বছর আসে বছর যায়, রোহিঙ্গারা যায় না
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হয়ে আজ (মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট) দশ বছরে পড়ছে। এই সময়ে বাংলাদেশে দুটি রাজনৈতিক দল ও একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল। প্রত্যেক সরকার রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে ছিল এক— রোহিঙ্গারা তাদের নিজ ভূমি রাখাইনে ফিরে যাবে, তাদের প্রত্যাবাসন করতে হবে।কিন্তু এই সময়ে মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের ৭ বছর, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাস এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস কেটে গেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা এখনো সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, কবে নাগাদ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে বা আদৌ রোহিঙ্গাদের রাখাইনে পাঠানো সম্ভব হবে কি না— সেই প্রশ্ন প্রতি বছরের এই সময়ে সামনে আসে।
ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। ছয় মাস পার করা এই সরকার বলছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবসন এই সংকটের একমাত্র সমাধান। একইসঙ্গে তারা এ সংকট দীর্ঘায়িত করা এবং সমাধান না করতে পারার ক্ষেত্রে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কথা বলছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ এমন একটি সংকটের অসম পরিমাণ প্রভাব ও বোঝা বহন করে চলেছে, যা বাংলাদেশ তৈরি করেনি। রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা, কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক মনোযোগ একটি বৃহত্তর কাঠামোর মাধ্যমে আসা উচিত। বাংলাদেশকে যেসব পরামর্শ বা প্রস্তাব দেওয়া হয়, সেগুলো মিয়ানমার সরকারকেও স্পষ্ট ভাষায় দেওয়া উচিত।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে গত এক দশকে বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নানা কূটকৌশল অবলম্বন করতে দেখা গেছে মিয়ানমারকে। দেশটি কূটকৌশল হিসেবে প্রত্যেক সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের তালিকা নিয়ে নয়ছয় করেছে। বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হলেই নতুন সরকারের কাছে আগের তালিকা বাদ দিয়ে নতুন তালিকা সামনে এনেছে।
চলতি মাসে মিয়ানমার দাবি করেছে, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
আর ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে দেশটি।
শুধু তাই নয়, সেখানে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ দাবি করে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই। অবশ্য মিয়ানমারের এই দাবি প্রত্যাখান করেছে ঢাকা। বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াউ সোয়ে মোয়ে ডেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংখ্যাসহ বিবৃতিতে দেওয়া অনেক বিষয় ছিল ‘ভুল পরিসংখ্যান নির্ভর’। তাদের সঠিক সংখ্যার প্রতিফলন জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় তাদের নিবন্ধনের মধ্যেই রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দ্বিপক্ষীয় মতৈক্যের ওপর ভিত্তি করে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার কথা রাষ্ট্রদূতকে বলেছেন মহাপরিচালক। এক্ষেত্রে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পরও বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা নবাগতদেরও বিষয়ে বিবেচনায় নিতে হবে।
তাদের নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় আছে বাংলাদেশ এবং ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য যথা সময়ে মিয়ানমার সরকারকে দেওয়া হবে। ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে নতুন যোগ করা তথ্যাবলিও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করেছে ঢাকা।
রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক পূর্ণ হলেও এর স্থায়ী সমাধান হয়নি। সেজন্য একটি শঙ্কার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, এ সংকটকে ১০ থেকে ২০ বছরে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
শামা ওবায়েদ বলেন, দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক— উভয় আলোচনার মাধ্যমেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের একটি সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। বাংলাদেশ আশ্রয় দিতে পারে, মানবিক সহায়তা দিতে পারে, তাদের মর্যাদা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশ একা এমন একটি সংকটের সমাধান করতে পারে না, যা বাংলাদেশ তৈরি করেনি। আমি একটি বিষয়ে একদম স্পষ্ট করে বলতে চাই, মানবিক সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তবে এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর টেকসই সমাধানও চূড়ান্তভাবে মিয়ানমারকেই খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো রাখাইন রাজ্য অর্থাৎ তাদের নিজস্ব জন্মভূমিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। এটি কেবল কোনো কূটনৈতিক পছন্দ নয়, এটিই সামনে এগোনোর একমাত্র টেকসই পথ।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, রাজনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এই বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে, মানবিক সহায়তা সেগুলোর সমাধান করতে পারে না। এই বাস্তুচ্যুতি যত দীর্ঘায়িত হবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। বাংলাদেশের জন্য মূল উদ্দেশ্য শুধু বাস্তুচ্যুতির কষ্ট বা সংকট সামলানো নয়, বরং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন সম্ভব করে তোলা। একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন কাঠামোর একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে বুঝতে হবে। বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার পক্ষের মধ্যে ইতিমধ্যেই গৃহীত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে একটি কার্যকর ও দ্রুত যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব আমরা স্বীকার করেছি। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা হলো,এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি কালক্ষেপণ ও বিলম্ব করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব বলেন, এই সংকটের প্রভাব কেবল বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বঙ্গোপসাগর, আসিয়ান এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। তাই চ্যালেঞ্জ হলো এটি নিশ্চিত করা যে সমস্ত উদ্যোগ যেন খণ্ডিত না হয়ে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক মাত্রা বিশিষ্ট একটি আঞ্চলিক মানব নিরাপত্তার সংকট হিসেবে মোকাবিলা করা উচিত।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে স্রোতের মত ঢুকতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। যেখানে আগে থেকেই ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও চার লাখ। কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে এখন বসবাস করছে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ওই বছরের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় মিয়ানমারের অং সান সু চির সরকার। এরপর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেও তারা সই করে।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার একপর্যায়ে ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি রোহিঙ্গারা, ফলে ভেস্তে যায় আলোচনা।
এরপর আসে কোভিড মহামারি। এতে করে রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগেও বিঘ্ন ঘটে। বিশ্বজুড়ে সেই সংকটের মধ্যেই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সু চির সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন মিয়ানমারের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। তাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আসে নতুন ধাক্কা।
এর মধ্যে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে কয়েকবার রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি অনেকটা আড়ালে চলে যায়।
aliul / aliul
৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনবে টিসিবি
রোহিঙ্গাদের ফেরার অধিকার রয়েছে, তবে প্রত্যাবাসন উপযোগী পরিবেশ নেই
প্রধানমন্ত্রী বিটিভিকে বিশ্বাসযোগ্য ও আধুনিক চ্যানেল হিসেবে দেখতে চান: কাজী জেসিন
ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫০১, মামলা ৫৩
ঢাকার যেসব এলাকায় আজ ৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না
মিরপুরে গাড়ি চাপায় ওয়াসা কর্মচারীর মৃত্যু
শাড়ির নিচে কুশ-মদ নিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরে, গ্রেপ্তার দুই ভারতীয়
বছর আসে বছর যায়, রোহিঙ্গারা যায় না
বিমানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হলেন এনামুল কবির
৯ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ
উপকূলে খাবার পানিতে লবণাক্ততা, হৃদরোগের ঝুঁকিতে প্রতি পাঁচজনে একজন