ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

সুলেখা আক্তার শান্তা

“নসিবের খেলা”


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ৫-১১-২০২৬ রাত ১২:৩৫
ছেলের হাত ধরে দ্রুত পায়ে হাঁটছেন রেহেনা। “বাবা, আমাকে শক্ত করে ধরে হাঁটো,” ছেলেকে বললেন তিনি। ছেলেও মায়ের হাত শক্ত করে ধরে হাঁটতে লাগল।
হাসপাতালে ঢুকে একপাশে ব্যাগটা রেখে রেহেনা ছেলেকে বললেন, “জয়, বাবা তুমি এখানে বসে খেলো। একদম দুষ্টুমি করবে না, ঠিক আছে?” “ঠিক আছে, মা।”
রেহেনা নিজের কাজে লেগে পড়লেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নজর রাখছেন ছেলের দিকে। হাসপাতালের রোগীদের কাছে সে ভীষণ জনপ্রিয়; তিনিও মন-প্রাণ দিয়ে রোগীদের সেবা করেন। কদিন হলো ফারহানা নামের এক তরুণী সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তার পরিচর্যায় রেহেনা কোনো কমতি রাখছেন না।
ফারহানা একদিন আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, “খালা, তুমি যেভাবে আমার সেবা করলে, মনেই হলো না তুমি পর।” রেহেনা মৃদু হেসে বললেন, “যখন যাকেই সেবা করি, আপন-পর ভাবি না মা। আমি ভাবি, যে মানুষটির সেবার দায়িত্বে আল্লাহ আমাকে রেখেছেন, তাকে যেন পরিপূর্ণ সেবাটুকু দিতে পারি। তখন তাকে নিজের চেয়েও আপন মনে হয়।”
ফারহানা কিছু ফল এগিয়ে দিয়ে বললেন, “খালা, এগুলো তুমি খাও।” “না মা, তুমি খাও।” “আমি তো খাবই, কিন্তু যা আপনাকে দিচ্ছি, তা আপনাকে খেতেই হবে।”
ফলগুলো নিয়ে রেহেনা ছেলের কাছে এলেন। “জয় সোনা, এই নাও, বসে বসে খাও।” জয় অবাক হয়ে বলল, “মা, এত ফল কোথায় পেলে?” “ঐ যে, ওয়ার্ডের এক মা দিয়েছেন।” ছেলে ফলগুলো ঠেলে দিয়ে বলল, “মা, এই ফল আমি এখন খাব না। রেখে দাও, বাবার জন্য নিয়ে যাব।” রেহেনা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ওরে আমার সোনা বাবা! বাবার জন্য মন পুড়ছে?” “হ্যাঁ, মা।” “ঠিক আছে, তুমি একটা খাও, আর বাকিগুলো বাবার জন্য নিয়ে যাব। কালই তো আমরা মেডিকেলে যাব।”
পরদিন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মেডিকেলে স্বামীর কাছে যান রেহেনা। স্বামীকে যেখানে রেখে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি নেই। হাতে কোনো টাকা-পয়সা নেই, নেই কোনো চেনা পরিচিত প্রভাবশালী মানুষ। স্বামী ফরহাদ একের পর এক ব্যাধিতে আক্রান্ত—কিডনির জটিলতা, ডায়াবেটিস, রক্তশূন্যতা, হাড়ের ক্ষয় রোগ! একটা রোগের উপশম হতে না হতেই আরেকটা এসে চেপে বসে।
মেডিকেলের অলিগলি আর হাঁটার রাস্তায় রোগীদের ভিড়। অনেকে বারান্দায় শুয়ে-বসে আছে, ডাক্তাররা সেখানেই এসে চিকিৎসা দিচ্ছেন। স্বামীকে না পেয়ে অস্থির হয়ে রেহেনা এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে ছুটতে লাগলেন।
হঠাৎ ঢাকা মেডিকেলের এক নির্জন কোণে নজর গেলো তাঁর। দেখা গেলো, একটি লোক পুরনো কাঁথা মুড়ি দিয়ে কুঁজো হয়ে বসে আছে। রেহেনা এগিয়ে গিয়ে কাঁথাটি সরাতেই দেখতে পেলেন তাঁর স্বামী ফরহাদকে।
নিজের নিঃস্ব জীবনের প্রতি তীব্র এক হাহাকার জেগে উঠল রেহেনার বুকে। আজ স্বামীর পাশে থাকার সামর্থ্যটুকুও তাঁর নেই, করাতে পারছেন না সঠিক চিকিৎসা। কী নিষ্ঠুর ভাগ্য!
“তুমি এসেছ রেহেনা?” ফরহাদ ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন। “হ্যাঁ আসছি, কিন্তু তোমার জন্য কিছুই তো করতে পারছি না...” রেহেনার গলা বুজে এলো। “তুমি আর কী করবে? করার মতো কিছু আছে তোমার?” “একটা কাজ করি জয়ের বাবা, তার চেয়ে তোমাকে বাসায় নিয়ে যাই?” ফরহাদ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “না না, এখানেই থাকি। তাও তো মাঝে মাঝে ডাক্তারের দেখা পাই, একটু দেখে যান, আর সরকারি খাবারটুকু অন্তত জোটে। তবে তোমাকে রেখে এখানে একা পড়ে থাকলে মনটা সারাক্ষণ কেঁদে ওঠে। কিন্তু কী করবে বলো? নসিবে যা লেখা থাকে, তা তো সহ্য করতেই হবে।”
এ সময় জয় এগিয়ে এসে বলল, “বাবা! বাবা, তোমার জন্য ফল এনেছি।” ফরহাদের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল, “ফল এনেছিস বাবা? কোথায় পেলি?” রেহেনা বললেন, “হাসপাতালে একজন দিয়েছিল। তোমার ছেলে নিজে না খেয়ে বায়না ধরল—বাবার কাছে যাবে, বাবাকে ফল খাওয়াবে।” ফরহাদ মায়ামাখা দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবার জন্য মন খারাপ লাগে, বাবা?” “হ্যাঁ বাবা, তোমার জন্য খুব কষ্ট হয়।” “আয় সোনা, আমার কোলে আয়।” জয় ব্যাকুল হয়ে বলল, “না বাবা, কোলে নিলে তুমি ব্যথা পাবে।”
সন্তানকে কোলে নেওয়ার ভার কোনো বাবার কাছেই ভারী মনে হয় না—তা সে যত ওজনেরই হোক না কেন। ফরহাদের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
এমন সময় হাসপাতালের এক কর্মচারী এসে তাড়া দিলো, “রোগীর কাছ থেকে সরুন, ডাক্তার সাহেব আসবেন এখন।” ফরহাদ বললেন, “রেহেনা, তুমি থাকো। রোগীর কাছে অন্তত একজন তো থাকতে পারবে।” জয় বলল, “বাবা, আমি একটু সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি।” “না বাবা, এখানেই থাক।” “একটু সামনে যাই বাবা, ডাক্তার চলে গেলেই আবার আসব।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার এলেন ফাইল হাতে। “ফরহাদ সাহেব, আপনাকে কিছু পরীক্ষা দিয়েছিলাম, সেগুলো করিয়েছেন? রিপোর্টগুলো দিন।” ফরহাদ ভীত কণ্ঠে বললেন, “না স্যার, ওগুলো তো করানো হয়নি।” “করাননি মানে? পরীক্ষা না করালে চিকিৎসা করব কীভাবে?” ডাক্তার কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন। “আমার আর পরীক্ষার দরকার নেই স্যার...” ডাক্তার রেগে গিয়ে বললেন, “ডাক্তার কি আমি, না আপনি? যা বলব তা শোনেন না কেন? রোগ পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ার পর আপনারা ডাক্তারের কাছে আসেন, আবার পরীক্ষা করতে দিলে তা-ও করাবেন না! এই টেস্টগুলো দ্রুত করান।”
ডাক্তার চলে যেতেই রেহেনা মৃদু স্বরে বললেন, “তোমার এই পরীক্ষাগুলো কি করিয়ে ফেলব?” “না না, একদম না!” “এমন বলছ কেন? পরীক্ষা না করালে উনারা চিকিৎসা করবেন কীভাবে?” ফরহাদ তিক্ত গলায় বললেন, “আরে রাখো তোমার ডাক্তারের কথা! আজকাল পরীক্ষা করানো মানে এদের এক ধরনের ব্যবসা। পরীক্ষা করালে কমিশন পায়। রোগীর কষ্টের দিকে এদের নজর নেই, নজর শুধু কমিশনের দিকে। একজন গরিব মানুষ এত টাকা পাবে কই? আজ এই টেস্ট, কাল ওই টেস্ট! কোন পড়ালেখা উনারা করেছেন যে রোগী দেখে কিছুই বলতে পারেন না? টাকা আর প্রভাব থাকলে এই হাসপাতালেই একটা ভালো সিট পেতাম, তদবির চলত। এসব নিয়ে আর কথা বলো না রেহেনা, কথা বাড়ালে বিপদে পড়তে হবে।” “শোনো, যত কষ্টই হোক, পরীক্ষাগুলো করিয়ে নিই চলো।” “আমি বলছি তো, কোনো পরীক্ষা করাতে হবে না! একবার করালে আবার দেবে। বাঁচব না মরব তা-ও জানি না। যেদিন আল্লাহ ডাক দেবেন, চলে যেতে হবে। কপালে যা আছে তা-ই হবে। তুমি এখন ছেলেকে নিয়ে বাড়ি যাও।”
স্ব স্বামীকে এমন মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে মন চায় না, কিন্তু কোনো উপায়ও নেই। “জয় বাবা, এসো। বাবার কাছ থেকে বিদায় নাও।” জয় কান্নাকাটি করে বলল, “না মা, আমি বাবার কাছেই থাকব।” ফরহাদ ছেলেকে বুঝিয়ে বললেন, “না বাবা, তুমি এখানে থাকতে পারবে না। এখানে থাকার মতো পরিবেশ নেই। তার চেয়ে মায়ের সঙ্গে বাসায় যাও। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। বড় হয়ে ডাক্তার হও... তারপর আমার মতো যারা গরিব-দুঃখী আছে, তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা কোরো।” ভারাক্রান্ত মনে ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলেন রেহেনা।
কয়েকদিন পর। অফিস থেকে বাসায় ফিরছেন রেহেনা, সঙ্গে ছেলে জয়। ১০ নম্বর মোড়ে আসতেই দেখতে পেলেন এক তরুণ-তরুণী দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছে।
হঠাৎ মেয়েটি ধপ করে ছেলেটির গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো! চিৎকার করে বলল, “আমার জীবনে আর কী-ই বা বাকি আছে, যে তোর সাথে দরদাম করতে হবে? যা এখান থেকে, চলে যা!” ছেলেটি চরম উত্তেজিত হয়ে হাত তুলল, কিন্তু মারল না। হাতটা ধীরে ধীরে নামিয়ে নিলো।
জয় এগিয়ে গিয়ে বলল, “আঙ্কেল, ওনাকে মারবেন না।” ছেলেটি জয়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে বলল, “তুমি ছোট মানুষ, এখান থেকে চলে যাও।” মেয়েটি ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আমি আজ রাতেই মরে যাব, তোকে শান্তিতে রেখে যাব!”
রেহেনা শিউরে উঠলেন। মরে যাবে মানে! তিনি মেয়েটির কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “কী হয়েছে বোন? আমাকে একটু খুলে বলো?” মেয়েটি বেশ কর্কশ কণ্ঠে বলল, “আপনি যেদিকে যাচ্ছিলেন, সেদিকে যান!”
রেহেনা মনে মনে ভাবলেন, যেচে পড়ে কারও উপকার করতে যাওয়া ঠিক নয়। ছেলেকে বললেন, “চল বাবা, আমরা যাই।”
মা-ছেলে কিছুটা এগোতেই পিছন থেকে মেয়েটি ডাকল, “দাঁড়ান বোন!” রেহেনা ফিরে তাকালেন। মেয়েটি ছলছল চোখে বলল, “বোন, আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাবে? আমার আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।” “আমি তোমাকে কোথায় নিয়ে যাব বোন? আমার তো ছোট্ট একটা ঘর...” “আমি তো তোমার বোনের মতো, বোন হয়ে বোনকে ফেলে চলে যাবে?” রেহেনা থমকে দাঁড়ালেন, “ঠিক আছে, চলো তাহলে।”
যাওয়ার আগে এনা ফয়সালের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “তোমাকে আমি তিনটা দিন সময় দিলাম। এর মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবে তুমি কী করবে। তোমার সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে আমার বাঁচা-মরা।” ফয়সাল বিরক্ত হয়ে বলল, “এই মরার ভয় আমাকে দেখাবে না! কথায় কথায় 'মরে যাব, মরে যাব'—কী পেয়েছ তুমি? কোথা থেকে তুলে এনেছি তা একবার ভেবে দেখেছ? সেই ভয়টাই বারবার দেখাচ্ছ!” “ঠিক আছে, আমি আর এই ভয় নিয়ে বাঁচতে চাই না।” রেহেনা বাধা দিয়ে বললেন, “আহা, তোমরা মাথা ঠান্ডা করো। পরে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ো।
বাসায় এসে রেহেনা দ্রুত রান্নাবান্না বসালেন। এনা অবাক হয়ে বলল, “এত রাতে এখন রান্না করবে, তারপর খাবে?” রেহেনা হেসে বললেন, “হ্যাঁ বোন। তুমি খাবে না?” রান্না শেষ করে রেহেনা খাবার বেড়ে দিলেন। এনা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “না বোন, আমি খাব না।” রেহেনা জোর দিয়ে বললেন, “তোমার জন্যই তো কষ্ট করে রান্না করলাম। তা না হলে যেটুকু ভাত ছিল, আমার ছেলের হয়ে যেত। এত রাতে কাজ থেকে ফিরে রান্নার ভয়ে অনেক সময় আমি নিজেও না খেয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু আজ যখন রান্না করেছি, তোমাকে খেতেই হবে।” সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে নিলেন।
রাতে তিনজন একই বিছানায় শুয়েছেন। রেহেনা মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “ছেলেটি কে ছিল বোন?” এনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “ও আমার জীবন-মরণ...” “তোমার জীবন-মরণ?” “তাহলে শুনুন আপু... ওর সাথে আমার পরিচয় এক নরককুণ্ডে, বলতে পারেন দুনিয়ার সবচাইতে নিকৃষ্ট জায়গায়। সেখান থেকে ও আমাকে উদ্ধার করে দুই বছরের একটা চুক্তি করে। সে আমার বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া সব খরচ চালাবে। আশ্চর্যের বিষয়, এই দুই বছরে ও আমার শরীরের দিকে হাত বাড়ায়নি। দুই বছর পর আমি যখন চলে যেতে চাইলাম, ও বলল—'না, তোমাকে যেতে দেব না। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, তোমাকে আমার স্ত্রী বানাব।' আমি বলেছিলাম—যার কোনো নাম-পরিচয় নেই, মা-বাবা কিংবা ঘরবাড়ি নেই, তাকে কীভাবে বিয়ে করবে? ও বলেছিল—'তোমার পরিচয় আমি।' বলুন আপু, আকাশের চাঁদ যদি মাটির কাছে ধরা দেয়, তবে সেটা কি মাটির দোষ, নাকি চাঁদের? চাঁদেরই তো দোষ, সে কেন আকাশ ছেড়ে মাটিতে নামল! তা ছাড়া মাটিরও তো বোঝা উচিত ছিল—আকাশের চাঁদ আকাশেই মানায়, মাটিতে নয়।”
এনার কণ্ঠ বুজে এলো, “ও আমাকে কত স্বপ্ন দেখাল! আর আজ যখন আমার পেটে ওর সন্তান, তখন সে স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। আমার এই সন্তানের স্বীকৃতি কোথায়? আমি বলছি আমাকে বিয়ে করো, কিন্তু সে এখন বিয়ে করবে না। সে আমার অতীতের অন্ধকার ইতিহাস তুলে গঞ্জনা দিচ্ছে! এই কথা কি আগে তার মনে ছিল না? আমার নিষ্পাপ শিশুটার কী অপরাধ বলুন তো? বড়ই জটিল এই দুনিয়া!” রেহেনা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “এখন ঘুমিয়ে পড়ো বোন, কাল দেখা যাবে কী হয়।” “চোখে ঘুম আসে না আপু, তাও বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে ঠিক রাখতে হয়...”।
এনা ফয়সালকে তিনটি দিন সময় দিয়েছিল। আজ ছিল সেই শেষ দিন।
কয়েকদিন ধরে ফয়সালের দেখা না পেয়ে এনা আজ বাধ্য হয়ে তার মুখোমুখি হলো। ফয়সাল নির্দয়ভাবে বলল, “এনা, তুমি আমাকে মুক্তি দাও। আমি তোমাকে গ্রহণ করতে পারব না। তোমার প্রতি তীব্র ভালোবাসা ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসা কীভাবে যে কর্পূরের মতো উড়ে গেল, আমি নিজেও জানি না। সময় বদলায়, মানুষের মনও বদলায়।”
এনা ক্ষোভ আর হতাশায় ফেটে পড়ে বলল, “তুমি ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছ ফয়সাল! সময় বদলালেই যদি মন বদলে যেত, তবে একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর স্বামী-স্ত্রীরা সংসার করতে পারত না। যুগ যুগ ধরে যা হয়ে আসছে, তা হতো না।” ফয়সাল কটু হেসে বলল, “স্বামী-স্ত্রী! দারুণ একটা কথা বলেছ। কিন্তু তুমি আর আমি তো স্বামী-স্ত্রী নই। আর এখন তোমাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেব—এটা আমি ভাবতেই পারছি না।” “যা এখন ভাবতে পারছ না, তা আগে কেন ভেবেছিলে?” “সেটা আমার ভুল হয়েছিল!” “ভুল? বারবার ভুল করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? ঠিক আছে, আমার সন্তান যখন স্বীকৃতি পাবেই না, তখন আমার মতো সে-ও দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াক—তা আমি চাই না। ফয়সাল, তুমি থেকো তোমার অহংকার আর অভিজাত পরিচয় নিয়ে!”
কথাগুলো বলেই এনা ছিটকে গিয়ে সামনে দিয়ে দ্রুত গতিতে যাওয়া একটি চলন্ত গাড়ির নিচে ঝাঁপ দিলো!
মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ। এনার আলো চিরতরে নিভে গেলো। ফয়সাল বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড পর তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, “এনা—!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই সেখানে এসে হাজির হলেন রেহেনা। মর্মান্তিক এই দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে তিনি এনার কাছে ছুটে গেলেন, “এনা, কথা বলো বোন! এনা!”
রক্তাক্ত এনা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে রেহেনার দিকে হাত বাড়িয়ে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, “বোন... আমার ব্যাগে কিছু স্বর্ণালঙ্কার আর কিছু টাকা আছে... তুমি এটা নিয়ে নাও...”
এনার নিথর দেহের পাশে বসে রেহেনার চোখ ফেটে অশ্রু বেরিয়ে এলো। বিড়বিড় করে বললেন, “এসব দিয়ে আমি কী করব বোন? যেখানে মানুষের প্রাণেরই কোনো মূল্য নেই! হায়রে মানুষ! মানুষের আঘাতেই মানুষ ঝরে যায়, আবার মানুষের ভালোবাসাতেই মানুষ সুন্দর জীবন পায়। কার ভাগ্যকোটরে কী লেখা আছে, কে-ই বা তা জানে!”

শান্তা / শান্তা