উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য শুধু চাকরি নয়, গবেষণার স্বাধীনতাও জরুরি : অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু চাকরির প্রস্তুতি, নাকি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি? গবেষণার সুযোগের অভাব, চাকরির বাজারের বাস্তবতা, কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশনের প্রভাব - এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণার সুযোগ ও অর্থায়নের সংকট এবং ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষার কাঠামো নিয়ে তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক সকালের সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি কাজী মুহাম্মদ মাহিম।
দৈনিক সকালের সময়: বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের প্রধান লক্ষ্য কি উচ্চশিক্ষা অর্জন, নাকি শুধু একটি ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করা? আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী : উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য থাকে। কেউ বিসিএস ক্যাডার হতে চায়, কেউ একাডেমিক পেশায় যেতে চায়, আবার কেউ কর্পোরেট সেক্টরে আগ্রহী। অর্থাৎ, বিভিন্ন জনের বিভিন্ন লক্ষ্য থাকে।
তবে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে একটি ভালো চাকরি করা। একটি অংশ বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চায় এবং উন্নত জীবনযাপনের প্রত্যাশায় বিদেশে পড়াশোনা করে সেখানেই স্থায়ী হতে চায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীর লক্ষ্য হচ্ছে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে চাকরি করা। অর্থাৎ, গবেষণা বা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে না।
দৈনিক সকালের সময়: শুধু চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কি উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে সংকুচিত করে ফেলছে?
অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী : অবশ্যই সংকুচিত করে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় মানেই নতুন জ্ঞান উৎপাদন। কিন্তু আমরা দেখি, এখন বড় একটি অংশের শিক্ষার্থী, এমনকি অনেক সম্মানিত শিক্ষকও গবেষণার চেয়ে প্রচলিত বই-পুস্তক এবং সীমাবদ্ধ কোর্স উপাদানকেন্দ্রিক শিক্ষায় বেশি মনোযোগী।
খুব কমসংখ্যক শিক্ষক গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান বা নতুন ধারণা সৃষ্টির দিকে মনোযোগী হন এবং শিক্ষার্থীদেরও এ বিষয়ে উৎসাহিত করেন।
একই সঙ্গে এটিও বাস্তবতা যে, গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় না। একাডেমিক কার্যক্রমে শিক্ষকদের দায়িত্বও অনেক বেশি থাকে। ফলে তারা গবেষণার পরিবর্তে প্রচলিত ধারার পড়াশোনা ও একাডেমিক কার্যক্রমে বেশি সময় ব্যয় করতে বাধ্য হন।
দৈনিক সকালের সময় : চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সাজানো কতটা প্রয়োজনীয়? এতে কি উচ্চশিক্ষার জ্ঞান ও গবেষণার উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?
অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী : আমার দৃষ্টিতে, চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার একটি কার্যকর সমন্বয় অবশ্যই প্রয়োজন, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্যও প্রস্তুত করতে হয়।
তবে উচ্চশিক্ষাকে শুধু চাকরির প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পরিণত করা উচিত নয়; এতে মৌলিক জ্ঞান, সমালোচনামূলক চিন্তা ও গবেষণার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি)-এর মতো প্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষার প্রোগ্রামগুলোর মান যাচাইয়ে কাজ করছে।
তবে আমি মনে করি, বর্তমানে একাডেমিয়া যেভাবে চলছে, তাতে গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গবেষণাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করাও কঠিন। কারণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর আর্থসামাজিক বাস্তবতায় গবেষণার সুযোগ সীমিত।
খুব কমসংখ্যক ছাত্রছাত্রী গবেষণার প্রতি আগ্রহী। এ ছাড়া বাংলাদেশে ভালো গবেষকেরও অভাব রয়েছে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ বিসিএস ক্যাডার হতে চায়; অন্যদিকে গবেষণার দিকে তাদের মনোযোগ নেই বললেই চলে।
এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকরাও অনেকটা দায়ী। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের গবেষণায় পর্যাপ্তভাবে উৎসাহিত করেন না। পাশাপাশি ভালো গবেষকের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে, কারণ গবেষণার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যথেষ্ট ফান্ডিং বা অর্থায়ন নেই।
দৈনিক সকালের সময়: বাংলাদেশের চাকরির বাজার কি সাবজেক্টকেন্দ্রিক? নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর পড়াশোনা করে ভিন্ন সেক্টরে চাকরি করাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী : এক্ষেত্রে অবশ্যই মেধার অপচয় হচ্ছে। বাংলাদেশের চাকরির বাজার অনেকাংশেই সাবজেক্টকেন্দ্রিক হওয়া উচিত, কারণ একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করে সেই জ্ঞানকে কাজে না লাগানো মেধা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।
ভিন্ন সেক্টরে চাকরি করা একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা হলেও, এর ফলে বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শিক্ষার্থীদের একাডেমিক বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
একজন মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যুক্ত হচ্ছেন, আবার একজন ইঞ্জিনিয়ার বিসিএস দিয়ে পুলিশে চাকরি করছেন। এর ফলে আমরা দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের হারাচ্ছি, চিকিৎসকদের হারাচ্ছি। এটি হওয়া উচিত নয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ভর্তুকি দেয়। তাই নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করে সম্পূর্ণ ভিন্ন সেক্টরে চলে গেলে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ করা অর্থ এবং শিক্ষার্থীর অর্জিত বিশেষায়িত মেধার প্রত্যাশিত ব্যবহার নাও হতে পারে। এই প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
দৈনিক সকালের সময়: উচ্চশিক্ষা কি সাধারণভাবে সবার জন্য প্রয়োজনীয়, নাকি একজন মানুষের মেধা, আগ্রহ ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে উচ্চশিক্ষা জরুরি?
অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী: উচ্চশিক্ষা জরুরি, কিন্তু ক্যারিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি, সবাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু জেনারেল এডুকেশনের পাশাপাশি আমাদের কারিগরি শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আমাদের দক্ষতার প্রতি জোর দিতে হবে, যেন আমরা দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারি।
একাডেমিক বিভিন্ন কোর্সের পাশাপাশি বিভিন্ন দক্ষতাভিত্তিক কোর্সও রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তাহলে চাকরির বাজারে তারা ভালো সুযোগ পাবে।
আমাদের দরকার দক্ষ জনশক্তি এবং এজন্য কারিগরি শিক্ষার প্রসার প্রয়োজন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দৈনিক সকালের সময়: এআই ও অটোমেশনের প্রভাবে আগামী ১০–২০ বছরে উচ্চশিক্ষার ধারণা কীভাবে বদলাতে পারে? প্রচলিত চার বছর মেয়াদি ডিগ্রি, শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা কি একইভাবে থাকবে?
অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী : আগামী ১০–২০ বছরে এআই ও অটোমেশনের প্রভাবে উচ্চশিক্ষার প্রচলিত কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
চার বছর মেয়াদি ডিগ্রি, শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা পুরোপুরি বিলুপ্ত না হলেও এগুলোর গুরুত্ব ও ধরন পরিবর্তিত হবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং এআই ব্যবহারের সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে আমি মনে করি, মানুষের যে চিন্তাশক্তি, তা এআই এর নেই। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে মানুষকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। এআইকে আমরা প্রয়োজনীয় একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করব। তবে এটি যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে।
ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষায় তাই এআই ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার গুরুত্ব আরও বাড়বে।
এমএসএম / এমএসএম
উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য শুধু চাকরি নয়, গবেষণার স্বাধীনতাও জরুরি : অধ্যাপক ড. শাহ আলম চৌধুরী
প্রথম ক্যাম্পেই জাককানইবি বিএনসিসির বাজিমাত, ৪ ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন
নারীদের খেলাধুলার প্রসারে জাকসুর উদ্যোগ, ছাত্রী হলগুলোতে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো মতের বৈচিত্র্য: পাবিপ্রবি উপাচার্য
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা
পবিপ্রবির সিএসই ক্লাবের উদ্যোগে ৩ দিনব্যাপী আইটি কার্নিভাল শুরু
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী আয়োজন
কুবির হলে জুনিয়রকে রাতভর র্যাগিং, ‘নগ্ন করে ঘোরানোর’ হুমকির অভিযোগ
পাবিপ্রবিতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর দুই শিক্ষার্থীকে আপত্তিকর অবস্থায় আটকের অভিযোগ
এসএসসি পরীক্ষার সূচি পেছালো, শুরু ১৪ মার্চ
বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন পূর্তিতে ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের শুভেচ্ছা মিছিল
কুবির হলে ‘JCD’ লেখা নিয়ে দ্বন্দ্ব , দুই শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার