“মাটির সুবাস ও আধুনিক নবান্ন” আব্দুল কাদের
কুয়াশার নরম চাদর গায়ে জড়িয়ে তখনো সবেমাত্র ঘুম ভাঙছিল গ্রামের মেঠো পথগুলোর। ভোরের শিশিরস্নাত ঘাসের ডগায় মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করা একটি ক্ষুদ্র ইঁদুরছানা নির্ভয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। বাড়ির প্রশস্ত উঠানে দাঁড়িয়ে প্রবীণ দাদা আফছার নাতি রোহানের কোমল হাতটি নিজের মুঠোয় ধরে তাকিয়ে আছেন অগ্রহায়ণের মিষ্টি সোনালি রোদের দিকে। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর ব্যস্ত ঘড়ির টিকটিক শব্দ পেছনে ফেলে এই স্নিগ্ধ গ্রামে বেড়াতে আসা রোহান চারপাশের মুক্ত হাওয়া ও প্রাণোচ্ছল কর্মব্যস্ততা দেখে মুগ্ধ হয়ে দাদাকে জড়িয়ে ধরল।
"দাদাভাই, শহরের ওই দেয়ালবন্দী জীবনে তো ঘড়ির অ্যালার্মে ঘুম ভাঙে, আর এখানে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে ও আজানের স্নিগ্ধ সুরে! চারদিকে মানুষের এমন আনন্দমাখা ছোটাছুটি কেন?" রোহান কৌতূহলী দৃষ্টিতে জানতে চাইল।
দাদা মৃদু হেসে রোহানের চুলে হাত বুলিয়ে বললেন, "আরে পাগলা, শহরের কৃত্রিম পরিবেশের চেয়ে আমাদের গ্রামের এই প্রকৃতির রূপটাই আলাদা! আজ তো ঘরে ঘরে নবান্নের উৎসব। দেখছিস না, জমির মালিক আফছার সাহেব তাঁর দুই তরুণ পুত্র হাশেম ও কাসেমকে নিয়ে মাঠের কাজে নেমে পড়েছেন।"
রোহান দূরে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখল, হাশেম ও কাসেম আধুনিক বৈজ্ঞানিক উপায়ে নিজেদের জমিতে চাষবাস পরিচালনা করছে। সে সবিস্ময়ে বলল, "ওরা তো আমাদের মতোই শহরে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছে, অথচ কী সুন্দর দলবল নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষবাসের নেতৃত্ব দিচ্ছে!"
দাদা একটু হেসে স্মৃতির পাতা হাতড়ে বললেন, "সেটাই তো প্রকৃত শিক্ষা রে বাবা। অনেকে মনে করে পড়াশোনা শুধু শহরে বসে বড় চাকরি করার জন্য, কিন্তু হাশেম-কাসেমরা প্রমাণ করেছে যে আধুনিক জ্ঞানকে নিজের শেকড়ে ফিরিয়ে এনে মাটির সেবা করাটাই জীবনের অন্যতম সার্থকতা। ওরা কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আধুনিক বিজ্ঞান ও যন্ত্রপাতির ছোঁয়া লাগিয়েছে আমাদের জমিতে। সবচেয়ে বড় কথা, ওরা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে বিষমুক্ত ফসল ফলানো যায় এবং ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে আমাদের উর্বর মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা যায়।"
দাদা থামতেই রোহান শহর ও গ্রামের জীবনকে মিলিয়ে নিয়ে গভীর উপলব্ধিতে প্রশ্ন করল, "আচ্ছা দাদা, পূর্বপুরুষেরা তো এত কষ্ট করে জমিতে চাষ করতেন, তাঁদের সেই হাড়ভাঙা খাটুনি কি তবে আজ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে?"
দাদা স্নেহের হাসিতে মাথা নেড়ে বললেন, "কখনোই না বাবা! শহর হয়তো আমাদের যান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা দেয়, কিন্তু মাটি আর শেকড়ের টান দিতে পারে কেবল গ্রাম। প্রযুক্তি আমাদের শ্রম ও সময় সংক্ষেপ করেছে ঠিকই, কিন্তু ঘাম ঝরানো সেই পরিশ্রমের প্রতি আমাদের সম্মান বিন্দুমাত্রও কমেনি। পূর্বপুরুষের ওই রক্তে ভেজা ঘাম আর আদিম লড়াইয়ের ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই তো আজ আমরা আধুনিকতার এই সোনালি আলো দেখতে পাচ্ছি। অতীতের ওই ত্যাগের ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়; তাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে চরম প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে আঁকড়ে ধরে ধৈর্য ও সাহসের সাথে টিকে থাকতে হয়।"
ঠিক তখন জমির দিক থেকে কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে হাসিমুখে উঠানে এসে পৌঁছালেন অভিজ্ঞ কৃষক মকবুল চাচা।
মকবুল চাচা মুচকি হেসে বললেন, "কী আফছার ভাই, নাতিকে আমাদের পুরনো দিনের গল্প শোনানো হচ্ছে নাকি? শহরের ছেলে তো, তাই গ্রামের এই মুক্ত জীবনের আসল রূপ দেখে মুগ্ধ হচ্ছে!"
দাদা হেসে বললেন, "আরে মকবুল ভাই, ঠিকই বলেছ! এই তো রোহানকে বোঝাচ্ছি, মাটির নাড়ির টান তুমি যেমন আবহমানকাল থেকে চেনো, আর হাশেম-কাসেম তার সাথে আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান ও উন্নত বীজ যুক্ত করেছে।"
মকবুল চাচা গর্বিত ভঙ্গিতে বললেন, "ঠিক বলেছেন ভাই সাহেব! কেবল গতানুগতিক চাষ করলেই তো এখন চলে না; মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা, অপচয় রোধ করা এবং প্রকৃতির সাথে কোনো বৈরিতা না করে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলা; এসবও এখন আমাদের রপ্ত করতে হয়েছে। আমার নেতৃত্বে অভিজ্ঞ কামলা ও কৃষাণেরা দলবেঁধে পাকা ধান কাটতে নেমেছে, আর গানে গানে ছড়িয়ে দিচ্ছে সম্প্রীতির সুবাস। দলবেঁধে কাজ করার মাঝেই মানুষে মানুষে ভালোবাসার প্রকৃত শিক্ষা নিহিত রয়েছে।"
রোহান উৎসাহের সাথে বলে উঠল, "মকবুল চাচা, শহরে তো শুধু বই আর গবেষণাগার দেখেছি, আমি একটু আপনাদের সাথে মাঠে যেতে পারি? দেখব কেমন করে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে ধান কাটা ও মাড়াই সম্পন্ন হয়।"
মকবুল চাচা স্নেহভরে হেসে রোহানের পিঠ চাপড়ে বললেন, "চলবি না কেন ভাই! মাঠেই তো আজ আসল মহোৎসব বসেছে। শুধু মেশিনের কাজ দেখলে হবে না, মাটির সাথে মানুষের যে নাড়ির সম্পর্ক, কায়িক শ্রমের মর্যাদা এবং দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার যে আনন্দ, সেটাও তোকে হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে হবে।"
মাঠে গিয়ে রোহান দেখল, পাওয়ার থ্রেশারের গর্জন তুলে আধুনিক ধান মাড়াইয়ের কাজ চলছে। শহরের কৃত্রিম বিনোদনের চেয়ে এই মুক্ত আকাশের নিচে খোলা মাঠে সোনালি ধানের ছড়াছড়ি তার মন কেড়ে নিল। অল্প সময়ে চিটা থেকে নিখুঁতভাবে ঝকঝকে সোনালি ধান আলাদা হয়ে বেরিয়ে আসছে। রোহান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখল, অতীতে যেখানে মাসের পর মাস সময় লাগত, আজ প্রযুক্তির জাদুকরী ছোঁয়ায় তা নিমিষেই সম্পন্ন হচ্ছে।
দুপুরের নরম রোদে উঠানে নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। গোলায় ধান তোলার এই মহোৎসবের ফাঁকে দাদা আফছার নাতি রোহানকে কাছে টেনে নিলেন।
দাদা গভীর ভালোবাসায় বললেন, "দেখেছিস বাবা রোহান? শহরের চকচকে জীবনে হয়তো অনেক আরাম আছে, কিন্তু পূর্বপুরুষের রক্তে ভেজা সেই আদিম পরিশ্রম আর আজকের বিজ্ঞানের ছোঁয়া; এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আমাদের জীবনের আসল সার্থকতা লুকিয়ে আছে। প্রযুক্তি আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু সেই পথের মূল কারিগর হলো এই মেহনতী মানুষ। প্রকৃতির সাথে লড়াই নয়, বরং প্রকৃতির নিয়ম মেনে তাকে ভালোবেসে বাঁচতে হবে। আর আমাদের সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে; কারণ অন্যের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার মাঝেই নিহিত রয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় পরার্থপরতা ও মানবতার শিক্ষা।"
মকবুল চাচা, হাশেম, কাসেম আর খেটে খাওয়া প্রতিটি মানুষের ক্লান্তিহীন হাতের দিকে তাকিয়ে রোহানের বুকটা গভীর শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। শহরের যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে সে মনে মনে উপলব্ধি করল, এই কর্দমাক্ত মাটি আর ঘামে ভেজা মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ সাধনা, ত্যাগের গৌরব, আধুনিক শিক্ষার সার্থক প্রয়োগ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপরেই তো গেঁথে আছে আমাদের জীবনের আসল রূপ ও সভ্যতার মূল ভিত্তি।
শান্তা / শান্তা
“অনিন্দ্যর জন্য আকুলতা” জা কি র আ জা দ
“মাটির সুবাস ও আধুনিক নবান্ন” আব্দুল কাদের
“আতঙ্কের ছায়া” হানিফ রাজা
সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্মার্ট শিল্পকলা গড়তে চান রেজাউদ্দিন স্টালিন
শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর-এর ১৪টি ছোটকাকু প্রকাশিত
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
“সিগনেচার” সামছুল আলম শিমুল
“দিওয়ান-ই-শামস -ই তাবরিজি : জালালুদ্দিন রুমি ” এস ডি সুব্রত
“অন্ন ও অন্যায়” সুলেখা আক্তার শান্তা
“কাকতাড়ুয়া নাকি ভূত” আসাদ সরকার
“জীবন-প্রেমিক” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
“মেঘের এপিটাফ” জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
`ভাদ্র মাসের ভূত' শাহজালাল সুজন
Link Copied