ঢাকা শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬

সাঈদুর রহমান লিটন

ফুলি চাচির সম্ভাব্য রেডকার্ড


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০-৭-২০২৬ রাত ৯:১২

 

সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। আকাশের এমন কান্না দেখে মনে হচ্ছে সুইজারল্যান্ড আগে থেকেই হেরে বসে আছে। কিন্তু টিভির সামনে বসে থাকা মাজেদ চাচার চোখে-মুখে শুধু একটাই নাম—আর্জেন্টিনা। সেই ম্যারাডোনার আমল থেকে তিনি এমন ভক্ত যে, কেউ যদি বলে আর্জেন্টিনা হারবে,  সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে তিন মাস কথা বন্ধ করে দেন।

খেলা ফুলটাইমে ১-১। অতিরিক্ত সময় চলছে। চাচার অবস্থা এমন, যেন মাঠে মেসির সঙ্গে তিনিও দৌড়াচ্ছেন। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠলেন ফুলি চাচি।

— এই শুনছো! ঘরে একটা আলুও নাই। বাজারে যাও!

মাজেদ চাচা শুনেও না শোনার ভান করলেন। টিভির দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন, এখনই শেষ... এখনই শেষ...।

ফুলি চাচি বুঝলেন, এই শেষ, আর শেষ হবে না। তাই কোনো কথা না বলে এক জগ ঠান্ডা পানি এনে ধপাস করে চাচার মাথায় ঢেলে দিলেন।

— খেলা দেখলেই যদি পেট ভরতো, তাইলে চাল-ডাল লাগত না!

চাচা ভিজে ইঁদুরের মতো মুখ করে উঠে জামা বদলালেন। ছাতা হাতে নিলেন। বারান্দায় ঝোলানো একটা ব্যাগও তুলে নিলেন। নিতে নিতে মনে মনে বললেন,

এই মহিলারে যদি রেফারি লাল কার্ড দেখাইতে পারত!

বাড়ির পেছনের কাঁচা রাস্তা বৃষ্টিতে একেবারে সাবানের মতো পিচ্ছিল। কিন্তু চাচার মাথায় রাস্তা নেই, আছে শুধু আর্জেন্টিনা।

হঠাৎ... ধপাস!

এমন শব্দ হলো যে পাশের পুকুরের ব্যাঙও এক লাফে পানিতে ডুব দিল।

চাচা চিৎপটাং হয়ে কাদার মধ্যে পড়ে রইলেন।

মুখ থেকে বের হলো, ওরে বাপরে! আমার মাজা!"

দুই সেকেন্ড পরই চারদিকে তাকালেন।

কেউ দেখল নাকি?

না, মানুষ নেই। কিন্তু পাশের একটা ছাগল দাঁত বের করে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন সবই দেখেছে!

চাচা তাড়াতাড়ি উঠে কাপড় ঝাড়লেন। মনে মনে ভাবলেন, ভাগ্যিস ফুলি দেখে নাই। দেখলে আজীবন গল্প শুনাইত!

বাজারের কাছেই একটা চায়ের দোকান। সেখানে বিশাল টিভিতে খেলা চলছে। চাচা ভাবলেন,

এক মিনিট দাঁড়াই। গোল হইলেই বাজার করুম।

সেই এক মিনিট আর শেষ হয় না।

চা-ওয়ালা এক কাপ চা ধরিয়ে দিল।

— চাচা, গরম গরম খান।

এক কাপ শেষ।

আরেক কাপ।

তারপর আরেক কাপ।

এদিকে বাজারের কথা এমনভাবে উধাও হয়েছে, যেন ভিএআরে অফসাইডে ধরা পড়েছে।

হঠাৎ... গোওওওওল!

আর্জেন্টিনা গোল দিল!

চাচা এমন লাফ দিলেন যে হাতে থাকা চা পাশের লোকের লুঙ্গিতে পড়ল।

লোকটা চিৎকার করে উঠল, এই চাচা! চা না ফুটবল?

চাচা শুনলেনই না। তিনি তখন সবাইকে জড়িয়ে ধরে বলছেন, বলছিলাম না! আর্জেন্টিনা!

কিছুক্ষণ পর আবার গোল।

এবার তো চায়ের দোকানই ছোটখাটো স্টেডিয়াম।

চাচা আনন্দে একজনকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে গিয়েছিলেন। পরে বুঝলেন লোকটা সুইজারল্যান্ডের সমর্থক!

লোকটা মুখ বাঁকিয়ে বলল, চাচা, গোল আপনারা দিছেন, চুমু আমাকেই কেন?

আড্ডা, খেলার বিশ্লেষণ, মেসির প্রশংসা, সব মিলিয়ে কখন যে দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়েছে, চাচা টেরই পেলেন না।

বৃষ্টি তখনও ঝরছে।

চাচা খুশি মনে বাড়ির পথে হাঁটলেন।

বাড়ির দরজায় পা দিতেই ফুলি চাচির চোখ পড়ল চাচার হাতে।

হাত ফাঁকা। ছাতা নাই। বাজার নাই।

ফুলি চাচি কপালে হাত দিয়ে বললেন,

— বাজার কই?

চাচা থতমত।

— এই যে... মানে... আছিল...

— ছাতা কই?

চাচা এবার মাথায় হাত দিলেন।

ছাতা? হায় আল্লাহ!

চায়ের দোকানেই রেখে এসেছেন!

ফুলি চাচি এবার এমন এক হুংকার দিলেন যে পাশের বাড়ির মুরগি ডিম দেওয়া বন্ধ করে দিল।

— তিন ঘণ্টা পরে আইছো। বাজার নাই, ছাতা নাই! তুমি বাজারে গেছিলা, না বিশ্বকাপ খেলতে?

মাজেদ চাচা কোনো উত্তর দিলেন না।

নীরবে ঘুরে দাঁড়ালেন।

আবার বৃষ্টির মধ্যে হাঁটা দিলেন বাজারের দিকে।

পেছন থেকে ফুলি চাচির শেষ নির্দেশ ভেসে এল,

— এইবার যদি ছাতার বদলে চায়ের কেটলি নিয়া আসো, তাইলে কিন্তু ঘরে ঢুকতে দিমু না!

মাজেদ চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কবে যে এই মহিলা

রেডকার্ড দেখবে!  বারবার ফাউল করে!

 

 

 

শান্তা / শান্তা