ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ঈমান, মহব্বত ও কৃতজ্ঞতার মহিমান্বিত প্রকাশ!


মোহাম্মদ আনোয়ার photo মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: ২৪-৮-২০২৬ দুপুর ৪:১০

১২ রবিউল আউয়াল—পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ। এটি শুধু ইতিহাসের একটি দিন স্মরণের উপলক্ষ নয়; বরং মহান আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ-এর প্রতি একজন মুমিনের ঈমান, মহব্বত, আদব, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার এক মহিমান্বিত উপলক্ষ।

যে প্রিয়নবী ﷺ-এর মাধ্যমে আমরা পবিত্র কুরআন পেয়েছি, তাওহীদের পূর্ণ শিক্ষা পেয়েছি, ইবাদতের পথ জেনেছি, হালাল-হারাম চিনেছি এবং মহান রবের সন্তুষ্টি ও নাজাতের পথের সন্ধান পেয়েছি—তাঁর শুভাগমন স্মরণে আনন্দিত হওয়া, আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করা এবং তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা মুমিনের হৃদয়ের স্বাভাবিক ঈমানি অনুভূতি।

মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুল ﷺ সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-—“ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামীন।” অর্থাৎ, “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”
—সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭

যিনি মহান রবের পক্ষ থেকে সমগ্র জগতের জন্য রহমাতুল্লিল আলামীন ﷺ, তাঁর শুভাগমনের স্মরণে একজন মুমিনের হৃদয় মহব্বত, আনন্দ ও কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠবে—এটাই স্বাভাবিক। প্রিয়নবী ﷺ-কে ভালোবাসা, সর্বোচ্চ আদব ও সম্মান করা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণে জীবন গড়ার আকাঙ্ক্ষা একজন মুসলমানের ঈমানি চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই আনন্দ কোনো পার্থিব উৎসবের ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস নয়। এ হলো রহমত লাভের আনন্দ, হেদায়াতের আলো পাওয়ার আনন্দ, ঈমানের পথ চিনে নেওয়ার আনন্দ এবং সর্বোপরি মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ-এর উম্মত হওয়ার পরম সৌভাগ্যের আনন্দ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন—কোনো ব্যক্তির ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না, যতক্ষণ না তিনি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হন। কী গভীর এই শিক্ষা! মহব্বতে রাসুল ﷺ তাই মুমিনের জীবনের অলংকারমাত্র নয়; ঈমানের পূর্ণতার অপরিহার্য দাবি।

তবে এই মহব্বতের সর্বোত্তম সৌন্দর্য প্রকাশ পায় আনুগত্যে। তাই ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ-এর মাহফিল কেবল একটি সমাবেশ নয়; এটি প্রিয়নবী ﷺ-এর সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক নবায়নের উপলক্ষ। সেখানে কুরআন তিলাওয়াত হোক, সীরাতে মুস্তফা ﷺ আলোচনা হোক, দরুদ-সালামে জবান সিক্ত হোক, গরিব-এতিম-অসহায়ের হাতে সদকা ও খাবার পৌঁছাক এবং প্রতিটি হৃদয়ে সুন্নাহ অনুসরণের নতুন অঙ্গীকার জেগে উঠুক।

ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ-কে তাই শুধু “উৎসব” শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে এর গভীরতা ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে আত্মিক পুনর্জাগরণ, ঈমান নবায়ন এবং নিজের জীবনকে সীরাতে মুস্তফা ﷺ-এর আয়নায় দেখার এক পবিত্র আহ্বান।

১২ রবিউল আউয়ালে প্রিয়নবী ﷺ-এর শুভাগমন স্মরণ করতে গিয়ে একজন মুমিন নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারেন—

আমি কি সত্যবাদী?
আমি কি আমানতদার?
দুর্বল, এতিম ও অসহায়ের প্রতি আমি কি দয়ালু?
আমার প্রতিবেশী কি আমার কাছ থেকে নিরাপদ?
আমার ব্যবসা ও লেনদেন কি প্রতারণামুক্ত?
পরিবারের প্রতি আমি কি নম্র ও দায়িত্বশীল?
আমার জীবনে কি সুন্নাতে মুস্তফা ﷺ-এর সৌন্দর্য প্রতিফলিত হচ্ছে?

এই আত্মজিজ্ঞাসার মধ্যেই মিলাদের আনন্দ তার গভীরতম তাৎপর্য খুঁজে পায়। যখন একজন মুমিন নিজের ভুলের জন্য তাওবা করেন, হৃদয়ে মহব্বতে রাসুল ﷺ আরও গভীর করেন এবং সুন্নাহর পথে চলার অঙ্গীকার নবায়ন করেন—তখন মিলাদের আলোকসজ্জার সঙ্গে হৃদয়ও আলোকিত হয়; দরুদের সঙ্গে চরিত্রও সুন্দর হয়; তবারকের সঙ্গে অসহায়ের হকও আদায় হয়।

এটাই মিলাদের সুন্দর শিক্ষা—আনন্দ থেকে শোকর, শোকর থেকে মহব্বত, মহব্বত থেকে আনুগত্য, আনুগত্য থেকে নেক আমল এবং নেক আমলের মাধ্যমে মহান আল্লাহর রহমত ও নাজাতের প্রত্যাশা।

মহান আল্লাহ বলেন—
“কুল ইন কুনতুম তুহিব্বুনাল্লাহা ফাত্তাবিউনি ইউহবিবকুমুল্লাহ।”
অর্থাৎ, “বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:৩১

অতএব সত্যিকারের রাসুলপ্রেম শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তার প্রতিফলন ঘটতে হবে আমাদের আখলাক, ইবাদত, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবার, সমাজ, দয়া, ন্যায়বোধ ও মানবিকতায়।

ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো নতুন প্রজন্মকে তাদের সর্বোত্তম আদর্শের সঙ্গে পরিচিত করা। আমাদের সন্তানদের জানতে হবে—তাদের প্রিয়নবী ﷺ ক্ষমতা পেয়েও ক্ষমা করেছেন, নির্যাতন সহ্য করেও মানুষের হেদায়াত কামনা করেছেন, এতিমের পাশে দাঁড়িয়েছেন, নারীর মর্যাদা রক্ষা করেছেন, শ্রমিকের অধিকার শিখিয়েছেন এবং ব্যবসায় সততা ও আমানতদারির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

তাই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ হোক মহব্বতে মুস্তফা ﷺ নবায়নের দিন; দরুদে জবান সিক্ত করার দিন; সীরাত জানার দিন; অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর দিন এবং নববী আদর্শকে জীবনে প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকারের দিন।

আমাদের হৃদয়ের ভাষা হোক—
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মত।
আমাদের ঈমানের ঘোষণা হোক—
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ।”

আর আমাদের জীবনের অঙ্গীকার হোক—প্রিয়নবী ﷺ-কে ভালোবাসব, তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ আদব রাখব, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করব এবং তাঁর শেখানো সত্য, দয়া, ন্যায়, ক্ষমা ও মানবতার আলো পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।

আমাদের প্রার্থনা মহান রবের নিকট-কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব, আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ-এর শাফাআত লাভের সৌভাগ্য আমাদের দান করুন। হাউজে কাউসারে তাঁর পবিত্র হাতে পানি পান করার সৌভাগ্য নসিব করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর সান্নিধ্যে স্থান লাভের পরম সৌভাগ্য দান করুন।

“আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক আলা সাইয়্যিদিনা ওয়া মাওলানা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি আজমাঈন।” ﷺ

আমাদের হৃদয়ের চিরন্তন সাক্ষ্য, আমাদের ঈমানের অমলিন ঘোষণা—
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ।”
আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ আল্লাহর বান্দা, প্রিয় হাবীব ও সর্বশেষ রাসুল।

হে মহান রব, আমাদের হৃদয়কে মহব্বতে মুস্তফা ﷺ-এ সিক্ত রাখুন, জবানকে দরুদ ও সালামে সুবাসিত রাখুন এবং জীবনকে তাঁর পবিত্র সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করুন। ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু, কিয়ামতের ময়দানে তাঁর শাফাআত এবং জান্নাতে তাঁর সান্নিধ্য আমাদের নসিব করুন।
মারহাবা ইয়া মুস্তফা ﷺ!
মারহাবা ইয়া হাবীবাল্লাহ ﷺ!
মারহাবা ইয়া রহমাতাল্লিল আলামীন ﷺ! 

আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

লেখক:
প্রধান নির্বাহী উপদেষ্টা 
বাংলাদেশ রেজভীয়া তালিমুস সূন্না বোর্ড ফাউন্ডেশন

এমএসএম / এমএসএম