“কাকতাড়ুয়া নাকি ভূত” আসাদ সরকার
আনাস একজন মেধাবী ছাত্র। সবেমাত্র প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। পাড়ার অন্য ছেলেদের থেকে একটু ভিন্ন। রাস্তা দিয়ে মুরুব্বি দেখলে সালাম দিতে কখনো ভুল করে না। তার বয়সে ছোটদের নিয়মিত সালাম দেয়। পাড়ার বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করতে বেশি পছন্দ করে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করে।
আনাসের বাবার নাম নির্ঝর সরকার। গ্রামের একজন ক্ষুদে কৃষক। আনাসের বাবার জমির পরিমাণ এক বিঘে। এই জমিতে কখনো গম, কখনো কখনো ধান চাষ করে। জমির পাশাপাশি বাড়িতে দুটি গাভী পালন করে। আনাস স্কুল থেকে এসে দুপুরের খাবার শেষ করে গাভীর খাবার আনতে কাস্তে হাতে মাঠে ছুটে যায়। স্কুল বন্ধের দিনে বাবার সাথে মাঠে কৃষিকাজ করে।
নির্ঝর সরকার সারাদিন পরিশ্রম করে। কিন্তু সংসারের অভাব দূর হয় না। জমিতে পরিশ্রম করে ঠিকই, কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে পারে না। কখনো খরায় ফসল নষ্ট হয়ে যায়, আবার ইঁদুরে অথবা বাদুড়ের ফসল নষ্ট করে ফেলে।
একবার জমিতে ভালো গমের ফলন হয়েছে। সবাই বলতে লাগল, এবার বুঝি নির্ঝর সরকারের কপাল খুলবে। নির্ঝর সরকারের মুখেও মিষ্টি হাসি। কিন্তু গম পাকার আগেই ইঁদুরের হানা। প্রতিদিন রাতে কেটে কেটে পুরো জমির ফসল নষ্ট করে ফেলেছে।
নির্ঝর সরকার ছেলে বুকে ধরে কাঁদতে শুরু করল।
নির্ঝর সরকার— বাবা, মহান প্রভু হয়তো কোনো দিন আমাদের দিকে চোখ খুলে তাকাবেন না। তিনি যাদের প্রচুর অর্থ-সম্পদ আছে, তাদের আরও দেন।
আনাস সরকার— বাবা, এভাবে বলতে নেই। আল্লাহ অখুশি হবেন। আর আল্লাহ অখুশি হলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। আমরা এখনো বেঁচে আছি মহান রবের কৃপায়। মহান রাব্বুল আলামিন হয়তো আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন। আমরা একদিন পরীক্ষা পাস করব।
ছেলের কথা শুনে নির্ঝর সরকারের চোখে জল চলে এসেছে। কোথায় আমি ছেলেকে সান্ত্বনা দেব, উল্টো ছেলে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। খেয়ে না খেয়ে কষ্টে ছেলে-মেয়ে নিয়ে দিন কাটাচ্ছে নির্ঝর সরকার।
পরের বছর আবার জমিতে গম চাষ করেছেন। এবার ভালো গমের ফলন হয়েছে। কিন্তু এ বছরও ইঁদুর ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে। এবারও ফসলের আশা ছেড়ে দিয়েছে আনাসের বাবা।
হঠাৎ আনাস একদিন রাতে কাকতাড়ুয়ার গল্প পড়ছে। কিন্তু গল্প পড়ে কিছু বুঝতে পারছে না। মাথায় কোনো কাজ করছে না। আসলে কাকতাড়ুয়া কী? মনে মনে প্রশ্ন। কাকতাড়ুয়া সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ জাগছে মনে।
রাতে ঘুমানোর আগে আনাস বাবাকে জিজ্ঞাসা করল,
আনাস— বাবা, কাকতাড়ুয়া কী?
নির্ঝর সরকার— কাকতাড়ুয়া হলো ক্ষেতের মধ্যে খড়, বাঁশ, পুরোনো কাপড় ইত্যাদি দিয়ে মানুষের মতো করে বানানো একটি পুতুল বা কাঠামো।
আনাস— এটি কেন বানায়?
নির্ঝর সরকার— কাক, চিল, ইঁদুর, বাদুড় ও অন্যান্য পাখিকে ভয় দেখিয়ে ফসল রক্ষা করার জন্য। ধান বা গমক্ষেতে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো জামা-পরা খড়ের মানুষটিকে দেখে পাখিরা ভয় পেয়ে কাছে আসে না—এটাই কাকতাড়ুয়া।
আনাস— বাবা, আমাদের জমিতে কাকতাড়ুয়া বানিয়ে দিলে কেমন হবে?
বাবা— বাহ্! বেটা বাহ্! দারুণ আইডিয়া! এটাতো আমার মাথায় ছিল না। কালকে বানিয়ে দেব।
আনাসের বাবা সকালে ঘুম থেকে উঠে দুটি কাকতাড়ুয়া বানিয়ে ক্ষেতের দুই মাথায় দুটি লাগিয়ে দিল।
পরের দিন ক্ষেতে গিয়ে দেখে, কোনো কাজ হয়নি। আগের মতোই হচ্ছে। কিন্তু আনাসের বাবা আশা ছাড়েনি। পরের দিন একটি কাঁসের থালার সাথে একটি লোহার টুকরো বেঁধে দিয়েছে। হালকা বাতাস আসলে একটু টুনটুন শব্দ হয়।
পরের দিন ক্ষেতে গিয়ে দেখে, বেশ কিছু ইঁদুর মরে পড়ে আছে। নির্ঝর সরকার একটু ভয় পেয়ে গেল। কাকতাড়ুয়া তো ইঁদুর মারার কথা না।
কেমন একটা অদ্ভুত রহস্য!
পুরোই রহস্য মনে হচ্ছে। কাউকে কিছু না বলে নিজে নিজে ভাবতে লাগল। আসলে কি কাকতাড়ুয়া ইঁদুরগুলোকে মেরেছে? নাকি অন্য কিছু?
সারারাত এই চিন্তা করতে করতে ঘুম চোখ থেকে পালিয়ে গেল।
পরের দিন সকালে গিয়ে দেখে, অনেকগুলো বাদুড় মরে পড়ে আছে। রহস্য আরও গভীর হতে যাচ্ছে। আসলে কী ঘটছে?
নির্ঝর সরকার কাকতাড়ুয়ার কাছে গিয়ে ভালো করে দেখতে লাগল। আর মনে মনে বলতে লাগল, আমি যেমন বানিয়েছি, তেমন তো আছে।
সেই খড়-কুটো, গাছের মরা ডাল, ভাঙা মাটির পাতিল। পাতিলে হালকা চুন।
কিন্তু?
নির্ঝর সরকার ভাবল, আজকে রাতে ক্ষেতে গিয়ে দেখি। আসল রহস্য কী?
সবাই যখন ঘুমের ঘরে, তখন নির্ঝর সরকার চুপিচুপি ক্ষেতের দিকে রওনা হলো। অনেক অন্ধকার। মৃদু বাতাস, হালকা কুয়াশা। নির্ঝর সরকার ক্ষেতের পাশে চুপটি করে বসে রইল।
হঠাৎ দেখে, কাকতাড়ুয়া হাঁটতে শুরু করল। জমিতে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের জঙ্গলবাড়ির দিকে যাচ্ছে। নির্ঝর সরকার পিছনে পিছনে কোনো শব্দ না করে যেতে শুরু করল।
জঙ্গলবাড়িতে গিয়ে কাকতাড়ুয়া বিশাল বটগাছের নিচে আসন পেতে বসছে। নির্ঝর সরকার সবকিছু আড়াল থেকে দেখছে।
অল্প সময়ের ব্যবধানে আরও কিছু কাকতাড়ুয়া এসে বটবৃক্ষের নিচে বসছে। একটি কাকতাড়ুয়া অনেকগুলো বাদুড় ধরে নিয়ে আসছে। সবগুলোই মৃত।
একজন জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, আপনার বাদুড়ের সাথে এত কিসের রাগ?
নির্ঝর সরকারের ক্ষেতের কাকতাড়ুয়া বলল, বাদুড় আমার গাছের সব ফল খেয়ে ফেলেছে। সেই শোকে আমি আত্মহত্যা করি। আজ আমি পেতাত্মা হয়ে ঘুরে বেড়াই। মরা মানুষের মাংস খাই।
এই কথা শুনে নির্ঝর সরকার কাঁপতে শুরু করল। পরনের লুঙ্গি নষ্ট প্রায়।
হঠাৎ তার পাশে গাছের একটি মরা ডাল ভেঙে পড়ল। নির্ঝর সরকার ভয়ে জোরে চিৎকার দিল। কাকতাড়ুয়া দল এসে ধরে বটগাছে নিয়ে গেল।
নির্ঝর সরকার চেয়ে দেখে বড় বড় চোখ। হাতের একেকটি নখ যেন একটি বাঁকা কাস্তে। দাঁতগুলো লম্বা—একেকটি কোদালের মতো।
নির্ঝর সরকারকে ধরে নিয়ে বলল,
কাকতাড়ুয়া— প্রতিদিন মৃত প্রাণীর মাংস খাই। আজ জীবনে প্রথম জীবিত প্রাণীর মাংস খাব।
কথা শুনে নির্ঝর অজ্ঞান হয়ে গেছে। আর কিছু বলতে পারবে না।
রাতে আনাস ঘুম থেকে উঠে দেখে, বিছানায় বাবা নেই। আনাস দ্রুত মাকে ডাকতে লাগল। আনাসের মাও ভয় পেয়ে গেল।
বাড়ির সবাইকে ডেকে খুঁজতে লাগল। সবাই লাইট, হারিকেন নিয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেল না।
হঠাৎ আনাসের মনে হলো জমির কথা। সবাইকে নিয়ে বাড়ির কাছে জমিতে গেলে। গিয়ে দেখে, বেহুঁশ হয়ে ক্ষেতে আইলের পাশে পড়ে আছে।
সবাই ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে গেল। কিন্তু কোনো হুঁশ নেই। সারা রাতের মধ্যে হুঁশ ফিরে এলো।
ফজরের নামাজের পরে দুটি চোখ খুলল, কিন্তু কিছুই বলতে পারে না। বাড়িতে কবিরাজ এনে চিকিৎসা করার পর কথা বলতে শুরু করল।
সবার সাথে ঘটনা বর্ণনা করল। নির্ঝর সরকারের কাছ থেকে ঘটনা শুনে সবাই ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। আনাসাও বাবার পাশে বসে সব কথা শুনলো।
অনেক চুপ থেকে বাবাকে প্রশ্ন করে
আনাস-বাবা কাকতাড়ুয়া কি সত্যি হাঁটে?
বাবা- সত্যিই হাঁটে,
আনাস- রাতে অন্ধকারে তোমার ভুল হতে পারে।
না, বাবা ভুল হবে না, তারা আমার সাথে কথা বলেছে। তুমি আর আমি নিজ হাতে কাকতাড়ুয়া বানিয়ে ক্ষেতে দিলাম। তুমি এসব বুঝবে না। বড় হলে বুঝবে। আনাস ভদ্র ছেলের মত চুপ হয়ে গেল।
শান্তা / শান্তা
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
“সিগনেচার” সামছুল আলম শিমুল
“দিওয়ান-ই-শামস -ই তাবরিজি : জালালুদ্দিন রুমি ” এস ডি সুব্রত
“অন্ন ও অন্যায়” সুলেখা আক্তার শান্তা
“কাকতাড়ুয়া নাকি ভূত” আসাদ সরকার
“জীবন-প্রেমিক” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
“মেঘের এপিটাফ” জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
`ভাদ্র মাসের ভূত' শাহজালাল সুজন
‘নজরুল বর্ষ: কেবল একটি বর্ষপঞ্জি নয় মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের আন্দোলন’
`নজরুল জাতীয় জীবনের এক অনন্য আলোকবর্তিকা—সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নজরুল একাডেমির সভাপতি মসউদ মান্নান''
‘দুঃখ ভাঙার রূপকথা’ সুলেখা আক্তার সান্তা
‘শরৎ এলো’