ধরে না খেয়ে আছে!’ মুহিত শুধু জামিলের কথা শুনে যায়, নিজে থেকে কিছু বলে না। জামিল বলতে থাকে, ‘আমি কিরকম সাজা দিতে পারি, এবার তারা বুঝুক! গ্যাস বন্ধ করে দিয়েছি, গ্যাস ভরছি না। আরও কয়েকদিন গ্যাস ভরব না, একদম না খাইয়ে মারব! সাজা কাকে বলে, তা এবার টের পাবে!’ এই বলে সে খুব জোরে আওয়াজ করে হেসে ওঠে।
জামিলের এমন কথা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠল। কে না খেয়ে আছে, তা সে সরাসরি উল্লেখ করছে না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি সে কাদের শাস্তি দিচ্ছে। চোখের সামনে রাতুলের মলিন মুখটা ভেসে উঠল। রাতুল তো অসুস্থ! তার মানে কি ও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে বাড়িও যেতে পারেনি? আর এই অসুস্থ অবস্থায় ওকে না খাইয়ে রাখা হয়েছে? জামিল তো যথেষ্ট বয়স্ক একজন মানুষ, এই বয়সেও তার ন্যূনতম মানবিকতাবোধ কাজ করল না! সে তো কেবল কোনো সুস্থ মানুষকে নয়, একজন অসুস্থ মানুষকে না খাইয়ে শাস্তি দিচ্ছে।
এতেই বুঝতে পারলাম, যার যেখানে সামান্য ক্ষমতা থাকে, সে সেখানেই তার অপব্যবহার করে। তবে সবাই এমন নয়, হাতে গোনা কিছু মানুষই এমন নিষ্ঠুর আচরণ করে। হায় ক্ষমতা! অফিসের প্রতিষ্ঠাতা হয়তো জানেনই না তার কর্মীরা কোথায় কেমন আছে। তিনি হয়তো শুধু উপরস্থ কর্তাব্যক্তিদেরই খোঁজখবর নেন, আর সাধারণ কর্মীরা সাধারণই থেকে যান।
শান্তা / শান্তা
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
“সিগনেচার” সামছুল আলম শিমুল
“দিওয়ান-ই-শামস -ই তাবরিজি : জালালুদ্দিন রুমি ” এস ডি সুব্রত
“অন্ন ও অন্যায়” সুলেখা আক্তার শান্তা
“কাকতাড়ুয়া নাকি ভূত” আসাদ সরকার
“জীবন-প্রেমিক” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
“মেঘের এপিটাফ” জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
`ভাদ্র মাসের ভূত' শাহজালাল সুজন
‘নজরুল বর্ষ: কেবল একটি বর্ষপঞ্জি নয় মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের আন্দোলন’
`নজরুল জাতীয় জীবনের এক অনন্য আলোকবর্তিকা—সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নজরুল একাডেমির সভাপতি মসউদ মান্নান''
‘দুঃখ ভাঙার রূপকথা’ সুলেখা আক্তার সান্তা
‘শরৎ এলো’