সুলেখা আক্তার শান্তা
শিশুতোষগল্প “বর্ণাচ্ছন্ন নীরবতা”।
বিছানায় শুয়ে আছেন নীলিমা রহমান। চোখ দুটি সিলিংয়ের দিকে নিবদ্ধ, মনজুড়ে ভেসে বেড়ায় ছেলে-মেয়ে। কবে তারা দেশে ফিরবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। মন চাইলেও সামনাসামনি সন্তানদুটোর মুখখানা দেখতে পান না। আজকাল কী এক যুগ এসেছে—ভিডিও কলে মুখটা দেখলেই নাকি সব পাওনা মেটানো হয়ে যায়! কিন্তু এতে কি আর মায়ের তৃষ্ণার্ত বুকের শান্তি মেলে?
নীলিমা ভাবেন—চোখের সামনে দেখব ছেলে মেয়েকে, সামনাসামনি বসবে, নানাবিধ গল্প-আড্ডায় মেতে উঠবে ঘর। ওরা কথা বলবে, তিনি শুনবেন; উনি বলবেন, ওরা শুনবেন। চোখের সামনে হেঁটে-চলে বেড়াবে—তবেই না প্রাণের তৃপ্তি! কিন্তু দূর পরবাস ছেড়ে কবে যে ওরা আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ওদের বললে উত্তর আসে, "এখন কি আর ওখানে যাওয়া যায়!"
নিজের দেশের মাটি, নিজের দেশের মানুষ—এর গন্ধই যে আলাদা! কত মানুষ চেনা নেই, জানা নেই, তবুও কত আপন মনে হয় সবাইকে। সমবেত আনন্দের রেশ সবার হৃদয়ে একইভাবে তরঙ্গ তোলে। দলবেঁধে মানুষ কত জায়গায় ছুটে যায়, আনন্দ ভাগ করে নেয়—তা দেখেও কত শান্তি! নিজের দেশ আর দেশের মানুষের চেয়ে আপন আর কী-ই বা হতে পারে! তিনি মনে মনে প্রার্থনা করেন—সবাই ভালো থাকুক, সবার দুঃখ-কষ্ট মুছে যাক।
চোখ দুটো এবার জড়িয়ে আসে নীলিমার। আধা-ঘুমের ঘোরেও ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে—‘হায়রে ছেলে মেয়ে! তোদের ছাড়া এই একা একা দিনগুলো কীভাবে কাটে, তা কেবল আমিই জানি। তোরা তো বুঝবি না; বুঝলে কি আর মায়ের কাছে না এসে পারতিস? ভিডিও কলে দুটো কথা বলেই তোদের দায়িত্ব শেষ! চোখের যে তৃষ্ণা, রূপ ধরে দেখার যে আকুলতা—তা আর তোরা বুঝতে চাস না।’
ভোরের পাখির ডাকে আর ফজরের আজানে নীলিমা রহমানের ঘুম ভাঙে। যথারীতি নামাজ আদায় করেন। বাসার সামনে ছোট্ট একটুকরো খালি জায়গায় তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের ভালোবাসার বাগান। গাছে পানি দিচ্ছিলেন, এমন সময় কাজের ছেলে দুলাল এসে বলল, "খালাম্মা, আপনি কেন পানি দিচ্ছেন? দিন, আমি দিচ্ছি।"
নীলিমা মৃদু হেসে বললেন, "নিজ হাতে গাছের পরিচর্যা করার আনন্দই আলাদা রে দুলাল। গাছের সঙ্গে যতক্ষণ সময় কাটাই, দুশ্চিন্তাগুলো আমাকে আর ছুঁতে পারে না। ছেলে-মেয়ে দুটো সেই কোন দূর দেশে থাকে; একটা মুহূর্তের জন্যও ওদের ভুলতে পারি না। কিন্তু যখন ঘুমে থাকি আর যখন এই বাগানে থাকি—শুধু এই সময়টুকুই যা ওদের অনুপস্থিতির কষ্টটা ভুলে থাকা যায়।"
দুলাল জিজ্ঞেস করল, "খালাম্মা, সকালে কী নাস্তা বানাব?"
"প্রতিদিন যা বানাস তা-ই বানা। আর না হয় তোর যা মন চায় তা-ই কর।"
"ঠিক আছে খালাম্মা, আমি তাহলে ভিতরের কাজগুলো সেরে আসি।"
দুলাল ভেতরে চলে গেলো। নীলিমা তাকিয়ে দেখলেন, রাস্তা দিয়ে কয়েকটা ছোট বাচ্চা হেঁটে যাচ্ছে। ওরা থমকে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে। নীলিমা অমায়িক হেসে ডাকলেন, "এই যে দাদুভাইরা, এসো! আমার বাগানে এসো।"
বাচ্চারা সানন্দে ভেতরে চলে এলো। একজন আরেকজনকে দেখে বলতে লাগল, "বাহ্, কী সুন্দর ফুল!"
নীলিমা শুধালেন, "তোমাদের খুব ভালো লাগছে?"
বাচ্চারা একস্বরে বলে উঠল, "হ্যাঁ, খুব!"
ঠিক তখনই একঝাঁক হলুদ প্রজাপতি উড়ে এলো গাছে। বাচ্চারা একসাথে চেঁচিয়ে উঠল, "প্রজাপতি! ওই দেখো, প্রজাপতি!"
নীলিমা স্মৃতিকাতর কণ্ঠে বললেন, "আমাদের ছোটবেলায় কত হাজারো রকমের পাখি দেখতাম! গাছে উঠে দূরন্তপনা করতাম, সে কী আনন্দ! তোমরা তো আর সেসব পাও না। সেই খোলা মাঠ, প্রান্তর, পশু-পাখি আর বড় বড় গাছপালা—কালের বিবর্তনে সবই হারিয়ে যাচ্ছে। তবে হ্যাঁ, তোমরা যেমন প্রযুক্তির সুযোগ সুবিধা পাচ্ছ, আমাদের সময়ে আবার এসব ছিল না।"
এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বাচ্চাগুলো নীলিমা রহমানের কাছে আসতে শুরু করল। ওদের সাহচর্যেই তাঁর দিনগুলো বেশ কাটতে লাগল। ধীরে ধীরে দূরদেশে থাকা সন্তানদের না পাওয়ার যে তীব্র বেদনা হৃদয়ে জমাট বেঁধে ছিল, তা যেন কিছুটা ফিকে হতে শুরু করল। বাচ্চাদের তিনি কত শত রূপকথা ও জীবনের গল্প শোনান! ওদের জন্য ঘরে সব সময় কিনে রাখেন চকলেট আর আইসক্রিম। বাচ্চারাও নীলিমার ভালোবাসায় ডুবে থাকে।
একদিন নীলিমা ভাবলেন, বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও ঘুরে আসা যাক। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ! তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ওদের চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাবেন। সেখানে নিয়ে বিভিন্ন পশু-পাখির সাথে বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। নীলিমা রহমান বাচ্চাদের নিয়ে চিড়িয়াখানা যাচ্ছেন, বয়েসের ভারে তিনি নিজে বেশি হাঁটতে পারছিলেন না, কিন্তু শিশুদের এই প্রাণবন্ত আনন্দ তাঁর ভেতরেও নবজীবনের সঞ্চার করল; ক্লান্তি তাঁকে স্পর্শও করতে পারল না।
বাচ্চারা কৌতুহল নিয়ে একের পর এক পশুপাখির নাম জিজ্ঞেস করতে লাগল, আর তিনি ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিলেন। নীলিমা বাড়ি থেকে কিছু খাবার রান্না করে নিয়ে গিয়েছিলেন। একটা ছায়াঘেরা জায়গায় চাদর বিছিয়ে ডেকে বললেন, "এসো, এবার আমরা সবাই একসাথে বসে খাব।"
রুনা, বিনা, দিনা, রাতুল, অনিক আর পাভেল—সবাই গোল হয়ে বসে একসাথে খাওয়াদাওয়া ও গল্পে মেতে উঠল। গাছের ডালে বসে থাকা আর উড়ে চলা বুনো পাখিগুলোর দিকেও তারা খাবারের টুকরো ছিটিয়ে দিল। পাখিরাও ভয় ভেঙে নিচে নেমে এসে নিশ্চিন্তে খাবার খেতে লাগল। পাখির দল আর শিশুরা যেন একাকার হয়ে গেলো। নীলিমা রহমানের জীবনে আর কোনো একাকীত্ব রইল না; শিশুদের অনাবিল আনন্দে মেতে উঠেই তাঁর রঙিন দিন কাটতে লাগল।
হঠাৎ একদিন নীলিমা কঠিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শরীর এতোটাই দুর্বল যে বিছানা ছেড়ে ওঠার শক্তি নেই। খবর পেয়ে বাচ্চাগুলো ছুটে এলো। তাঁর দেখভাল, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া আর সেবা-শুশ্রূষায় কোনো কমতি রাখল না তারা। এতটুকু ছোট ছোট বাচ্চাদের এই অগাধ ভালোবাসা ও সেবা দেখে নীলিমা রহমান যেমন অবাক হলেন, তেমনই আবেগে আপ্লুত হলেন।
বাচ্চাদের ভালোবাসায় তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। সুস্থ হয়েই তিনি এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন। ভাবলেন, তাঁর এই বিশাল ভিটেমাটিতে কোনো ইট-কাঠের জঞ্জাল থাকবে না। তিনি নিজের বড় ঘরটি ভেঙে সীমানার এক কোণে ছোট্ট একটি ঘর তৈরি করলেন, আর বাকি পুরো জায়গা জুড়ে রোপণ করে দিলেন নানা জাতের গাছপালা—যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখান থেকে নির্মল বাতাস আর অক্সিজেন পেতে পারে।
তিনি এ-ও ভাবলেন, "আমি মরে গেলে কেউ এই জায়গাটা বিক্রি করে না দেয়!" তাই জমিটিকে একটি স্থায়ী ট্রাস্টের অধীনে দান করে দিলেন।
তিনি মনে মনে ভাবতেন, "সব জায়গায় যদি শুধু দালানকোঠা আর ইট-কাঠের বাড়ি ওঠে, তবে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে সুন্দর ও সতেজ প্রকৃতি দরকার, তা কোথায় পাবে? দিন দিন জায়গা জমির যে সংকট হয়ে পড়ছে, গাছপালা না থাকলে তো পশু-পাখিরাও একদিন হারিয়ে যাবে। তাই প্রকৃতিকে রক্ষা করতেই আমাদের প্রচুর গাছ লাগাতে হবে।"
আজ নীলিমা রহমানের সেই জায়গাটি এক সবুজ অরণ্যে পরিণত হয়েছে। বাতাসে পাতাদের মর্মর ধ্বনি আর পাখির কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে এই অপরূপ সবুজ দেখতে। সবাই নীলিমা রহমানের এই মহতী উদ্যোগের প্রশংসা করে বলে, "আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত আগামী প্রজন্মের কথা ভাবা। তারা যেন একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবীতে শ্বাস নিতে পারে, সেজন্য আমাদের বেশি বেশি গাছ লাগানো এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করা উচিত।
শান্তা / শান্তা
শিশুতোষগল্প “বর্ণাচ্ছন্ন নীরবতা”।
“সিগারেট” তাহেরা আফরোজ
রুনু রুপুর গ্রামের বাড়ি
“বিষের ছায়া মায়ার অরণ্য”
“বৈচিত্র্যময় মাদারীপুর”
পুঁথির পুনর্জাগরণের
“বিরতি” স্মরণিকা চৌধুরী
“অনিন্দ্যর জন্য আকুলতা” জা কি র আ জা দ
“মাটির সুবাস ও আধুনিক নবান্ন” আব্দুল কাদের
“আতঙ্কের ছায়া” হানিফ রাজা
সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্মার্ট শিল্পকলা গড়তে চান রেজাউদ্দিন স্টালিন
শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর-এর ১৪টি ছোটকাকু প্রকাশিত
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
Link Copied