ঢাকা বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

এস আর শাহ্ আলম

স্কেটিং জুতা


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩-১১-২০২৬ রাত ৯:২১

রিকশার চাকা ঘুরলেই সংসারের চাকা একটু একটু করে ঘোরে। তাই চল্লিশ পেরোনো রহমত আলির শরীর যতই ক্লান্ত হোক, প্যাডেল থামে না।সারাদিন রিকশা চালিয়ে যে কটা টাকা হাতে আসে, তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে। নিজের জন্য তার কোনো চাওয়া নেই। পুরোনো লুঙ্গি, ছেঁড়া গামছা আর জীর্ণ স্যান্ডেলেই অভ্যস্ত সে। তার সমস্ত স্বপ্ন একমাত্র ছেলে তপনকে ঘিরে।তপন এবার দশম শ্রেণিতে উঠেছে। ছেলেটা পড়াশোনা করে বড় হবে, চাকরি করবে এই স্বপ্নটুকু বুকে নিয়েই রহমত আলি প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রিকশা চালায়। মাঝে মাঝে ক্লান্ত চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে আর কটা বছর। তারপর আর রিকশার প্যাডেলে পা রাখতে হবে না। পায়ের ওপর পা তুলে বসে ছেলের উপার্জনে জীবনটা কাটিয়ে দিবে। এক সন্ধ্যায় তপন বলল, - বাবা, আমার স্কেটিং জুতা লাগবে। আমার বন্ধুরা সবাই কিনেছে।বাবা অবাক হয়ে তাকাল। —হেইডা আবার কী জুতা রে বাজান?

- নিচে চাকা ওয়ালা জুতা।

- ও আইচ্ছা, দাম কয় টাহা?

- দুই হাজার।

দুই হাজার!শব্দটা যেন তার বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আটকে রইল। তারপরও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, - আইচ্ছা, দিমু।

সেই রাতে স্ত্রী বলল, - হুনো, তুমার লুঙ্গিটা আর কত সিলাই করুম? গামছাটাও তো মাঝখান দিয়া ছিঁইড়া গ্যাছে। রহমত আলি গামছাটা হাতে নিয়ে হেসে বলল, - গামছাটা একটু সুই দিয়া টান দিয়া দ্যাও।স্ত্রী এবার অভিমান করে বলল,- গামছা সিলাই কইরা ব্যবহার করন ঠিক না। নতুন একটা লইয়া আইসো?রহমত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, —এহন না। ছাওয়ালের জুতা আগে কিনি গামছা পরে কিনমু।

পরদিন থেকে তার রিকশার প্যাডেল যেন আরও দ্রুত ঘুরতে লাগল। প্রতিদিন পাঁচশ টাকা করে জমায়। চতুর্থ দিনের বিকেলে বুকপকেটে দুই হাজার টাকা নিয়ে সে ছেলের স্কুলের পথে রওনা দিল স্কুল থেকে তপনকে সাথে নিয়ে জুতা কিনতে যাবে। রাস্তার পাশে রিকশার চাকা ঘুরছিল। তার চোখের সামনে তখন নতুন স্কেটিং জুতা-পরা তপন বন্ধুদের সাথে খেলছে আর হাসছে। হঠাৎ একটি বিকট শব্দ।তারপর থেমে গেল একটি রিকশার চাকা।মানুষজন ছুটে এলো। রাস্তার ধারে পড়ে রইল রহমত আলি। বুকপকেট থেকে বেরিয়ে এল কুঁচকে যাওয়া দুই হাজার টাকা।সেদিন তপনের স্কুলের গেইটের সামনে যাওয়া হলো না! এবং স্কেটিং জুতাও কেনা হলো না।

বাড়িতে ফিরল শুধু বাবার নিথর শরীর।আর ঘরের এক কোণে পড়ে রইল সেই ছেঁড়া গামছা।

যে গামছাটায় আর কোনোদিন সেলাই লাগবে না।

 

 

 

শান্তা / শান্তা