“আতঙ্কের ছায়া” হানিফ রাজা
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চারপাশে তখন মানুষের ভিড়। কেউ ছুটছে ওয়ার্ডের দিকে, কেউ ওষুধের দোকানে, কেউ আবার স্বজনের জন্য খাবার নিয়ে ফিরছে।
অরফুলি বেগমের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। স্বামী নাজমুল কয়েক দিন ধরে হাসপাতালের তৃতীয় তলার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি। আজ সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় নাজমুলের কথা বারবার মনে পড়ছিল তার।
—“তুমি আসবা তো?”
স্বামীর দুর্বল কণ্ঠটা যেন এখনো কানে বাজছে।
অরফুলি হেসে বলেছিল,
—“তুমি চিন্তা কইরো না। তোমারে না দেখে আমি বাড়ি ফিরতাম না।”
হাতে ছোট্ট একটি ব্যাগ। তার ভেতরে স্বামীর জন্য কিছু খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিস। কানের দুটো সোনার দুল ছিল বহুদিনের পুরোনো—বিয়ের সময় মায়ের দেওয়া।
ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ি বেয়ে উঠছিল অরফুলি। চারদিকে মানুষের আনাগোনা। হঠাৎ পেছন থেকে একজন নারীসুলভ কণ্ঠ ভেসে এলো—
—“আপা, একটু দাঁড়ান তো!”
অরফুলি ফিরে তাকাল।
—“কী হইছে?”
কথা শেষ করার আগেই আরেকজন কাছে এসে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করতে লাগল।
চারপাশের মানুষগুলো যেন হঠাৎ দূরে সরে যাচ্ছে। পায়ের নিচের মাটি দুলছে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা।
অরফুলি কানের দুলে হাত দিতে চাইল। পারল না।
মনে হলো কেউ যেন তার শরীরের সমস্ত শক্তি কেড়ে নিয়েছে।
শেষবার সে শুধু অস্পষ্টভাবে বলল—
—“আমার... স্বামী... হাসপাতালে...”
তারপর সব অন্ধকার।
কিছুক্ষণ পর ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি দেখতে পেলেন, এক নারী মাটিতে পড়ে আছেন। কাছে গিয়ে ডাকলেন—
—“আপা! শুনতে পাচ্ছেন?”
কোনো সাড়া নেই।
এদিকে ওয়ার্ডে নাজমুল বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
—“অরফুলি এখনো আইল না ক্যান?”
পাশের বেডের রোগীর স্বজন বললেন,
—“আসতেছে হয়তো। হাসপাতালের ভিড় তো কম না।”
নাজমুল চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর কয়েকজন মানুষ অরফুলিকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে এলো। মুখে পানি দেওয়া হলো।
অরফুলির জ্ঞান ফিরতেই সে প্রথমে নিজের স্বামীকে খুঁজে তার ওয়ার্ডে গেলো।
অরফুলি দুর্বল হাতে স্বামীর হাত চেপে ধরল। নাজমুলের চোখে পানি।
—“তোমার কী হইছে?”
অরফুলি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো। তারপর কাঁদতে কাঁদতে কানের দিকে হাত দিলো।
—“আমার দুল... নাই।”
ঘরটা মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
দুল দুটো হয়তো খুব বড় কোনো সম্পদ ছিল না। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মায়ের মুখ, বিয়ের স্মৃতি, সংসারের অসংখ্য দিনের গল্প।
নাজমুল স্ত্রীর হাতটা শক্ত করে ধরে ছিল। অরফুলি তখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল ফুটওভার ব্রিজের সেই কয়েকটি মুহূর্ত—অচেনা মুখ, মাথা ঘুরে যাওয়া, শরীর নিস্তেজ হয়ে আসা, তারপর গভীর অন্ধকার।
হঠাৎ অরফুলি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আমি তো তোমারে দেখতে আইছিলাম... ভাবছিলাম তোমার পাশে দুই মিনিট বসুম। কিন্তু আমারেই লাশের মতো কইরা ফালাইয়া গেল!”
কথাটা শুনে পাশে থাকা স্বজনদের চোখও ভিজে উঠল।
নাজমুল কিছু বলতে পারল না। অসুস্থ শরীর নিয়েই সে স্ত্রীর মাথায় হাত রাখল।
—“তুমি ভয় পাইও না। দুলের চাইতে তুমি অনেক দামি।”
অরফুলি স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল।
কিন্তু সেই কান্নার ভেতরেই যেন আরেকটি ভয় ধীরে ধীরে মাথা তুলছিল।
আজ কানের দুল গেছে। কাল যদি কারও জীবনের আরও বড় কিছু চলে যায়?
হাসপাতালের বাইরে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ফুটওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে মানুষ আগের মতোই হেঁটে যাচ্ছে। কেউ জানে না, কয়েক ঘণ্টা আগেই ঠিক সেখানেই একজন নারী নিজের অসহায় শরীর নিয়ে পড়ে ছিলেন।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিজের রেলিং যেন নীরবে সেই ঘটনার সাক্ষী।
অরফুলি শেষবার কানের খালি জায়গাটায় হাত দিলো।
মায়ের দেওয়া দুল নেই।
কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর—তার নিরাপত্তার বিশ্বাসটাও যেন সেদিন ওই ফুটওভার ব্রিজেই পড়ে রইল।
হাসপাতালের করিডোরে নাজমুলের কণ্ঠ ভেসে এলো্,
—“অরফুলি, আমার কাছে আইছো তুমি... আল্লাহর রহমতে তুমি বাঁচছো। এইটাই বড় কথা।”
অরফুলি চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—“আমি বাঁচছি ঠিকই... কিন্তু আজ থেকে ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলেই মনে হইব—আবার কেউ পেছন থেইকা ডাকতেছে।”
শান্তা / শান্তা
“অনিন্দ্যর জন্য আকুলতা” জা কি র আ জা দ
“মাটির সুবাস ও আধুনিক নবান্ন” আব্দুল কাদের
“আতঙ্কের ছায়া” হানিফ রাজা
সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্মার্ট শিল্পকলা গড়তে চান রেজাউদ্দিন স্টালিন
শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর-এর ১৪টি ছোটকাকু প্রকাশিত
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
“সিগনেচার” সামছুল আলম শিমুল
“দিওয়ান-ই-শামস -ই তাবরিজি : জালালুদ্দিন রুমি ” এস ডি সুব্রত
“অন্ন ও অন্যায়” সুলেখা আক্তার শান্তা
“কাকতাড়ুয়া নাকি ভূত” আসাদ সরকার
“জীবন-প্রেমিক” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
“মেঘের এপিটাফ” জসীম উদ্দীন মুহম্মদ