রায়পুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার ও ঝাড়ুদার সোহেলের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ, অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নির্ধারিত সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দলিল আটকে রেখে টাকা দাবি, কমিশনি দলিল সম্পাদনে অনৈতিক লেনদেন এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে অফিসের নাইটগার্ড কাম ঝাড়ুদার মো. সোহেলের নাম।
একই অভিযোগ অফিস সহকারী আছমা বেগম, বদলী হলেও এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন,নাইটগার্ড কাম ঝাড়ুদার মো. সোহেল , নকলনবিশ কামরুল হাসান ও দলিল লেখক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী নাজমুল কাদের গুলজারকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট । দলিল লেখক ও সেবাপ্রার্থীদের একাংশের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন দলিলে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়।
‘সোহেলকে ম্যানেজ করলেই কাজ সহজ’
দলিল লেখকদের অভিযোগ, বিভিন্ন দলিলে ‘সমস্যা আছে’ বলে আপত্তি তোলা এবং পরে অতিরিক্ত টাকা দিলে তা মীমাংসার নামে লেনদেন করা হয়। বিশেষ করে ব্যাংকের মর্টগেজ দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।
দলিল লেখকদের কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকার মর্টগেজ দলিলে প্রায় ২০ হাজার টাকা, ৫০ লাখে ৫০ হাজার টাকা এবং এক কোটি টাকার দলিলে এক লাখ টাকার বেশি পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, খতিয়ান বা অন্যান্য কাগজপত্রে সামান্য অমিল থাকলেও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ।
কমিশনি দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রেও সোহেলের মাধ্যমে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন দলিল লেখক।
ভিডিওতে টাকা নেওয়ার দৃশ্য
সোহেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওর কথাও সামনে এসেছে। একটি ভিডিওতে তাকে অফিস সহায়কের চেয়ারে বসে টাকা গুনতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্য একটি ভিডিওতে অফিসের বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার দৃশ্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের অভিযান, বদলি তবুও রায়পুরে
রায়পুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সোহেলের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি নতুন নয়। ২০২৩ সালের মার্চে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি অভিযানে তাকে অর্থসহ আটক করার কথা আগের একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরে তাকে কমলনগরে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও সেখানে যোগদান না করে রায়পুরে অবস্থান করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সাময়িক অব্যাহতির কথাও সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সোহেলের দাবি, তিনি বদলির পর প্রায় পাঁচ মাস কমলনগরে দায়িত্ব পালন করেছেন। তদন্ত শেষে আবার রায়পুরে ফিরেছেন। দুদকের বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল রায়পুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আবারও অভিযান চালায় দুদক। নির্ধারিত সরকারি ফির চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইউনুসের বক্তব্য নেওয়া হয়। অভিযানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে কমিশনে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ জুন প্রকাশিত একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে রায়পুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ, সোহেলের বিরুদ্ধে দুদকের অভিযান এবং সাব-রেজিস্ট্রার ইউনুসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়।
সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইউনুসের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত অফিস করেন না এবং সপ্তাহে নির্দিষ্ট কয়েক দিন অল্প সময়ের জন্য অফিস করেন। এজলাসে না বসে ব্যক্তিগত কক্ষে দলিল সম্পাদন, নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে দলিল লেখকদের একটি অংশ তার অপসারণের দাবিতে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনও করে। সেখানে প্রতি দলিল দাখিলে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, চুক্তিভিত্তিক খাজনা দাখিলসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়।
তবে সাব-রেজিস্ট্রার ইউনুস এসব বিষয়ে সরাসরি বিস্তারিত বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নাইটগার্ড কাম ঝাড়ুদার সোহেলের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। কীভাবে তিনি এখনো রায়পুরে কর্মরত আছেন, সে বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার বলতে পারবেন।
সাব রেজিস্টার ইউনুস আরও বলেন, “আমি এখানে আপনাদের সঙ্গে কিছু বলব না। এটা আপনাদের এলাকা দেখার দায়িত্ব আপনাদের। প্রতিদিন আসতে আমি বাধ্য নই। আসব কি আসব না, এটা আমার ইখতিয়ার।”
‘ঝাড়ুদার’ কীভাবে কমিশনি দলিল সম্পাদন করেন?
রায়পুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অফিস সহায়ক, অফিস সহকারী ও অন্যান্য সরকারি কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও একজন নাইটগার্ড কাম ঝাড়ুদারকে দিয়ে কমিশনি দলিল সম্পাদনের অভিযোগও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
দলিল লেখকদের অভিযোগ, সোহেল কমিশনি দলিল সম্পাদনে গেলে তাকে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে কাজ সম্পন্ন করা হয় না। অথচ একজন কর্মচারীর দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে তিনি কীভাবে এ ধরনের কাজে যুক্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সেবাপ্রার্থীরা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সোহেল বর্তমানে দায়িত্বে থাকলেও রাতে তার পরিবর্তে তার ভগ্নিপতি আব্দুল মান্নানকে অফিস পাহারা দিতে এবং সকালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে দেখা যায়। সরকারি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী।
‘১৫ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ’
দলিল লেখকদের একটি অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দলিল লেখক সমিতির কার্যক্রম। কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানো, হয়রানি কিংবা লাইসেন্স নবায়নে সমস্যায় ফেলার আশঙ্কা দেখানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দলিল লেখক সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন রুবেল বলেন, “আমি কেন তার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দেব? আমার ডিপার্টমেন্ট এবং তার ডিপার্টমেন্ট সম্পূর্ণ আলাদা। তার বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।”
সম্পদের অভিযোগও তদন্তের দাবি
সোহেলের বিরুদ্ধে রায়পুরের খাইল্লার পুল এলাকায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ এবং একাধিক ব্যাংক হিসাব থাকার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার আয়ের সঙ্গে কথিত সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য ও অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো স্বাধীন নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
‘হাজারেরও বেশি অভিযোগ’—তারপরও কেন বহাল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছেএকই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ, অভিযোগের তদন্ত ও দুদকের অভিযান, বদলির আদেশ এবং সাময়িক অব্যাহতির মতো ঘটনা থাকার পরও তিনি কীভাবে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন?
সেবাপ্রার্থীদের প্রশ্ন, একজন নাইটগার্ড কাম ঝাড়ুদার যদি দিনের বেলায় অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রভাব বিস্তার করেন, দলিল লেখকদের সঙ্গে লেনদেন করেন এবং কমিশনি দলিল সম্পাদনের সঙ্গে যুক্ত হন তাহলে তার ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কোথায়?
সচেতন নাগরিকদের দাবি, অভিযোগগুলোকে ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে না দেখে দুদক, জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় ও প্রশাসনের সমন্বিত তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ, দলিল রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত রেকর্ড, সরকারি ফি ও আদায়কৃত অর্থের হিসাব, কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং নির্দোষ হলে অভিযোগ থেকে তাদের অব্যাহতি দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্তের দাবি এখন রায়পুরের সেবাপ্রার্থীদের।
কারণ ভূমি ও দলিল নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবায় ‘ঘুষ দিলে কাজ হয়, না দিলে হয়রানি’ এমন ধারণা তৈরি হলে শুধু একটি অফিস নয়, পুরো সরকারি সেবা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এমএসএম / এমএসএম
মেঘনা তীরের জল বিলাসসহ দুই হোটেল কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ
রাজারহাটে চাচার বিরুদ্ধে ভাতিজিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, গ্রেপ্তার ১
কুড়িগ্রামে জিপিএ-৫ অনুষ্ঠান: শিক্ষার্থীদের মানবিক, সংবেদনশীল ও পরমতসহিষ্ণু মানুষ হইয়ার আহ্বান
গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন
ময়না তদন্তের জন্য কবর থেকে উত্তোলন হবে চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তার ছেলের মরদেহ
পরিত্যক্ত মরমি বাউল সাধক উকিল মুন্সীর স্মৃতিকেন্দ্র, চলছে না সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
দাউদকান্দিতে প্রবাসীর বাড়িতে দুর্ধর্ষ চুরি, নগদ ৪ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট
মনপুরায় অধ্যক্ষ মহিউদ্দিনের ওপর হামলা: মামলা নিয়ে প্রশ্ন যুবদলের, তদন্তের দাবি
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নদী বন্দরে শুল্ক আদায়ের নামে অতিরিক্ত চাঁদাবাজি'র প্রতিবাদে মানববন্ধন
রায়পুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার ও ঝাড়ুদার সোহেলের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের নামে মামলা
ফরেস্ট একাডেমী চট্টগ্রাম-পরিচালকের গাড়ীর ড্রাইভার আল আমিনের বেপরোয়া আচরণ