ঋষি মাশরুমে নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশে ঔষধিগুণসম্পন্ন ঋষি (রেইশি) মাশরুমকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যসম্ভাবনা। দেশের মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে এই উচ্চমূল্যের মাশরুমের উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্যান্সার গবেষণা, হার্বাল স্বাস্থ্যপণ্য, কসমেটিকস, চা, কফি ও খাদ্য-পরিপূরক তৈরিতে ব্যবহৃত রেইশি মাশরুম এখন বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের কাছেও হয়ে উঠছে সম্ভাবনাময় একটি কৃষিপণ্য। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৪২ হাজার টন মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ৮০০ কোটি টাকারও বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণা, মানসম্মত উৎপাদন এবং মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে রেইশি মাশরুম হতে পারে বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি সম্ভাবনার অন্যতম খাত।
মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, দেশের আবহাওয়া রেইশি মাশরুম চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় এটি সারা বছর উৎপাদন করা সম্ভব। অন্যান্য অনেক কৃষিপণ্যের তুলনায় এর সংরক্ষণকাল দীর্ঘ এবং শুকিয়ে বা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করে সহজেই বাজারজাত করা যায়। ফলে কৃষকের জন্য এটি লাভজনক এবং উদ্যোক্তাদের জন্য উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে
বিবেচিত হচ্ছে। মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের পরিচালক ড. আকতার জাহান কাঁকন বলেন, ঔষধিগুণসম্পন্ন রেইশি মাশরুম বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ফসল। দেশের বিভিন্ন জেলায় উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন করছেন। রেইশি থেকে ক্যাপসুল, ট্যাবলেট, চা, কফি, স্বাস্থ্যপানীয় ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরি করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারেও এ ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।
তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, গবেষণা এবং উদ্যোক্তা তৈরির কাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও গবেষণা ও উন্নতমানের মাতৃবীজ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে দেশের ৩৩টি হর্টিকালচার সেন্টার এবং মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটকে
রেইশি মাশরুমে ৪০০-এর বেশি জৈব-সক্রিয় উপাদান রয়েছে। এটি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও সামগ্রিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে, তবে এটিকে কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে দাবি করা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়
অধ্যাপক ডা. মো. বজলুল করিম, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগ, মুন্নু মেডিকেল কলেজ
বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে
ভবিষ্যতেও উদ্যোক্তারা উন্নত স্পন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন।
ড. কাঁকন বলেন, প্রতিবছর গবেষণা খাতে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে রেইশিসহ বিভিন্ন মাশরুমের নতুন ব্যবহার ও উৎপাদন প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ চলছে। মুন্নু মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. বজলুল করিম বলেন, রেইশি বা গ্যানোডারমা বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঔষধি মাশরুম। এতে পলিস্যাকারাইড, বিটা-গুকান, ট্রাইটারপেনয়েড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ ৪০০-এর বেশি জৈব-সক্রিয় উপাদান রয়েছে, যা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে
সমর্থন, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমানো এবং শরীরের বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তার ভাষায়, গবেষণায় প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ, হৃদ্ স্বাস্থ্য, লিভার সুরক্ষা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং ক্যান্সার গবেষণায় সম্ভাব-নাময় ফল পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে রেইশিকে কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা বা ওষুধ বলা যাবে না। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি একটি সহায়ক খাদ্য-উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রেইশি মাশরুম নিয়ে কাজ করা নারী উদ্যোক্তা মরিয়ম আক্তার লতা বলেন, দেশে এ মাশরুমের সম্ভাবনা অনেক হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এর উপক-ারিতা সম্পর্কে সচেতনতা এখনও সীমিত। বর্তমানে নিরাপত্তা ও খাদ্যোপযোগিতা পরীক্ষা শেষে রেইশি মাশরুম পাউডার বাজারজাত করা হচ্ছে, যা ভোক্তাদের আস্থা বাড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, গবেষণা ও শিল্পায়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে রেইশি মাশরুমকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষি বর্জ্যকে ব্যবহার করে কম খরচে রেইশি মাশরুম উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব কৃষি-শিল্প হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের অনুকূল জলবায়ু, সহজলভ্য কাঁচামাল এবং ক্রমবর্ধমান উদ্যোক্তা আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
এ লক্ষ্যে মাশরুমকে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে অন্তর্ভুক্ত করতে পুষ্টিবিদ, চিকিৎসক, কৃষি তথ্য সার্ভিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউটিউবভিত্তিক 'মাশরুম রান্নাঘর' এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মাশরুমের পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার সম্পর্কে প্রচার চালানো হচ্ছে।
রেইশি মাশরুম ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন। জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, গলব্লাডারে পাথর ধরা পড়ার পর তিনি তিন মাস নিয়মিত রেইশি মাশরুমের পাউডার পান করেছেন এবং পরে নিজেকে আগের চেয়ে সুস্থ অনুভব করেছেন।
একইভাবে সবুজ সরকার জানান, দীর্ঘদিন বাম হাতে টিউমারের সমস্যার পর প্রায় এক বছর রেইশি মাশরুমের পাউডার ব্যবহার করেন। পরে চিকিৎসা পরীক্ষায় আগের টিউমার শনাক্ত হয়নি বলে তাকে জানানো হয়। তবে চি-কিৎসকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এ ধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো চিকিৎসা-কার্যকারিতার প্রমাণ নয় এবং রোগের চিকিৎসায় অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে মাশরুম খাত ইতোমধ্যে একটি সম্ভাবনাময় কৃষি-শিল্পে রূপ নিতে শুরু করেছে। উৎপাদন প্রযুক্তিতে দেশীয় সাফল্য, গবেষণার অগ্রগতি, উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ এবং মূল্যসংযোজিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ- সব মিলিয়ে রেইশি মাশরুম দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতি-সহায়তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে এই খাত ভবিষ্যতে দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম নতুন উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
Aminur / Aminur
সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার
দিনভর পানি নিষ্কাশন, ফুটপাত দখলমুক্তে তৎপর ছিলেন প্রশাসক, তবুও ভোগান্তি
‘দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে’
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর উপায় নিয়ে কানাডার সঙ্গে আলোচনা
আলজেরিয়াকে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান হুমায়ুন কবিরের
জলবায়ু পরিবর্তনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঝুঁকি নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর উদ্বেগ
ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৫৯৩
সাতক্ষীরার অভিজ্ঞতায় উপকূলে পানি সংকট মোকাবিলার আহ্বান
ডিসেম্বরের মধ্যেই জুলাই সনদের আলোচনা শেষ করে সংসদে রিপোর্ট পেশ করা হবে
সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক বর্জন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের
মিরপুর বাংলা কলেজে ছাত্রলীগ সন্দেহে শিক্ষার্থী আটক
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোস্টগার্ড মহাপরিচালকের সৌজন্য সাক্ষাৎ