ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

দুই দশকে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষা-গবেষণায় অগ্রযাত্রা


রবিউল ইসলাম শাকিল photo রবিউল ইসলাম শাকিল
প্রকাশিত: ১-৮-২০২৬ দুপুর ৩:৪৮

‎মময়মনসিংহের ত্রিশাল। যে জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি, সেই ত্রিশালেই তাঁর নামকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই সেই নজরুলময় আবহ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোথাও অগ্নিবীণা, কোথাও বিদ্রোহী; কোনো আবাসিক হলের নাম দোলনচাঁপা, কোনো বাসের নাম কুহেলিকা। হাসপাতালের নাম ‘ব্যথার দান’, উপাচার্যের বাসভবন ‘দুখু মিয়া বাংলো’। আর ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্রে স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ‘চির উন্নত মম শির’—বিদ্রোহী কবির অদম্য চেতনার প্রতীক।

‎নজরুলের সাহিত্য, জীবন ও দর্শনের এমন দৃশ্যমান উপস্থিতিকে সঙ্গী করেই দুই দশকের পথ পেরিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ২০ বছরের এই যাত্রায় শুধু কবির স্মৃতি ও সৃষ্টিকে ধারণ করেই থেমে থাকেনি প্রতিষ্ঠানটি; শিক্ষা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ধীরে ধীরে বিস্তৃত করেছে নিজের পরিসর। 

‎২০০৫ সালের ১ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরের বছর ২০০৬ সালের ২৫ মে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন। বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।

‎নামেই যেন নজরুলের গল্প

‎এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব শুধু নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাম্পাসের স্থাপনা থেকে পরিবহন—প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে নজরুলের সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত নাম।

‎চারটি আবাসিক হলের নাম—অগ্নিবীণা, দোলনচাঁপা, বিদ্রোহী ও শিউলিমালা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলোও যেন কবির সাহিত্যভুবনের একেকটি পরিচয় বহন করছে। বাঁধনহারা, ঝিলিমিলি, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা, দূরের বন্ধু ও প্রলয়শিখি—এসব নামেই পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস।

‎শুধু হল বা বাস নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালের নাম ‘ব্যথার দান’। উপাচার্যের সরকারি বাসভবন ‘দুখু মিয়া বাংলো’ এবং গেস্ট হাউজের নাম ‘সেতুবন্ধন’।

‎শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসনের ডরমিটরিগুলোর নামও নজরুলের সাহিত্যকর্ম থেকে নেওয়া—সন্ধ্যা তারা, বন্ধন, পুবের হাওয়া ও ব্রহ্মপুত্র।

‎ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও রয়েছে কবির দর্শনের প্রতিফলন। নজরুল ভাস্কর্য, ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ভাস্কর্য, ‘চির উন্নত মম শির’ স্মৃতিস্তম্ভ এবং ‘গাহি সাম্যের গান’ মঞ্চ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের সঙ্গে নজরুলের চেতনার একটি দৃশ্যমান যোগসূত্র তৈরি করেছে।

‎শ্রেণিকক্ষ ছাড়িয়ে গবেষণার পরিসর

‎শুধু পাঠদানে নয়, গবেষণাতেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। গবেষণা ও সম্প্রসারণ কেন্দ্রের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯৫০টি গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়েছে। এসব গবেষণার ফলাফল দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে।

‎গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রার আরেকটি স্বীকৃতি এসেছে নেচার ইনডেক্সে। ‘নেচার ইনডেক্স-২০২৬’-এ প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

‎শিক্ষার্থীদের পাঠ ও গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। পাঁচতলা এই লাইব্রেরিতে রয়েছে ৪০ হাজারের বেশি বই। প্রতিদিন সেখানে শিক্ষার্থীদের কেউ পাঠে, কেউ গবেষণায়, আবার কেউ চাকরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকেন।

‎নজরুলকে জানার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ
‎নজরুলকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্চা শুধু ভাস্কর্য কিংবা নামকরণের মধ্যেই থেমে নেই। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।
‎‎এখানে জাতীয় কবির সাহিত্য, জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য ‘নজরুল স্টাডিজ’ কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে নজরুলবিষয়ক কয়েকটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছে।

‎দক্ষতা তৈরিতেও গুরুত্ব
‎‎বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম এখন আর শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে ক্যাম্পাসে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন সংগঠন ও ক্লাব।
‎‎রোটারেক্ট ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট ক্লাব (এসডিসি), মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন ক্লাব, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, দলগত কাজ, যোগাযোগ দক্ষতা ও পাবলিক স্পিকিংয়ের মতো বিষয়ে কাজ করছে। সাহিত্যচর্চায় রয়েছে শব্দকুঞ্জ। পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে আর্থ ক্লাব ও গ্রিন ক্যাম্পাস। সংগীত ও নৃত্যচর্চার জন্য রয়েছে ব্যান্ড মিউজিক সোসাইটি ও ডান্স ক্লাব।
‎‎সাংবাদিকতায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি। এর মাধ্যমে বাস্তবমুখী সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

‎বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এসব সংগঠন ও ক্লাব শিক্ষার্থীদের একদিকে সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য তাদের আরও দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।

‎বাড়ছে অবকাঠামো, তৈরি হচ্ছে নতুন পরিসর
‎‎শিক্ষার্থী সংখ্যা ও কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নও অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়টি একাডেমিক ভবন রয়েছে।
‎শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা বাড়াতে ছেলেদের জন্য একটি পাঁচতলা এবং দুটি ১০ তলা আবাসিক হল নির্মাণাধীন। মেয়েদের জন্যও একটি পাঁচতলা ও দুটি ১০ তলা আবাসিক হল নির্মাণ করা হচ্ছে।‎শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য বর্তমানে রয়েছে পাঁচটি ডরমিটরি। আরও চারটি ডরমিটরি নির্মাণাধীন। পাশাপাশি রয়েছে একটি গেস্ট হাউজ। ‎পাঠ ও গবেষণার জন্য পাঁচতলা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুটি পাঁচতলা প্রশাসনিক ভবন এবং উপাচার্য ও ট্রেজারারের জন্য পৃথক বাসভবন রয়েছে।

‎আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বর্তমানে ইনস্টিটিউট ভবন, টিএসসি (টিচার্স-স্টুডেন্টস সেন্টার), বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি প্রধান প্রবেশদ্বার, আবাসিক হল ও ডরমিটরির নির্মাণকাজ চলছে। এসব প্রকল্প শেষ হলে শিক্ষা, আবাসন ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সেবার পরিসর আরও বাড়বে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

‎লক্ষ্য মানসম্মত ও শিক্ষার্থীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয়
‎‎বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি মানসম্মত, উন্নত এবং শিক্ষা ও শিক্ষার্থীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলাই বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য। এ জন্য শিক্ষা, গবেষণা, সুশাসন ও অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

‎তিনি বলেন, ‘আমি শূন্য থেকে শুরু করতে চাই, কিন্তু পরিপূর্ণ হয়ে ফিরে যেতে চাই। ব্যক্তি হিসেবে আমি কেবল একটি মাধ্যম, বাস্তবায়নের দায়িত্ব সবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।’

‎প্রতিষ্ঠার দুই দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই শুধু অর্জনের হিসাব নয়, রয়েছে আরও বড় হওয়ার প্রত্যাশাও। যে কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়, তাঁর সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্রোহের চেতনা ধারণ করে শিক্ষা ও গবেষণায় আরও এগিয়ে যাওয়াই এখন প্রতিষ্ঠানটির বড় চ্যালেঞ্জ। ত্রিশালের মাটিতে দুই দশকের যাত্রা পেরিয়ে সেই পথেই এগোচ্ছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এমএসএম / এমএসএম

‎নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির এক যুগে পদার্পণ

ডিআইইউ ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি হলেন রাকিবুল ইসলাম

এসএসসি-সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এ বড় ধস, কমলো ২২ হাজার ৩৫৬

চট্টগ্রাম বোর্ডে ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার

মন খুলে গান গাওয়া যায়, নাম্বার দেওয়া যায় না : শিক্ষামন্ত্রী

এসএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ সকাল ১০টায়

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ সোমবার সকাল ১০টায়, যেভাবে জানা যাবে

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালিত

‘সহিংসতার আহ্বান নয়, ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদ’: বিতর্কিত মন্তব্যের ব্যাখ্যা গকসু এজিএসের

মালয়েশিয়ায় গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি ইন্টার্ন ডাক্তাররা

ডিআইইউতে অর্থনীতি বিভাগের রিসার্চ মনোগ্রাফ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

আপত্তিকর ক্যাপশনসহ ভিডিও প্রচারের অভিযোগে আটক, মুচলেকায় মুক্তি