আব্দুস সাত্তার সুমন
“বৈচিত্র্যময় মাদারীপুর”
মাদারীপুরে গেলেই আমার মনে হয়, আমি শুধু একটা জায়গায় ঘুরতে আসিনি, পুরোনো স্মৃতির দিনগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়েছি। ফাসিয়াতলা, এনাতনগর, আলীনগর, খুনেরচর, কালকিনী, বুরঘাটা, সমিতির হাট, খাসের হাট একেকটা জায়গার সঙ্গে একেক রকমের পরিচয়, একেক রকমের স্মৃতি।
গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে ধানের খেত। কোথাও নতুন ধানের চারা, কোথাও সবুজ ধান, আবার কোথাও পাকা ধানের শীষ বাতাসে দুলছে। এর পাশেই কোনো মাঠে পাট, কোথাও মরিচ, কোথাও সরিষা। সরিষার ফুল ফুটলে দূর থেকে পুরো মাঠটা হলুদ হয়ে থাকে। এমন দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে কখনো মনে হয়, এই পথ তো অচেনা নয়। মনে হয়, অনেক বছর আগে এমনই কোনো পথ দিয়ে নানার সঙ্গে পায়ে হেঁটে বাজারে গিয়েছিলাম।
তখন বাজারে যাওয়াটাও ছিল একটা আনন্দের ব্যাপার। নানা সঙ্গে থাকতেন, আর আমি তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বাজারে পৌঁছে যেতাম, বুঝতেই পারতাম না। এখন গাড়িতে করে কত দূরে চলে যাওয়া যায়, কিন্তু সেই পায়ে হাঁটার আনন্দটা আর নেই।
মাদারীপুরের গ্রামের হাটগুলোতে গেলে সেই পুরোনো দিনের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। সমিতির হাট, খাসের হাট কিংবা কালকিনীর বাজার মানুষের ব্যস্ততা, দোকানের সারি, মাছের ঝুড়ি, শাকসবজি, ফলমূল সব মিলিয়ে বেশ জমজমাট পরিবেশ। এক পাশে কেউ মাছ নিয়ে বসেছেন, অন্যদিকে কৃষক তার ক্ষেতের সবজি সাজিয়ে রেখেছেন।
সকালের দিকে হাটে গেলে গরম গরম আটার রুটি আর ডাল ভাজির গন্ধ পাওয়া যায়। কোথাও আবার বাতাসা, মন্ডা মিঠাই, মাসকালাই ডালের আমৃত্তি, বাদাম ভাজা। গ্রামের পথের এসব খাবারের আলাদা একটা স্বাদ আছে। মায়ের সঙ্গে কিংবা নানির সঙ্গে হাটে যাওয়ার সময় এসব খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকার কথাও মনে পড়ে। তখন হয়তো সবকিছু কেনার সুযোগ ছিল না, কিন্তু দেখেই বেশ আনন্দ লাগত।
হাট থেকে একটু দূরে গেলেই আবার অন্য মাদারীপুর। নদী, খাল আর বিলের এলাকা। কোথাও জেলেরা নৌকা নিয়ে মাছ ধরছেন। কেউ জাল ফেলছেন নদীতে, কেউ খালে। বর্ষার সময় বিল পানিতে ভরে গেলে চারপাশে শুধু পানি আর পানি। সেই সময় গ্রামের মানুষ মাছ ধরতে বের হন নানা রকমের জাল আর সরঞ্জাম নিয়ে।
ছোট চাচার সঙ্গে বিলে মাছ ধরতে যাওয়ার দিনগুলো তখন মনে পড়ে। খালে- বিলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে মাছ ধরতাম। মাছ কত পেলাম সেটা বড় কথা ছিল না। চাচার সঙ্গে সারাদিন বাইরে থাকা, পানিতে নামা, জাল নিয়ে ব্যস্ত থাকা সেটাই ছিল আনন্দ।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে জেলেদের মাছ ধরতে দেখলে এখনো সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আগে এসব দৃশ্য দেখলে মনে হতো এটাই তো স্বাভাবিক। এখন বুঝি, গ্রামের সেই স্বাভাবিক জীবনটাই কত সুন্দর ছিল।
কোনো কোনো সময় গ্রামের পথে যেতে যেতে আখের ক্ষেত চোখে পড়ে। তখন মনে পড়ে আখভাঙার দৃশ্য। আখ থেকে রস বের করা হচ্ছে, সেই রস বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। পরে তৈরি হচ্ছে গুড়। তাফালে করে গুড় তৈরির সেই ব্যস্ততা দেখতে বেশ ভালো লাগত। আগুনের পাশে বসে থাকা মানুষগুলোর ব্যস্ততা আর গুড়ের গন্ধ সবকিছু মিলে গ্রামের শীতের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
শীতের কথা উঠতেই খেজুরের রসের কথা মনে পড়ে। বড় চাচার সঙ্গে খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রসের হাঁড়ি নামানোর দৃশ্য এখনো ভুলিনি। গাছ থেকে হাঁড়ি নামানো হচ্ছে, ভেতরে রাতভর জমে থাকা রস। সেই সময় মনে হতো, খেজুরের রসের চেয়ে মজার আর কিছু হতে পারে না।
গ্রামের বাড়িতে কিংবা মামার মুদির দোকানে বসেও কত সময় কেটেছে। কোনো কাজ নেই, তবু দোকানে বসে আছি। লোকজন আসছে, জিনিসপত্র কিনছে, কেউ দুটো কথা বলে চলে যাচ্ছে। মামা দোকানের কাজে ব্যস্ত। আমি পাশে বসে সব দেখছি। সেই সময়ের কথা এখন মনে হলে বেশ ভালো লাগে।
মাদারীপুরের গ্রামে শুধু মাঠ আর নদী নয়, গাছপালাও যেন আলাদা করে চোখে পড়ে। ঋতু বদলালে ফলেরও পরিবর্তন হয়। গ্রামের গাছের ফল, হাটে ওঠা মৌসুমি ফল সবকিছুর মধ্যেই একটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। এখন অনেক ফল আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না, অনেক গাছও নেই।
আবার কোনো গ্রামে গেলে ধান কাটার দৃশ্য চোখে পড়ে। কৃষকেরা মাঠে ব্যস্ত। কোথাও পাট তোলা হচ্ছে, কোথাও ধান মাড়াই চলছে। এসব দেখতে দেখতে মনে হয়, গ্রামের জীবন আসলে থেমে থাকে না। এক ফসল শেষ হয়, আরেক ফসলের কাজ শুরু হয়।
এভাবেই মাদারীপুর ঘুরতে ঘুরতে বর্তমান আর অতীত একসঙ্গে মিশে যায়।
অনেক কিছুই এখন আগের মতো নেই। রাস্তা হয়েছে, বাড়িঘর বেড়েছে, মানুষের জীবনযাপন বদলেছে। অনেক হাটের চেহারাও বদলে গেছে। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন যাদের সঙ্গে এসব দিন কাটিয়েছিলাম, তাদের অনেকেই এখন আর নেই।
কখনো কোনো পরিচিত জায়গায় দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই জায়গায় তো একদিন নানা ছিলেন। এই পথ দিয়ে মায়ের সঙ্গে হেঁটেছি। ওই দিকের কোনো বিলে ছোট চাচার সঙ্গে মাছ ধরেছি। শীতের কোনো সকালে বড় চাচার সঙ্গে খেজুরের রসের হাঁড়ি নামিয়েছি।
মানুষ নেই, কিন্তু জায়গাগুলো অনেক কথা মনে করিয়ে দেয়।
তাই মাদারীপুরে আমার প্রতিবারের যাওয়াটা শুধু বেড়ানো হয় না। কখনো ধানের খেত দেখতে দেখতে, কখনো নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, কখনো হাটের ভিড়ে কিংবা গ্রামের কোনো দোকানের সামনে বসে পুরোনো দিনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।
সব দিন ফিরে পাওয়া যায় না। মানুষও ফিরে আসে না। কিন্তু স্মৃতির একটা ভালো দিক আছে কোনো একটা দৃশ্য, কোনো একটা গন্ধ, কোনো একটা খাবার কিংবা গ্রামের কোনো পরিচিত পথ হঠাৎ করে সেই দিনগুলোকে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
মাদারীপুরে গেলে আমার ঠিক সেটাই হয়।
ফিরে আসার সময় মনে হয়, কত কিছুই তো বদলে গেছে। তারপরও মনে হয়, এই মাটিতে কোথাও না কোথাও আমার সেই পুরোনো দিনগুলো এখনো রয়ে গেছে।
আর মনে পড়ে,
কী মধুর ছিল সেই দিনগুলো।
শান্তা / শান্তা
“বিষের ছায়া মায়ার অরণ্য”
“বৈচিত্র্যময় মাদারীপুর”
পুঁথির পুনর্জাগরণের
“বিরতি” স্মরণিকা চৌধুরী
“অনিন্দ্যর জন্য আকুলতা” জা কি র আ জা দ
“মাটির সুবাস ও আধুনিক নবান্ন” আব্দুল কাদের
“আতঙ্কের ছায়া” হানিফ রাজা
সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্মার্ট শিল্পকলা গড়তে চান রেজাউদ্দিন স্টালিন
শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর-এর ১৪টি ছোটকাকু প্রকাশিত
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
“সিগনেচার” সামছুল আলম শিমুল
“দিওয়ান-ই-শামস -ই তাবরিজি : জালালুদ্দিন রুমি ” এস ডি সুব্রত