ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

“বিরতি” স্মরণিকা চৌধুরী


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭-১০-২০২৬ দুপুর ৩:১০

উফ্, একটু জোড়েই বুঝি সামনের দিকে পা চালিয়ে সিঁড়ি ভাঙছিলাম মনে হয়, তৎক্ষনাৎ পিছন থেকে ছেলের ডাক শুনতে পেলাম,
 ধীরে পা ফেল মা, 
এক সেকেন্ডের জন্য মনটা থেমে গিয়ে স্থির হয়ে গেলাম, আসলেই তো বয়স হয়েছে , সেই সময় কি আর আছে? 
আসলে, অনেক দিন পরে ঘর থেকে বের হয়েছি, অসুখের কারণে এক প্রকার ঘর বন্দী হয়ে আছি, চাইলেই যেখানে সেখানে যাওয়া বারণ। 

ছয় তলা সিঁড়ি বেয়ে নেমে একটু হাঁপিয়ে উঠছিলাম, কিন্তু বাসার গেইট পার হওয়ার পরেই মিষ্টি শীতের আমেজ শরীরে ঝাপটা দিয়ে গেল। ভাদ্র মাস শেষ হয়ে আশ্বিন মাসের আজ মাত্র ১০ তারিখ। শীতের জন্ম হয়েই গেল। ক্ষনিকের জন্য শরীরে শিরশির হালকা বাতাস মনকে প্রফুল্ল করে দিল। 

ইতিমধ্যে ছেলে অনিক টেক্সি ঠিক করে ফেলেছে। 

দুজনে বাক্স পেঁটরা নিয়ে টেক্সিতে বসে পড়লাম। 
বাতাসে আমার চুলগুলো কিছুটা উড়ছিল। ছেলে অনুযোগ করে বসলো,

 একটা চাদর নিলে না কেন, ঠান্ডা লেগে যাবে তো 

আমি কিছু আর বললাম না, চাদরটা ব্যাগের মধ্যেই আছে। ট্রেনে উঠলে বের করবো। 

বাচ্চাদের মতো চারপাশ দেখে দেখে স্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম। কতো চেনা পথ, কতো জীবনের গল্প এই রাস্তায় জমা আছে তা শুধু আমার মন জানে, কিছুটা ভাবুক হয়ে গিয়েছিলাম, অনিকের ডাকে সম্বিত ফিরলো 
মা, পৌঁছে গেছি স্টেশনে, নামো এবার। 

আমি একটু লজ্জিত হলাম ছেলের উচ্চ স্বরে, কারণ 
ছেলে মনে হয় দু তিনবার এই কথাটি উচ্চারণ করেছে, যা আমি অন্য মনষ্কের জন্য শুনতে পাইনি। 

সঠিক সময়েই ট্রেন ছাড়লো। জানালার পাশে বসে আমি উন্মুখ হয়ে শহরের ভোর দেখছিলাম। এখনো নগরবাসিদের সকাল হয়নি, মাত্র সকাল সাতটা বাজে,যানবাহনও হালকা ভাবে এদিক ওদিক যাচ্ছে, 
তবে গার্মেন্টসের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে এমন নারী খুব বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। এদের কথা ভাবলেও বুকের ভিতরে একটা চিনচিন ভাব অনুভব করি। কেন করি তার উত্তর কখনো খুঁজে পাইনি। হয়তো আমিও মেয়ে বলে। সারাদিন গাধার মতো গার্মেন্টসে খাটুনি খেটে সেই রাত আটটা, নয়টায় বাসায় ফিরে রান্নাবান্না ঘর সংসার সামলিয়ে হয়তো ঘুমাতে ঘুমাতে একটা হয়ে যায়, এরপর আবার সকালে উঠে দৌড় ঝাঁপ শুরু। তবুও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা মেয়েদেরকে এই গার্মেন্টস এনে দিয়েছে বলে স্বল্প শিক্ষিতা এই মেয়েরা 
গার্মেন্টসে চাকরি করে সুখী হওয়ার চেষ্টা করে। 

ট্রেন এখনো শহরের পথ পেরোইনি, রেল লাইনের পাশে ঝুপড়িতে বসবাস করা মানুষ গুলো দেখে দেখে কত কিছুই ভাবছিলাম, ওদেরকে দেখলেই নিজেকে অনেক সুখী মনে হয়, ওরা কত কষ্ট করেই জীবন পার করে, আর আমরা দালান কোঠায় থেকে ও মনের মাঝে হাজারও না পাওয়ার বেদনা পুষে রেখে বহু কষ্টে জীবন যাপন করছি এমন একটা ভাব নেই।  আসলে তো মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই, একটা চাওয়া শেষ হলেই আরও কিছু পাওয়ার জন্য মনটা আকুলিবিকুলি করতে থাকে, আর না পেলে মনে হয় জীবনটাই বৃথা। 

চট্রগ্রাম থেকে ঢাকা যাচ্ছি মেয়ের বাসায়। সপ্তাহ খানেক থাকা লাগবে। ডাক্তার অনেক টেস্ট দিয়েছে, আমার কি অসুখ হয়েছে তা অনেক টেস্ট করার পরেও ধরা না পারার কারণে  এবারের কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা ঢাকা থেকেই করার জন্য বলেছেন। 
সেই উপলক্ষে ঢাকা যাওয়া। মেয়ের সাথে দেখা হচ্ছে না তিন চারবছর হয়ে গেল। মেয়ে বাচ্চা আর চাকরি নিয়ে মহা ব্যস্ত থাকে, চাইলেও সে চট্রগ্রাম আসতে পারে না, এদিকে ছেলেও সময় পায় না নানা কাজের জন্য , তাই ভাই বোনেরও দেখা সাক্ষাৎ একদম কম বলা চলে, তবে বর্তমান মিডিয়ার যুগে ভিডিও কলে কথা বলা যায় বলে দেখা না হওয়ার কষ্ট কিছুটা হলেও কম মনে হয়। 

আজ কি যে হইছে আমার, কত কথাই মনে পড়ছে। কখন যে ট্রেন গ্রামের ছবি চোখের সামনে আঁকা শুরু করে দিয়েছে নিজেই আনমনে ছিলাম বলে বুঝতে পারিনি। ঝিকঝিক করে ট্রেনের এই শব্দটাও ভীষণ ভালো লাগে। নিজের হারনো সব ছন্দ যেনো আবার মনের মাঝে পুরানো দিনের গানের সাথে বেজে ওঠে। হাহা, কি আশ্চর্য! গুন গুন করে মনে মনে দেখি গান গেয়ে উঠলাম। ছেলে যে আমার পাশে বসা বেমালুম ভুলে গেলাম, ভাগ্যিস মুখটা আমার অনেকটা বাহিরের দিকে, এবং ট্রেনের শব্দে ছেলে আমার গান গেয়ে উঠা শুনতে পায়নি। 

কতক্ষণ যে নিজের মধ্যে ছিলাম মনে নেই, সবুজ গাছ গাছালী, বিল ঝিল, মাঠের মধ্যে কৃষকদের ধান রোয়া, আরও নানা কিছু দেখে দেখে সময় যখন তড়তড় করে যাচ্ছিল তখন দেখলাম দীর্ঘ যাত্রার পর কুমিল্লায় এসে ট্রেন থেমে গেল। এবার আমি মুখটা ট্রেনের বগিতে ফেরালাম।দেখলাম কিছু মানুষ তড়িঘড়ি করে নামছে, কেউ আবার ট্রেনে উঠছে। ছেলের থেকে জানতে পারলাম কুমিল্লায় ট্রেনটি দশ মিনিটের জন্য দাঁড়ায়। আমি ব্যস্ত হয়ে চোখ আবার জানালায় রেখে দেখছি সবাই ট্রেনে উঠতে পারলো কিনা। 
হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল একজন মানুষকে ট্রেনের বাইরে দেখতে পেয়ে, মনে হলো ক্ষনিকের জন্য শরীরের হার্টবিট যেনো থেমে গেছে, এ আমি কাকে দেখলাম, সেই চোখ, দীর্ঘ দেহ, সেই নাক, অবশ্য নাকের উপরে এখন চশমা শোভা পাচ্ছে তবুও আমি চিনতে ভুল করিনি 
কতো বছর পরে দেখলাম শিশির কে। শিশিরের মতই ছিল সে স্নিগ্ধ। তাকে ভোলা কি এতই সহজ, সে যে  প্রথম প্রেম ছিল। 
আমি আরও একটু গলা বাড়িয়ে দেখতে লাগলাম ট্রেনে উঠতে পারলো কিনা মানুষটা।
দেখলাম দুটো ছোট্ট দুটো বাচ্চা আর একটা মেয়েকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে হাত নাড়ছে, চোখ দুটো তার ছলছল করছে, হাত দিয়ে চশমা সরিয়ে চোখের পানিটাও মুছতে দেখলাম, অথচ সে আমাকে দেখতে পেল না, আমি উন্মুখ হয়ে চাচ্ছি সে একবার আমায় দেখুক, হাত নাড়াতেও সাহস পাচ্ছি না, পাছে ছেলে আমার দেখে ফেলে 
আহা! জীবনের প্রথম প্রেম, চাইলেই কি ভোলা যায়? 
কত রাত, কত নির্জন দুপুর, কত একাকী সময় মনে মনে যে তাকেই ভেবেই আকুল হয়েছে, তা কি আর কেউ জানে, সে তো শুধু আমি আর আমার মন জানে। 
আমি যখন ব্যাকুল হৃদয়ে শিশিরকে সারাজীবনের জন্য ভালো করে বারবার দেখে নিচ্ছিলাম, তখন মনে হয় ঈশ্বর আমার ব্যাকুলতা টের পেয়ে ঘোষণা দিয়ে দিল, ট্রেন কুমিল্লায় এক ঘন্টা বিরতিতে যাবে, ভাগ্যিস দুটো হাত তখন খুশিতে হাততালি দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, অনেক কষ্টে নিজেকে দমন করলাম। 
দেখলাম বিরতির খবর পেয়ে শিশির ট্রেনে উঠে পড়লো। 
বুঝতে পারলাম মেয়ে এবং নাতি নাতনিকে বিদায় জানাতে এসেছে সে। 
মহা মশগুল হয়ে তারা চারজন খুঁনসুটিতে ব্যস্ত

আর আমি একটি বার জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথাটি রেখে বলতে চাচ্ছিলাম, যে কথা হয়নি বলা, যে কথা শুনতে পাওনি তুমি, সেটিই আজ বলতে চাই, 
আমিও যে তোমায় ভালবেসেছিলাম ঠিক তোমার মত
করে। 

সেদিন বাবার ভয়ে তোমাকে উপেক্ষা করে পুরো জীবন তোমাকে পুষে রেখেছি নিজের বুকের মাঝে

সে কথাটি হয়নি বলা

জানি,আজও বলা হবে না, তবুও একটি বার যদি তোমাকে ছুঁতে পারতাম, তবে হয়তো আপসোস নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হতো না

গ্রামে একসাথে বড় হয়েছি, তুমি চার বছরের বড় ছিলে বলে, খুব বেশি কাছে ঘেঁষতাম না, অথচ তোমার আমার ঠিকই একটা বন্ধন মনে মনে গড়ে উঠেছিল, অথচ দেখো এত বছর পরে দেখার পরেও তোমার সাথে কথা বলতে ভয় পাচ্ছি, ছেলে যদি জিজ্ঞেস করে "কে উনি " কি বলবো? 

বুঝতে পারছি যে সাহস সেদিন যেমন ছিল না আজও নেই
তবু্ও তোমার দিকে তাকিয়ে আছি, চাচ্ছি একবার তুমি আমায় দেখে চিনতে পারো কিনা? 

ঈশ্বর কি তবে আমাকে বুঝতে পারে? কি অদ্ভুত 
হঠাৎ আমার দিকে তোমার চোখ ফিরিয়ে সাথে সাথে আবার ফিরিয়ে নিলে।
বেদনাহত হয়ে যখন আমি চোখের জল লুকাতে ব্যস্ত
এরই ফাঁকে দেখি, তুমি হাজির আমারই সিটের পাশে।
হঠাৎ করে আবারও হার্টবিট বেড়ে গেল।ভাগ্যিস ছেলে তখন পাশে ছিল না, একটু ঘুরতে গেছে হয়তো, তুমি কি অবলীলায় আমার হাতটি ধরে টেনে নিয়ে গেলে তোমার মেয়ের কাছে, পরিচয় করিয়ে দিলে কি সুন্দর ভাবে, আর আমি আরষ্ট হয়ে দু চার কথা বলতেই পারলাম না, শুধু অল্প কথাতেই এই টুকু বুঝতে পেরেছি তুমি এখন আমার মতই বড্ড একা। 

এরমধ্যেই ট্রেনের উইসেল বেজে উঠলো। দেখলাম তোমার চোখেও ছলছল, হয়তো তোমার আত্মজার জন্য, হঠাৎ কাগজ কলম বের করে তোমার ফোন নাম্বার লিখে দিয়ে বললে, সময় পেলে ফোন দিও
এই বলে সেই বিখ্যাত তোমার অট্টহাসি দিলে, যে হাসির জন্য তোমার প্রেমে পড়েছিলাম, 
তোমার হাসি শুনে লজ্জিত হাসি দিলাম
মেয়ে তোমাকে তাগাদা দিলো
বাবা, তাড়াতাড়ি নেমে যাও, ট্রেন ছেড়ে দিল
তুমি আমার দিকে তাকিয়েই বললে যাই
তখনও তোমার কাগজখানি আমার হাতের মুঠোয় 
সিটে বসার পরেই দেখলাম আমার ছেলেটিও এসে বসলো
ট্রেন তখন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো 
আর আমি গলা বাড়িয়ে যতদূর দেখা যায় নয়ন ভরে তোমাকে দেখে নিলাম। 
কাগজখানা তখনও হাতের মুঠোয় আমার সাথে পুরনো দিনের গল্প করে যাচ্ছে, যে গল্পে আমি ও তুমি আছি। 

ট্রেনের হুইসেল বাজিয়ে কমলাপুর স্টেশনে ঢুকা শুরু করলো, আর আমি হাতে রাখা কাগজখানি আস্তে করে জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম। সেদিনও যেমন সাহস হয়নি আজও সাহস হয়নি সেই ছোট্ট কাগজখানি সাথে রাখার। 

শান্তা / শান্তা