ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পরিত্যক্ত মরমি বাউল সাধক উকিল মুন্সীর স্মৃতিকেন্দ্র, চলছে না সাংস্কৃতিক কার্যক্রম


মোহনগঞ্জ (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি photo মোহনগঞ্জ (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২২-৯-২০২৬ দুপুর ১:৩৮

বাউল শিল্পী বা বাউল সাধক একটি বিশেষ ধরনের গোষ্ঠী ও লোকাচার সংগীত পরিবেশক, যারা গানের সঙ্গে সুফিবাদ, দেহতত্ত্ব প্রভৃতি মতাদর্শ প্রচার করে থাকেন। বাংলাদেশে ভাবসংগীত ও মরমি কিংবা সুফি চিন্তার ফলে বাউল দর্শনের উদ্ভব হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে উকিল মুন্সীর গান গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রচার হলেও কে এই উকিল মুন্সী? তার প্রকৃত নামই বা কি? কীভাবে তিনি আজকের উকিল মুন্সী হলেন, আমাদের ভাটি অঞ্চলে অনেকের জানা থাকলেও আবার অনেকের কাছে তা অজানা। তার অনন্য সৃষ্টিকে ব্যবহার করে কেউ কেউ জনপ্রিয় হয়েছেন; কিন্তু উকিল মুন্সী রয়ে গেছেন দৃষ্টির আড়ালে। উকিল মুন্সীর সম্মান ও স্বীকৃতি আরও বেশি হয়তো প্রাপ্য। 

গানের জগতে উকিল মুন্সী ছিলেন এক বিরহী ডাহুক। তিনি নারী-পুরুষের অন্তরের আকুতি, প্রেম-ভালবাসা,সুখ-দুঃখ, বিরহ গাথা নিয়ে গান রচনা করতেন এবং সৃষ্টিকর্তাকে উদ্দেশ্য করে বিরহের অনুভূতি প্রকাশ করতেন। উকিল মুন্সীর জীবদ্দশায় সাধারণ মানুষ তাকে মরমি কবি উকিল মুন্সী, বাউল ফকির উকিল মুন্সী, দরদি বাউল উকিল মুন্সী, বাউল কবি উকিল মুন্সী প্রভূতি নামে ডাকতেন। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন একজন বিরহী বাউল। তার গান ও সুরে বিরহের ব্যাকুলতা প্রাধান্য পেয়েছে। হাওরাঞ্চলের বিচ্ছেদ গানের ধারায় তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ এবং আদরণীয়।

মাত্র তিন বছর আগের কথা মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে প্রাণকেন্দ্র উকিল মুন্সীর স্মৃতিকেন্দ্র। বাউল মিলনমেলা থেকে শুরু করে সামাজিক নানা আয়োজনে মুখর থাকত পুরো প্রাঙ্গণ। তবে, দীর্ঘদিনের অবহেলায় সাংস্কৃতিক স্মৃতিকেন্দ্রটি পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত ভবনে।

সন্ধ্যা নামতেই এটি হয়ে মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকান্ডের আড্ডাখানা। তদারকি ও সংস্থারের অভাবে ধীরে ধীরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি। অযত্নে, অবহেলায় ক্রমেই এর বুকে জমতে থাকে ধুলাবালি। নিস্তব্ধতায় ডাকা তালাবদ্ধ কক্ষ, ভাঙাচোরা সিঁড়ি, ভেঙে পড়ে আছে মেইন গেইট,খসে পড়া পলেস্তার, কিছু জায়গায় দেয়াল দিবে গিয়ে ফাটল ধরেছে, আর গাছপালায় ঢেকে থাকা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি হয়ে গেছে সমাধিকেন্দ্র।

সম্প্রতি উকিল মুন্সির নাতি মো. কুলকুল আহমেদ সাধক উকিল মুন্সী স্মৃতিকেন্দ্র রক্ষাণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়,জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসন বরাবর লিখিত চিঠি দিয়েছেন।  

সরজমিনে দেখা গেছে,নেত্রকোরার মোহনগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর ইউনিয়নের জৈনপুর গ্রামের বেতাই নদীর পাড়ে প্রায় ৫৩ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত কেন্দ্রটি ১২ মার্চ ২০২৩ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি ও নেত্রকোনা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাজ্জাদুল হাসান এমপি দৃষ্টিনন্দন এ স্থাপনাটি উদ্বোধন করেন। সংস্কৃতিমনা ভাটি অঞ্চলের মানুষের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূর্ণতা পায়। মরমী বাউল সাধক উকিল মুন্সীর নামে রাখা হয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির নাম। ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এর কাজ বাস্তবায়ন করে গণপূর্ত বিভাগ। ওই প্রকল্পে উকিল মুন্সী সমাধিসৌধ, সংগীতচর্চার জন্য ভবন, উন্মুক্ত মঞ্চ, নদীর পাড়ে ঘাটলা, একাডেমিক ভবন, সীমানা প্রাচীর,উকিল মন্সীর পরিবারের জন্য একটি আবাসিক ভবন, দেয়ালে টেরাকোটা, সংগ্রহশালা ও উকিল মুন্সীর জীবনকর্ম সম্পর্কে গবেষণা ও সংস্কৃতিচর্চা এই কেন্দ্রটি।

জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে দেশের গুণী বাউল শিল্পীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক মেলা হতো। শুধু তাই নয়,স্মরণোৎসব, নাট্যচর্চাসহ সাংস্কৃতিকর্মীদের নিয়মিত আড্ডাও বসত। প্রতিবছর মার্চ (ফাগুন মাসের শেষে) মাসে উকিল মুন্সী চত্বরে হতো বাউলদের মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে বাউল স্মরণোৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। হাওরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূলকেন্দ্র ছিল এটি।

কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে কেন্দ্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এখন আর সরকারিভাবে কোনো অনুষ্ঠান পরিচালিত হয় না।স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর পুরো পরিবেশ বদলে যায়। মাদকসেবিদের আনাগোনা শুরু হয়। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় ভবনটির নিরাপত্তা ও তদারকি নেই বললেই চলে। এক সময় যেখানে পরিবার নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসতেন,এখন সন্ধ্যার পর সেখানে যেতে অনেকেই ভয় পান। তবে,সরকারের সদিচ্ছা,পরিকল্পনা ও উদ্যোগে বাউল সাধনার সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্রটি আবার জেগে উঠতে পারে।

উকিল মুন্সী স্মৃতিকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও কবি রইস মনরম বলেন, কমিটি গঠনের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো মিটিং হয়নি। সাংস্কৃতিক প্রেরণার দিক দিয়ে অনেক সমৃদ্ধ এ কেন্দ্রটি। তবে, আগের মতো বড় করে অনুষ্ঠান করা যায় না। সকলে দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে। 

গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী মুহাম্মদ আকবর জানান, প্রত্যন্ত হাওর এলাকার সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রধান জায়গা হচ্ছে উকিল মুন্সী স্মৃতিকেন্দ্র। এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়। হাওরের মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে গড়ে উঠেছিল এই কেন্দ্র। এটি শুধু একটি ভবন নয়, হাওরের সাংস্কৃতিক পরিচয়। এর সংস্কার কাজে সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসবেন বলে আশা করি। ৩ নম্বর তেতুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম চৌধুরী জহর জানান,সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, বাজেট ও জনবল সংকটের কারণে এটি অবহেলা ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উচিত স্মৃতিকেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালনা করা।

উকিল মুন্সীর নাতি কুলকুল আহমেদ জানান, বাউল চর্চার অন্যতম প্রধান জায়গা উকিল মুন্সী সমাধি কেন্দ্রে মাদকের আড্ডা। সমাজকে মাদকের ছোবল থেকে মুক্ত করতে ক্রীড়াঙ্গন এবং  সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে অনুষ্ঠানে মুখরিত রাখতে হবে। 

মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উকিল মুন্সী স্মৃতিকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আমেনা খাতুন বলেন, উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্র হাওরের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ। মরমি বাউল সাধক উকিল মুন্সীর স্মৃতিবিজরিত স্থাপনাটির ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। কেন্দ্রটির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য বলা হয়েছে। 

মরমি বাউল সাধক উকিল মুন্সী স্মৃতিকেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলার আবহমানকালের প্রাচীন শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যমন্ডিত লোকসংগীত নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হবে। নেত্রকোনা জেলার বাউল শিল্পী, সাধক ও মনীষীদের কর্মময় জীবন, লোকসংগীতে তাদের অবদান জনসমক্ষে তুলে ধরার লক্ষ্যে বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক, উদার ও মানবতাবাদী চেতনার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। এক্ষেত্রে উকিল মুন্সীর মতো অসামান্য বাউল সাধক আমাদের জন্য অফুরন্ত প্রেরণার উৎস।

এমএসএম / এমএসএম

মেঘনা তীরের জল বিলাসসহ দুই হোটেল কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ

রাজারহাটে চাচার বিরুদ্ধে ভাতিজিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, গ্রেপ্তার ১

কুড়িগ্রামে জিপিএ-৫ অনুষ্ঠান: শিক্ষার্থীদের মানবিক, সংবেদনশীল ও পরমতসহিষ্ণু মানুষ হইয়ার আহ্বান

গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন

ময়না তদন্তের জন্য কবর থেকে উত্তোলন হবে চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তার ছেলের মরদেহ

পরিত্যক্ত মরমি বাউল সাধক উকিল মুন্সীর স্মৃতিকেন্দ্র, চলছে না সাংস্কৃতিক কার্যক্রম

দাউদকান্দিতে প্রবাসীর বাড়িতে দুর্ধর্ষ চুরি, নগদ ৪ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট

মনপুরায় অধ্যক্ষ মহিউদ্দিনের ওপর হামলা: মামলা নিয়ে প্রশ্ন যুবদলের, তদন্তের দাবি

‎সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নদী বন্দরে শুল্ক আদায়ের নামে অতিরিক্ত চাঁদাবাজি'র প্রতিবাদে মানববন্ধন

রায়পুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার ও ঝাড়ুদার সোহেলের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের নামে মামলা

ফরেস্ট একাডেমী চট্টগ্রাম-পরিচালকের গাড়ীর ড্রাইভার আল আমিনের বেপরোয়া আচরণ

সার আছে, তবু সংকটের হাহাকার