সুলেখা আক্তার শান্তা
“বিষের ছায়া মায়ার অরণ্য”
চারপাশটা তখন এক অদ্ভুত থমথমে আতঙ্কে আচ্ছন্ন। মানুষগুলোর ছোটাছুটি, কান্নাকাটি আর আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে সবাই পাগলের মতো দৌড়ে আসছে একই দিকে—জহিরের উঠোনে। সবার মুখে একটাই কথা, এত সুন্দর ফুটফুটে ছেলেটাকে শেষ পর্যন্ত সাপে কাটল!
"না আর এই সাপেদের উৎপাতে গ্রামে টেকা গেল না!" একজন ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠলেন। "আজ এরে কামড়ায় তো কাল ওরে! এভাবে আর কত?"
উঠোনের এক কোণে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর বুক ফেটে কান্না আসছে। ছোট্ট পাভেলের মা রোজিনা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চুল ছিঁড়ছেন, আর বাবা জহির আকাশপানে তাকিয়ে বিলাপ করছেন। ভিড়ের মাঝখানে মাদুর পেতে বসে আছেন গ্রামের প্রবীণ ওঝা। তাঁর সামনে রাখা সাপের ঝোলা। তাঁর চোখমুখ কুঁকড়ে আছে গভীর আশঙ্কায়।
ওঝা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারী গলায় বললেন, "নারে ভাই, এ সাধারণ কোনো সাপ নয়। এ বিষ নামানো মুখের কথা নয়। এই নাগ বা নাগিনীর বিষ নামাতে গেলে স্বয়ং বিন বাজিয়ে তাদের মন গলাতে হয়। কিন্তু সেই বিষধরকে আনতে গেলে আমার নিজের জীবনটাই বিপন্ন হতে পারে। আমার এই দীর্ঘ জীবনে বহু সাপের বিষ আমি নামিয়েছি, কিন্তু এই সাপের রাগের তেজ যে অন্যরকম!"
পাভেলের বাবা-মা ওঝার পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। "ওঝা ভাই, আমার একটাই তো ধন। যেমন করে হোক আমার ছেলেকে বাঁচান। আপনার পায়ে পড়ি!"
ওঝা আর ফেললেন না। তিনি চোখ বন্ধ করে জপ করতে লাগলেন এবং সাপের খোঁপ থেকে প্রাচীন পিতলের বিনটি বের করে ঠোঁটে ছোঁয়ালেন। বেজে উঠল তীব্র এক সুর। সেই সুর বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। ওঝা ফুঁ দিয়ে যাচ্ছেন বিনে, কিন্তু দূরে বহুদূর থেকে সাপের আসার কোনো সাড়া শব্দ নেই। ওঝার নিজেরেই বুক ফেটে দম আটকে আসছে।
সবাইকে তিনি ফিসফিস করে বললেন, "কেউ কোনো কথা বলবেন না। এখানকার সব নারীরা আপনাদের চুল খুলে দিন!"
মুহূর্তের মধ্যে উঠোনের সব নারীর চুলের খোঁপা ছেড়ে দিলো। গ্রামের বাতাসে এক রহস্যময় আবহ তৈরি হলো।
এদিকে ঘন বনের গহীনে, মাটির নিচের গভীরে সেই নাগিনীর কানে এসে পৌঁছাল সেই সুর।
নাগিনী ফোঁস করে উঠে বসল। তার চোখ দুটো জ্বলছে লাল আগুনে। সে মনে মনে ভাবল, "ইস! আবার মানুষ আমাকে বিন শুনিয়ে বশ করতে চাইছে? মানুষের প্রতি আমার অন্তরের ক্ষোভ কি ফুরিয়েছে? আমার স্বামীটাকে ওরা মেরে ফেলেছে, আমার অবুঝ সন্তানগুলোকে ওরা মেরে ফেলেছে। আমার জীবনে এখন আর বাকি রইল কী? যাব না দেখি, আমাকে কোন সাহসে বিন বাজিয়ে টানে!"
সাপের সেই তীব্র রাগ ফুসে উঠল। সে ফোঁস করে বেরিয়ে পড়ল তার গর্ত থেকে। ওঝার বিনের বাঁশি তাকে যেন পাগল করে তুলছে। নাগিনী চলতে শুরু করল। একবার সে এগোয়, তো পরক্ষণেই অভিমানে ফিরে আসতে নেয়। কিন্তু বিনের সুর তাকে আর স্থির থাকতে দেয় না।
পথ চলতে গিয়ে সে পার হলো এক খরস্রোতা নদী। রাগে তখন সে দিশাহারা। নদীতে নামতেই সে যা পেল—মাছ, হাঙ্গর, জলের নানা প্রাণী—কাউকেই রেহাই দিলো না, সবাইকে কামড়াতে লাগল। নদীর ধার দিয়ে বনের দিকে যাওয়ার সময় গাছের ডালে বসা পশুপাখি—যার ওপর চোখ পড়ল, তার বিষাক্ত ছোবল মারলো। বনের পাখি ছটফট করতে করতে গাছ থেকে মাটিতে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছিল।
সেই যন্ত্রণার ছটফটানি দেখে বনের অন্য পশুপাখিরা হইচই শুরু করে দিলো। মুহূর্তে পুরো জঙ্গলে শোরগোল পড়ে গেলো। বাঘ, সিংহ, হরিণ, বানর সব এক জায়গায় জড়ো হয়ে গেলো।
বনের রাজা বাঘ গর্জে উঠে বলল, "একি কাণ্ড! নাগিনী এমন উন্মাদ হয়ে গেলো কেন? সে যাকে পাচ্ছে তাকেই কামড়াচ্ছে কেন? তাকে থামাও!"
সব পশু মিলে নাগিনীর পথ আগলে দাঁড়াল। সিংহ সামনে গিয়ে নরম, গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "বলো নাগিনী, তোমার এমন কী হয়েছে? যে তুমি বনজুড়ে এমন তাণ্ডব চালাচ্ছ! কার ওপর তোমার এত রাগ?"
নাগিনী ফুঁসতে ফুঁসতে ফণা তুলে বলল, "তোমরা বোঝো না আমার যে ক্ষতি হয়েছে ! আমার স্বামীকে মানুষ মেরে ফেলেছে, আমার সন্তানকে মেরে ফেলেছে। আমার জীবন তো আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন আমার রাগ এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ওপর!"
তখন বনের বুদ্ধিমান বানরটি এগিয়ে এসে বলল, "বোঝার মতো কথা তো তুমি বলছ নাগিনী। কিন্তু বনের পশুপাখিরা তো তোমার শত্রু নয়। আমাদের ওপর কেন তোমার এই রাগ? আমরা তো এই জঙ্গলেই বাস করি। মানুষ তো শুধু তোমার নয়, আমাদেরও শত্রু! ওরা প্রতিদিন আমাদের ঘরবাড়ি সাফ করে দিচ্ছে, বন কেটে ফেলছে, আমাদের বেঁচে থাকার কথা একটুও ভাবছে না!"
নাগিনী একটু থামল। তার রাগ যেন খানিকটা দমে গিয়ে দীর্ঘশ্বাসে রূপ নিলো। সে চারপাশের পশুপাখিদের দিকে তাকাল।
"ঠিকই বলেছ তোমরা," নাগিনী ফিসফিস করে বলল। "মানুষ শুধু সাপ নয়, বনের সমস্ত প্রাণীকে আজ নিধনের পাঁয়তারা করছে। তাহলে চলো তোমরাও আমার সঙ্গে! আজ আমরা সবাই মিলে মানুষের সামনে দাঁড়াবো, তাদের কাছে আমাদের না পাওয়ার হিসাব বুঝয়ে দেবো!"
বনের সমস্ত পশুপাখি—বাঘ, সিংহ, হরিণ, বক, চিল—সবাই একজোটে নাগিনীর পেছনে পেছনে ছুটল। রাস্তার যেন শেষ নেই। যেতে যেতে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তবুও তাদের থামার উপায় নেই। তাদের বুকের ভেতর জমে আছে বহুদিনের পুঞ্জীভূত আক্ষেপ আর কষ্টের অবসান নিতে চায়।
ওদিকে জহিরের উঠোনে, তখন ওঝার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। তার শরীর কাঁপছে, মুখ দিয়ে ফেনা উঠছে। সে বুঝতে পারছে, নাগিনী এসে গেছে।
হঠাৎ শত শত পশুপাখির পদশব্দ আর ডাক শুনে চারপাশের মানুষ কেঁপে উঠল। এত পশুপাখি একসঙ্গে গ্রামে কোত্থেকে এলো? পুরো এলাকা পশুপাখির ডাকে মুখরিত হয়ে উঠল। মানুষগুলো ভয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল।
নাগিনী ফণা উঁচিয়ে ফুঁসে উঠল। সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, "আমি বিষ তখনই চুষে নেব, যখন মানুষের মুখ থেকে আমাদের বাঁচার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে! তোমরা জঙ্গল কাটো, আমাদের মারো—এর শেষ কোথায়?"
পাভেলের বাবা-মা হাত জোড় করে কেঁদে ফেললেন। জহির বললেন, "ওহে নাগিনী, আমরা সাধারণ মানুষ, আমরা তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি! কেন আমার একমাত্র বুকজুড়ানো ছেলেকে এভাবে কামড় দিলে?"
নাগিনী এবার কিছুটা শান্ত হয়ে উত্তর দিলো, "তুমি হয়তো আঘাত করোনি, কিন্তু তোমার জাতভাইরাই তো আমাদের নির্বিচারে মেরে চলেছে! আমাদের ঘর ধ্বংস করছে।"
তখন বনের পশুপাখিরা এগিয়ে এসে সমস্বরে বলে উঠল, "আমরা বন-জঙ্গলে শান্তিতে থাকতে চাই। মানুষ কেন আমাদের খাঁচায় বন্দি করে রাখে? কেন আমাদের ওপর গুলি চালায়?"
রোজিনা মাটিতে বসে হাত জোড় করে মিনতি করলেন, "তোমাদের সব দাবি মেনে নেব আমরা। কিন্তু দয়া করে আমার বুকের মানিককে ফিরিয়ে দাও! আগে আমার ছেলেকে বাঁচাও, তারপর তোমরা যা বলবে, আমরা তাই শুনবো।"
নাগিনীর মায়ের মন কেঁদে উঠল। সে আর দেরি করল না। সে এগিয়ে গিয়ে পাভেলের নিথর দেহের ওপর ফণা রাখল। তারপর তার লেজ দিয়ে মাটি চাপড়াতে চাপড়াতে পাভেলের সারা শরীর থেকে সেই মারাত্মক বিষ এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে নিজের ভেতরে টেনে নিতে লাগল। বিষের যন্ত্রণায় নাগিনী নিজেই ছটফট করতে লাগল, কিন্তু সে থামল না। পুরো বিষ শুষে নেওয়ার পর সে ফণা নামাল।
ঠিক তখনই ওঝা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তার মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। জহির দ্রুত গিয়ে ওঝাকে জড়িয়ে ধরলেন।
রোজিনা চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন, "ওঝা ভাই! তোমার কিচ্ছু হবে না। আমার সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে আজ তোমার এই অবস্থা?
ওঝা মৃদু হেসে ইশারায় বললেন, "আমার... আমার কিচ্ছু হয়নি বোন। শুধু একটু শান্তিতে থাকতে দাও...।"
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই পাভেল আস্তে আস্তে চোখ মেলল। সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, "মা...।"
রোজিনা আনন্দের বন্যায় ভেসে গেলেন। তিনি খোকন সোনার মা ডাক ডাকতে শুনলেন! তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।
নাগিনী বিষশূন্য হয়ে ক্লান্ত শরীরে পেছনে ফিরে তাকাল। সে নরম সুরে বলে উঠল, "বিদায় মানুষ। আমার আর এই দুনিয়ায় পাওয়ার কিছু নেই।"
সে যখন ধীরে ধীরে বনের দিকে ফিরে যেতে লাগল, তখন উপস্থিত সব মানুষের চোখ ভেজে উঠল আফসোসে। জহির হাতজোড় করে বললেন, "নাগিনী, তুমিও ভালো থেকো।"
এবার বনের পশুপাখিরা মানুষের মুখোমুখি হলো। বনের রাজা বাঘ গম্ভীর গলায় বলল, "শোনেন আমাদের একটাই কথা—এই যে আপনারা লোভের বশে দিন দিন বন-জঙ্গল কেটে সাফ করে ফেলছেন, গাছপালা ধ্বংস করছেন, তা আর করবেন না। গাছ কাটলে আমরা কোথায় যাব? আমরা তো আপনাদের খাবার খাই না, বনের ফলমূল খেয়েই বেঁচে থাকি। আর এই পাখিরাই তো এক জায়গায় খেয়ে অন্য জায়গায় বীজ ফেলে নতুন গাছ জন্ম দেয়, যা আপনাদের অক্সিজেন দেয়, প্রকৃতি সুন্দর রাখে।"
জহির মাথা নিচু করে স্বীকার করলেন, "ঠিক বলেছ তোমরা। এতদিন আমরা নিজেদের কথা ভেবেছি, প্রকৃতির কথা ভাবিনি। গাছপালা, নদীনালা, পাহাড়-পর্বত আর বনের পশুপাখি টিকিয়ে রাখা যে আমাদেরই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, তা আজ বুঝতে পেরেছি।"
গ্রামের বাকি মানুষেরাও সমস্বরে বলে উঠল, "হ্যাঁ, আমরা প্রতিজ্ঞা করছি! আজ থেকে আর কোনো জঙ্গল কাটব না, কোনো পশুপাখি মারবো না।"
ছোট্ট পাভেল তার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল, "বাবা, আমাদের সবুজ প্রকৃতি আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।"
সব পশুপাখি এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তাদের রাগ যেন ঝরে গেছে। তারা দল বেঁধে খুশিমনে ফিরে চলল তাদের সবুজ ঘরের দিকে। মানুষগুলো হাত নেড়ে তাদের বিদায় জানাল। এক নতুন বোঝাপড়া আর মায়ার আলোয় ভরে উঠল চারপাশ।
শান্তা / শান্তা
“বিষের ছায়া মায়ার অরণ্য”
“বৈচিত্র্যময় মাদারীপুর”
পুঁথির পুনর্জাগরণের
“বিরতি” স্মরণিকা চৌধুরী
“অনিন্দ্যর জন্য আকুলতা” জা কি র আ জা দ
“মাটির সুবাস ও আধুনিক নবান্ন” আব্দুল কাদের
“আতঙ্কের ছায়া” হানিফ রাজা
সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্মার্ট শিল্পকলা গড়তে চান রেজাউদ্দিন স্টালিন
শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর-এর ১৪টি ছোটকাকু প্রকাশিত
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
“সিগনেচার” সামছুল আলম শিমুল
“দিওয়ান-ই-শামস -ই তাবরিজি : জালালুদ্দিন রুমি ” এস ডি সুব্রত
“অন্ন ও অন্যায়” সুলেখা আক্তার শান্তা
Link Copied