অণুগল্প
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
তাড়াহুড়ো করে গোসল সেরে কোনোমতে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে তৈরি হলো অনিন্দ্য। সূর্যের তখন প্রচণ্ড উত্তাপ, ঠিক মাথার ওপর। বারবার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল সে। মেইন রোডে এসে অনেকক্ষণ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেও কোনো গাড়ি না পেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর আর কিছু না ভেবে রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, মাত্র বিশ মিনিট সময় বাকি। ছোঁয়াকে জীবনের শেষবারের মতো দু-চোখ ভরে দেখার আকাঙ্ক্ষায় সে দৌড়াতে শুরু করল।
হঠাৎ হোঁচট খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল অনিন্দ্য। একজন মধ্যবয়স্ক লোক তাকে টেনে তুললেন। লোকটি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— তুমি কে?
— এমনভাবে দৌড়াচ্ছ কেন?
অনিন্দ্য লোকটার চোখের দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু না বলে আবার দৌড়াতে শুরু করল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। নীরব কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।অনিন্দ্য কোনো কিছুকে উপেক্ষা না করে আবার দৌড়াতে আরম্ভ করে। অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছে অনিন্দ্য হাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু ততক্ষণে ছোঁয়ার শেষ বিদায়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে গেছে। দু-চালা বাড়ির পাশেই তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। কবরের নরম মাটিতে গেঁথে রাখা হয়েছে কয়েকটি খেজুরের ডাল, যা বাতাসে অনবরত দুলছে। মনে হচ্ছিল, যেন সেগুলোও ছোঁয়ার বিদায়ে নীরব সমবেদনা জানাচ্ছে।
অনিন্দ্য দৌড়ে কবরের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। কাঁপা হাতে মাটি স্পর্শ করে সে চিৎকার করে উঠল,
“হে খোদা! এত নিষ্ঠুর হলে কেন? আর একবার—শুধু একবার যদি তাকে দেখতে দিতেন! আমি কত পথ পেরিয়ে, কত বাধা অতিক্রম করে এসেছি, অথচ শেষবারের মতো তার মুখটাও দেখতে পারলাম না। এই আক্ষেপ নিয়ে কীভাবে বাঁচব আমি? কেন আমার ভাগ্যে এমন পরিণতি লিখে রেখেছিলেন?”
কথাগুলো বলতে বলতে সে কবরের ওপর মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে লাগল। দুপুরের প্রখর রোদ, দুলতে থাকা খেজুরের ডাল আর নিস্তব্ধ চারপাশ যেন তার কান্নার নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।
সেই মুহূর্তে অনিন্দ্যের মনে হলো, পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব হলো—প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার পর আর একবারও তাকে দেখতে না পারা।
সেদিনের পর থেকে অনিন্দ্য অনেকটাই চুপচাপ হয়ে গেল। ছোঁয়ার বেলি ফুল খুব পছন্দ ছিল। তার স্মৃতির উদ্দেশে কবরের পাশে একটি বেলি ফুলের চারা লাগিয়ে সে ফিরে এল।
এভাবেই কেটে গেল বহু বছর।
আজ অনিন্দ্যের বয়স সত্তর। একসময়কার ঘন কালো চুল সাদা হয়ে গেছে। মুখের চামড়ায় বয়সের গভীর ছাপ পড়েছে। শরীর নুয়ে এসেছে, লাঠির ওপর ভর দিয়েই চলতে হয় তাকে।
একদিন গভীর রাতে স্বপ্নে ছোঁয়াকে দেখল অনিন্দ্য। ছোঁয়া যেন কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু কিছু বলার আগেই তার ঘুম ভেঙে গেল।
স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে সে হতভম্ব হয়ে বসে রইল। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই লাঠিতে ভর দিয়ে ছোঁয়ার কবর দেখতে রওনা দিল। আবার সেই পুরোনো সাদা পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরে ধীরে ধীরে মেইন রোডে এসে দাঁড়াল।
অবাক হয়ে দেখল, একটি গাড়ি ঠিক তার সামনে এসে থেমেছে।
অনিন্দ্যের চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
কাঁপা কণ্ঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
— আজ তো আমার কোনো তাড়া নেই।
— কাউকে এক নজর দেখার কোনো আক্ষেপও নেই।
গাড়ির ভেতরে থাকা এক তরুণ হাত বাড়িয়ে তাকে তুলে নিল। হঠাৎ বহু বছর আগের সেই দিনের কথা মনে পড়ে গেল—যেদিন একজন মধ্যবয়স্ক লোক তাকে মাটি থেকে টেনে তুলেছিল।
অনিন্দ্য তরুণটিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।
তরুণটি বিস্মিত হয়ে বলল,
— কে আপনি?
— আর এভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন কেন?
অনিন্দ্য কোনো উত্তর দিল না।
অনেক চেষ্টা করেও তরুণটি তার কাছ থেকে কিছু জানতে পারল না।
কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার বলল,
— নামুন, আপনার ঠিকানায় এসে গেছি।
তরুণটি আবার হাত ধরে অনিন্দ্যকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল।
নামার আগে অনিন্দ্য ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— ভালো থেকো, খোকা।
লাঠিতে ভর দিয়ে কবরের কাছে পৌঁছে অনিন্দ্য বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
কবরের ওপর জন্মেছে ঘন সবুজ ঘাস। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেলি গাছটিতে আজ অগণিত ফুল ফুটেছে। ঝরে পড়া সাদা ফুলগুলো সবুজ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে।
অনিন্দ্যের মনে হলো, যেন ছোঁয়া বসে আছে সেখানে, আর বেলি ফুলগুলো তার চুলের বেণিতে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে।
কবরের পাশে বসে সে ধীরে ধীরে বলতে লাগল,
— জানো ছোঁয়া, আজ তোমাকে দেখার জন্য আমার কোনো তাড়া ছিল না।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে মুচকি হাসল।
তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— শুনছো ছোঁয়া? এ জন্মে তো শেষ দেখা হলো না।
— পরের জন্মে না হয় মন ভরে দেখব।
বাতাসে বেলি ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। চারপাশ নিস্তব্ধ।
অনিন্দ্য কবরের পাশে মাথা রেখে চোখ বুজল।
মনে হলো, বহু বছরের অপেক্ষার পর আজ তার আর কোনো আক্ষেপ নেই।
শান্তা / শান্তা
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
“সিগনেচার” সামছুল আলম শিমুল
“দিওয়ান-ই-শামস -ই তাবরিজি : জালালুদ্দিন রুমি ” এস ডি সুব্রত
“অন্ন ও অন্যায়” সুলেখা আক্তার শান্তা
“কাকতাড়ুয়া নাকি ভূত” আসাদ সরকার
“জীবন-প্রেমিক” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
“মেঘের এপিটাফ” জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
`ভাদ্র মাসের ভূত' শাহজালাল সুজন
‘নজরুল বর্ষ: কেবল একটি বর্ষপঞ্জি নয় মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের আন্দোলন’
`নজরুল জাতীয় জীবনের এক অনন্য আলোকবর্তিকা—সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নজরুল একাডেমির সভাপতি মসউদ মান্নান''
‘দুঃখ ভাঙার রূপকথা’ সুলেখা আক্তার সান্তা
‘শরৎ এলো’
‘ঘুরে দাঁড়ানো’
Link Copied